নাথানি এম্পোরিয়ামে অসম্ভব ভিড়। কানে আসছে কলগুঞ্জনের শব্দ। অপছন্দের এই দুটো কারণ থাকা সত্ত্বেও সারিকার আকর্ষণ কমেনি। রূপসী দোকান ওর ভালো লাগে।
ভিড়ের স্রোতে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে অনেকটা ভেতরে পৌঁছে গেল সারিকা। তখনই ওর চোখ পড়ল দেওয়ালের গায়ে হুকে ঝোলানো লকেটগুলোর ওপর।
কাউন্টারে দাঁড়ানো সেল্সম্যানের মনোযোগ সারিকার ওপর পড়ল। প্রশ্ন করল সে, ইয়েস, মিস?
না, এমনি দেখছি। একটু বিব্রত হল সারিকা।
উত্তরে হাসল সে : উইথ প্লেশার।
সারিকা ছোট্ট হাসিতে জবাব দিল।
ওর চোখ খেলে বেড়াতে লাগল লকেট থেকে লকেটে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই চরম সর্বনাশটা ঘটে গেল। ওর নজরে পড়ল আগুন-রং চুনিটা।
পাথরটা হারের সারিতে বেমানান এবং অত্যন্ত খাপছাড়া। দেখে আকাটা বলেই মনে হয়। সঙ্গের সোনালি চেনটা দু-পাশ থেকে এসে দুটো সাপের মাথার মাঝখানে আঁকড়ে ধরেছে পাথরটা। আকাটা হলেও তার জেল্লা কম নয়। বড় বেশি করে চোখ টানে।
সম্মোহিতের মতো নিজের সর্বনাশকে হাতে তুলে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছে হল সারিকার। ওর অনুরোধে সেল্সম্যানটি লকেটটা তুলে দিল ওর হাতে।
রক্তাভ শীতল তার দীপ্তি।
পাথরটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে-দেখতে হঠাৎই ওর চোখ পড়ল দোকানের দরজার দিকে। ভিড়ের মাঝে ভাসমান একটা মুখের সঙ্গে ওর চোখাচোখি হল। চেনা মুখ। নিশীথের মুখ। সুতরাং সম্মোহনের অতল সাগর থেকে ভেসে উঠল সারিকা। পরিচয়ের হাসি হাসল। আজও তা হলে দেখা হয়ে গেল নিশীথের সঙ্গে।
সারিকার ভালো লাগল।
মাত্র এক মাস হল ও দিল্লি থেকে আবার কলকাতায় এসেছে। কলকাতায় ভবানীপুরে ওর পিসিমারা থাকেন। পিসিমা, পিসেমশাই আর ওঁদের একমাত্র ছেলে সম্রাট। ওঁদের ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটেই থাকে নিশীথ-নিশীথ সান্যাল।
সারিকা যখনই কলকাতায় আসে তখনই নিশীথের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। ওর সঙ্গে সারিকার পরিচয় প্রায় বছরখানেকের। তবে সে-পরিচয় নেহাতই সাধারণ ছিল। কিন্তু এবারে কেন যেন সারিকার মনটা বদলে যাচ্ছে, বদলে গেছে।
কলকাতায় বেড়াতে এসে শহরটার বেশ পরিবর্তন লক্ষ করেছে সারিকা। আগের চেয়ে আরও জমকালো হয়েছে কলকাতা। ভিড়ও বেড়েছে।
বাবা মারা যাওয়ার পর, বছর চারেক হল, ও মাকে সঙ্গে করে চলে গেছে দিল্লিতে। সেখানে ওর মামারা থাকেন। ছোটমামা আর বড়মামা। তাঁদের পরিবারে একসঙ্গে থেকে ও বি. এসসি, পাশ করেছে দিল্লি ইউনিভার্সিটির আন্ডারে। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর, রীতি অনুযায়ী, সারিকাকে পাত্রস্থ করতে তৎপর হয়েছেন মা এবং মামারা। সারিকা নীরবে মত দিলেও প্রয়োজনের বেশি উৎসাহ দেখায়নি। তারপর পেল পিসেমশাইয়ের চিঠি ও অনেক দিন তোদের দেখি না। তোর মাকে নিয়ে বেড়াতে চলে আয়। তোর পিসিমার শরীর বিশেষ ভালো নেই। তোদের কাছে পেলে খুশি হবে।
