আপনাকে দেখেই তো ঢুকে পড়লাম। ভিড় ঠেলে সারিকার কাছে এগিয়ে এল নিশীথ। চুনিটার দিকে চোখ পড়তেই ও থমকাল।
নিশীথের কথায় খুব অবাক হয়েছে সারিকা। নিশীথ ওকে তুমি বলে। তা হলে আজ হঠাৎ এ আপনির দূরত্ব কেন! আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে না তো? ভাবল ও।
নিশীথের নজর অনুসরণ করে হাতের মালাটার দিকে চোখ নামাল সারিকা। প্রশ্ন করল, পছন্দ হয়?
অপূর্ব! প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত নিশীথ। হয়তো প্রয়োজনের বেশিই উচ্ছ্বসিত।
পাথরটার প্রশংসা করতেই হয়, বলল সারিকা, তবে এই সরু চেনের সঙ্গে এটা বড় বেমানান।
আপাতত বেমানান লাগছে, পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। দারুণ মানাবে আপনার গলায় চোখ বুজে কিনে ফেলুন। এ-সুযোগ ছাড়বেন না।
এবার অবাক হয়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল সারিকা। এ তো ঠাট্টা নয়! যে নিশীথ ওর সঙ্গে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে বেশ কিছুদিন, আজ হঠাৎ কোন আজব কারণে ওর তুমি থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে আপনিতে প্রত্যাবর্তন!
সারিকার বিস্ময় নিশীথের নজরে পড়ল। অস্বস্তিভরে ও প্রশ্ন করল, কী হল?
না, কিছু না।
দোকানের বাইরে বেরিয়েই প্রশ্নটা নিশীথকে করা যাবে। এখন এই ভিড়ের মাঝে নয়। ভাবল সারিকা। তারপর সামনে দাঁড়ানো সেল্সম্যানকে জিগ্যেস করল মালাটার দাম। সে জানাল, ওই সারির সব মালার দামই পঁচিশ টাকা।
পলিথিনের ব্যাগটা নিশীথের হাতে তুলে দিতে গেল সারিকা। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল ও পকেট থেকে টাকা বের করছে বোধহয় পাথরের লকেটটার দাম দেওয়ার জন্যে।
এ কী, আপনি দাম দিচ্ছেন কেন! সারিকার স্বরে কিছুটা তিরস্কার লুকিয়ে ছিল।
থতমত খেয়ে গেল নিশীথ। পকেট হাতড়ানো ছেড়ে এগিয়ে দেওয়া পলিথিনের ব্যাগটা হাতে নিল।
সন্দেহ আর বিস্ময়ের কাঁটা মনে চেপে রেখে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট সেলসম্যানটির হাতে দিল সারিকা। সে টাকা ও মালাটা নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে চলে গেল।
মালাটা আমার কেনার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে ছিল না। ভাবল সারিকা, শুধু নিশীথের আগ্রহের জন্যেই–ওকে খুশি করার জন্যেই আমি লকেটটা কিনে ফেললাম।
সেল্সম্যান আবার ফিরে আসায় ওর চিন্তায় বাধা পড়ল।
হিয়ার ইট ইজ, মিস। ক্যাশমেমো, ফেরত টাকা ও একটা সুদৃশ্য বাক্স সারিকার দিকে এগিয়ে দিল সে। নিশীথের দিকে চেয়ে অর্থপূর্ণ একটু হাসল, বলল, আবার আসবেন।
ওরা দুজনে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল দোকান থেকে। সামনের রাস্তায় শ্লথগতি গাড়ির সার। তারপরেই কার পার্ক। ক্রিসমাসের সময় বলেই হকারের সংখ্যা অনেক বেশি। কারও হাতে কাগজের ফুল, কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি। সব মিলিয়ে ব্যস্ত পরিবেশ। ক্রিসমাসটা ক্রমে বাঙালিদের উৎসবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ভাবল সারিকা। পাশ ফিরে নিশীথের মুখের দিকে দেখল ও।
এত কাছ থেকে এত খুঁটিয়ে নিশীথকে আগে কি কখনও ও দেখেছে? সরু ফ্রেমের চশমা, সরু গোঁফ, ফরসা বাঁ-গালে একটা ছোট আঁচিল। সত্যিই আশ্চর্য! একটা লোককে খুঁটিয়ে দেখা আর এমনি রোজ দেখার মধ্যে কত না পার্থক্য!
