মনে-মনে হাসল রোহিত। সরাসরি তাকাল সেল্সম্যানের চোখে।
ইয়েস? সৌম্য হেসে রোহিতকে আপ্যায়ন করল সেল্সম্যান।
একটা পাথরের লকেট বসানো মালা কিনতে চাই–দেখাবেন?
উইথ প্লেশার।
হুক থেকে একের পর এক মালা নেমে আসতে লাগল ল্যামিনেটেড প্লাস্টিক লাগানো কাউন্টারে। ক্ষিপ্র হাতে মালা বাছতে শুরু করল রোহিত। এবং তারই ফাঁকে নিজের হাতের মালাটাকে অন্যান্য মালার ভিড়ে লুকিয়ে ফেলল।
কেনাকাটায় দোকানের ক্রেতাও বিক্রেতা সকলেই ব্যস্ত। সুতরাং এই সামান্য ব্যাপারটা কারও নজরে পড়ল না।
একটু পরেই অস্পষ্ট গলায় মনের মতো হচ্ছে না–থ্যাংঙ্ক ইউ। বলে কাউন্টার থেকে সরে এল রোহিত। বেরোনোর মুখে ফিরে তাকিয়ে দেখল, সেল্সম্যানটি মালাগুলো আবার হুকে সাজিয়ে রাখছে।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল রোহিতের বুক ঠেলে। বহ্নিশিখা এখন নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে। নাথানি এম্পোরিয়াম যদি ক্রিসমাস সেলের জন্য আটটার জায়গায় রাত দশটাতেও বন্ধ হয়, তা হলেও এই কয়েক ঘণ্টা সময়ে কেউ যে এসে বহ্নিশিখাকে ঝুটো পাথরের দাম দিয়ে কিনে নেবে, সে-সম্ভাবনা কম। সামান্য এই ঝুঁকিটুকু রোহিতকে নিতেই হবে। কাল সকাল দশটায় দোকান খোলার সময়ে সে আসবে, ফিরিয়ে নেবে তার বহ্নিশিখাকে।
হাতের আড়ালে মুখ ঢেকে দোকানের দ্বিতীয় দরজা দিয়ে বাইরে এল রোহিত। ভিড়ের মধ্যে সেই যুবক তখনও চঞ্চল চোখে বোধহয় তাকেই খুঁজছে।
নিউ মার্কেটের বাইরে এসে দাঁড়াল রোহিত। এই মুহূর্তে পায়ের শব্দ শোনার জন্যে সে মনোযোগ দিল না। কারণ অসংখ্য গাড়ির তীব্র হর্নের শব্দ সেই পায়ের শব্দকে ঢাকা দিয়েছে। একপলক থমকে দাঁড়িয়ে দ্রুতপায়ে রাস্তা পার হতে লাগল রোহিত। সতর্ক চোখ দু-পাশের গাড়ির দিকে।
রাস্তা পার হয়ে সে এগিয়ে চলল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে।
এ-দিকটার তুলনায় সেখানে আলোর রোশনাই অনেক কম চোখে পড়ছে। অন্ধকার ও তার অনুসঙ্গী কুয়াশা ধীরে-ধীরে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। শীতের ঠান্ডা আমেজটাও যেন তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠছে। দূরের আলোর সারির দিকে একপলক দেখল রোহিত, পায়ের গতি দ্রুত করল।
সেই মুহূর্তে খুব চেনা মর্স কোডের ছন্দটা আবার তার কানে এসে বাজল।
বহ্নিশিখাকে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকোতে পেরে কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়েছিল রোহিত। এমনও ভেবেছিল, অনুসরণকারীকে সে ধোঁকা দিতে পেরেছে। কিন্তু পারেনি। ওরা এখনও রোহিতের পিছু ছাড়েনি। কিন্তু ওরা হয়তো জানে না বহ্নিশিখা এখন তার কাছে নেই। মনে-মনে আরও একবার হাসল রোহিত। এসে থামল ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের মুখে। কিছুক্ষণ আগের উজ্জ্বল পরিবেশের তুলনায় এ-জায়গাটা বড় বেশি অন্ধকার হলেও গাড়ি চলাচলের কমতি নেই। সার বেঁধে ঝকমকে গাড়িগুলো পিচের কালো রাস্তায় পিছলে যাচ্ছে।