সুতরাং মাকে নিয়ে সাময়িকভাবে কলকাতায় এসেছে সারিকা।
নিশীথের সঙ্গে ওর প্রথম আলাপ হয়েছিল অদ্ভুতভাবে।
পাতিল ম্যানসনের ছতলায় তিন-বেডরুমের ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন পিসিমারা। আর সাততলায় নিশীথ। একদিন মাকে নিয়ে কোথায় যেন বেড়াতে বেরিয়েছিল সারিকা। সন্ধে নাগাদ ফিরে এসে একতলার লিফটে যখন উঠল, তখন দেখল ওঁদের সহযাত্রী পঁচিশ-ছাব্বিশের এক যুবক। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, সরু গোঁফ। ঠোঁট দুটো যেন কম কথা বলব প্রতিজ্ঞায় অবিচল। চশমার কাচের পিছনে কালো চোখের তারা ভীষণ অস্থির।
ক’তলায় যাবেন?
ছ’তলায়। যুবকের দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিয়েছিল সারিকা।
অটোমেটিক এলিভেটর। বোতাম টিপতেই নিঃশব্দে ওপরে উঠতে শুরু করেছে যন্ত্রযান। সারিকার যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। মাঝপথে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে না তো লিফটটা! ওর মুখে সম্ভবত আশঙ্কার ছাপ ফুটে থাকবে, কারণ হঠাৎ সামান্য হেসে স্পষ্ট স্বরে যুবকটি বলে উঠল, মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, যন্ত্র করে না।
লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়েছিল সারিকা। ছতলায় লিফট থামতেই তাড়াতাড়ি মাকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। লিফটের দরজা তখন আবার বন্ধ হয়ে গেছে।
সেই প্রথম।
তারপর থেকে যখনই কলকাতায় আসে যাওয়া-আসার পথে নিশীথের সঙ্গে ইতস্তত কথাবার্তা হয়। এরই নাম কি গভীরতর আলাপ? তখন সারিকা জেনেছে নিশীথ মডার্ন মেশিন টুস-এর সেলস অ্যান্ড সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার। সাততলায় মাসতুতো দাদা-বউদির সঙ্গে থাকে। তবে এবারে ওঁরা শান্তিনিকেতনে নিশীথের নিজের দিদির বাড়ি বেড়াতে যাওয়ায় নিশীথ একাই আছে। রান্নাবান্নার জন্য রয়েছে শুধু একজন ঠিকে কাজের লোক।
নিশীথ সম্পর্কে এই প্রথম সারিকার একটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। নিশীথের দিকে ও আগের মতো আর সরাসরি তাকাতে পারে না। কেমন যেন সঙ্কোচ হয়। কিন্তু তবুও নিশীথের সঙ্গে কথা বলতে ওর ভালো লাগে। নিশীথ ওর সম্পর্কে কী ভাবে তা ও স্পষ্ট জানে না, তবে…।
সারিকার পরিচয়ের হাসির উত্তরে কয়েক মুহূর্ত নির্বিকার রইল যুবকটির মুখ। তারপর বিব্রতভাবে একটা আধো-হাসি ছুঁড়ে দিল সে।
আরে, নিশীথবাবু, আপনি! বিস্ময় মেশানো খুশিতে বলে উঠল সারিকা, দেখলেন তো, আবার কেমন এখানে দেখা হয়ে গেল!
হতভম্ব যুবকের মুখমন্ডলে কয়েক সেকেন্ড ধরে অভিব্যক্তির খেলা চলল। তারপর হঠাৎই দিলখোলা হাসল সে।