লজ্জা পেয়ে হাসল সারিকা। কিন্তু পরমুহূর্তেই আসল প্রশ্নটা মনে উঁকি মারতেই ও বলে বসল, নিশীথবাবু, আমাদের এতদিনের আলাপ, অথচ আপনি আজ আমাকে হঠাৎ আপনি করে কথা বলছেন কেন?
অ্যাঁ? হ্যাঁ–মানে এমনি, অপ্রস্তুতের চূড়ান্ত নিশীথ : হঠাৎ কী খেয়াল হল, তাই– তুমি রাগ করোনি তো, সু?
সু মানে! নতুন সম্বোধন শুনে সারিকা হতবাক।
কেন, ছোট্ট এই নামটা অপছন্দ? হেসে জিগ্যেস করল নিশীথ, তুমি রেগে গেলে নাকি?
না, রাগ করব কেন! সারিকার বিস্ময় তখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
এই তো, লক্ষ্মী মেয়ে। সরল হাসল নিশীথ। ওর কথায় অন্তরঙ্গতার সুর হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে পড়ল।
পাশাপাশি হেঁটে রাস্তা পার হল ওরা।
ঠিক সেই সময়েই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিক থেকে লোকজনের চিৎকার আর গোলমালের শব্দ ওদের কানে ভেসে এল।
নিশীথ তাকিয়ে দেখল এফ. সি. আই. অফিসের সামনে এক বিরাট জটলা। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝে-মধ্যে হেলমেট পরা ট্রাফিক পুলিশের মাথা উঁকি মারছে।
সারিকা চিরকালই গন্ডগোল এড়িয়ে চলতে ভালোবাসে। জনকোলাহল ওর দু-চক্ষের বিষ, কিন্তু আগ্রহ দেখাল নিশীথই। বলল, চলো, দেখা যাক কী হল।
সারিকা নীরবে নিশীথকে অনুসরণ করল।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে সারিকাকে এক পাশে দাঁড়াতে বলল নিশীথ।
তুমি এখানে দাঁড়াও। এখানে একটা বিশ্রী অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। সে-দৃশ্য তুমি সইতে পারবে না।
ওকে রেখে ভিড় ঠেলে ঢুকে গেল নিশীথ। কোনওরকমে অকুস্থলে উঁকি মারল।
চামড়ার জ্যাকেট পরা একটা মানুষের দেহ তালগোল পাকিয়ে পড়ে রয়েছে রাস্তায়। নিঃসন্দেহে মারা গেছে। লোকটিকে শনাক্ত করার তেমন কোনও উপায় আর নেই। ভাঙাচোরা মুখটা রক্তে ভেজা।
নিশীথের মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল। এ-জ্যাকেট ওর অনেক চেনা। এই বিধ্বস্ত অবস্থাতেও মরা মানুষটাকে ও বোধহয় চিনতে পারছে। কী করে মারা গেল লোকটা? তা হলে কি…?
মনে হয় মাল টেনে রাস্তা পার হচ্ছিল। জনৈক দর্শক মন্তব্য করল।
কে জানে, কেউ হয়তো পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছে। কারণ ভদ্রলোককে আমি এই লাইট পোস্টটার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম। বক্তা জনৈক কাঁচা পাকা চুল প্রৌঢ়।
গাড়িটা চাপা দিয়ে এস. এন. ব্যানার্জি রোডের দিকে পালিয়ে গেছে।