গাড়ি চলাচল একটু ফিকে হলেই সে রাস্তা পার হবে, ভাবল রোহিত। কয়েকটা মুহূর্ত সুখ-স্বপ্নে মগ্ন হয়ে রইল সে। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর কেটে যাওয়ার আগেই জীবনে শেষবারের মতো চমকে উঠল রোহিত রায়।
আঘাতটা এল তার পিছন থেকেই। ঠিক ঘাড় ও পিঠের ওপর–একইসঙ্গে। প্রচণ্ড আঘাতে সামনের রাস্তার দিকে ছিটকে পড়ল রোহিত। তার চোখের সামনে গোটা সড়কটা বনবন করে ঘুরে উঠল–ঠিক প্রপেলারের ব্লেডের মতো। ভারসাম্য ফিরে পাওয়ার আগেই তার চোখের সামনে চলে এল একটা বিশাল কালো শেভ্রলে গাড়ি। দুরন্ত গতি নিয়ে গাড়িটা ছুটে এল টলায়মান রোহিতের শরীর লক্ষ করে। আতঙ্কবিকৃত রোহিতের মুখে পলকের জন্য ফুটে উঠল বিস্ময়। এই ঘটনা–অথবা দুর্ঘটনা–যে তার জীবনে সত্যিসত্যিই ঘটতে চলেছে, সম্ভবত সেই কথা ভেবেই।
জীবনে আর্ত চিৎকার শব্দের ঠিকঠাক মানে রোহিত কোনওদিনই বুঝতে পারেনি। কিন্তু এই-অন্তিম মুহূর্তে তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক বিকট বীভৎস আর্ত চিৎকার। সে-চিৎকার প্রতিধ্বনিত হল রাস্তার দুপাশে দাঁড়ানো বাড়িগুলোর জীর্ণ দেওয়ালে। সে-চিৎকারের তীক্ষ্মতায় বুঝি কেঁপে উঠল রাতের শীতার্ত কুয়াশা।
আশ্চর্যের কথা, রোহিতের অন্তিম চিন্তায় বহ্নিশিখার ছায়া পড়ল না। রোহিতের মনে পড়ল তার তিন বছরের ছোট ছেলে সুমনের কথা। রোহিত স্পষ্ট দেখল, শেষবারের মতো, সুমন ললিপপ খাচ্ছে।
.
০২.
আধুনিক প্রসাধনের কিছু জিনিসপত্র আর টুকিটাকি কয়েকটা জিনিস কেনাকাটা করতে নিউ মার্কেটে এসেছিল সারিকা।
এখানে এলে কেনাকাটায় চেয়ে ঘুরে-ফিরে দেখাটাই হয়ে যায় বেশি। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হেয়ার স্প্রে, ফাউন্ডেশন, কোল্ড ক্রিম, ম্যাক্স ফ্যাক্টর, মাসকারা, আর ছোটখাটো কয়েকটা জিনিসে সারিকার পলিথিন ব্যাগ তখন ভরতি, ওর নজরে পড়ল নাথানি রোল্ড-গোল্ড এম্পোরিয়ামের ক্রিসমাস-আলোকসজ্জা। প্রয়োজনের শেষে উদ্দেশ্যহীন পথ চলা মানেই বাড়তি খরচ–অন্তত নিউ মার্কেটে। এখনও তাই হল। পলিথিন ব্যাগকে সযত্নে আঁকড়ে ধরে দোকানে। ঢুকেই পড়ল সারিকা।
আজ চেনা কাউকে ওর নজরে পড়েনি। পড়লে হয়তো গল্পে মশগুল হয়ে উদ্দেশ্যহীন অলস ভ্রমণের হাত থেকে রেহাই পেত। এই তো, গত সপ্তাহেই নিশীথের সঙ্গে আচমকা দেখা হয়ে গিয়েছিল।
নিশীথ সান্যাল। নামটা অনুভবের সঙ্গে-সঙ্গে সেতারের মূছনার কোনও সম্পর্ক আছে কি? ছমাস আগেও তো এমন ছিল না। আপনমনেই হাসল সারিকা। কীভাবে দিন কেটে যায়, আশ্চর্য।
