সুতরাং এত সব চিন্তার পর একটিমাত্র সিদ্ধান্তেই পৌঁছোনো সম্ভব হয় পুলিশ, না হয় ওরা এই মুহূর্তে রোহিতকে অনুসরণ করছে। তা হলে কি পুলিশ তার গতিবিধির সন্ধান পেয়েছে? নাকি ওরা শেষ পর্যন্ত তাকে খুঁজে বের করেছে?
ওরা কারা রোহিত জানে না। শুধু জানে ওরা বহ্নিশিখাকে পেতে চায়–তা সে যেভাবেই হোক। দরকার হলে রোহিতকে ওরা স্বর্গের সিঁড়ি দেখাতেও ছাড়বে না।
গত চারদিন ধরে শত অনুসন্ধানী নজর চালিয়েও সন্দেহজনক কাউকে রোহিত খুঁজে পায়নি। শুধু অনুভব করেছে শীতার্ত হাওয়ার শীতল প্রলেপ। এবং ভয় পেয়েছে।
লিন্ডসে স্ট্রিটের মুখে পৌঁছে আর-একবার পিছন ফিরে তাকাল রোহিত। সেই বৃদ্ধা এবং প্রৌঢ় ভদ্রলোক এখনও তার পিছন-পিছনই আসছেন। হয়তো তারা রোহিতকে চেনেনও না। হয়তো তারা নির্দোষ। কিন্তু রোহিত এখন কোনওরকম ঝুঁকি নিতে পারে না। মর্স কোডের শব্দ তাকে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছে শত্রুপক্ষের নিঃশ্বাস। তাদের কেমন দেখতে, কী তাদের পরিচয় এসব রোহিতের অজানা হলেও এই পায়ের শব্দ যে তার খুব চেনা।
সুতরাং রোহিত এখন আশ্রয় চাইল। জনারণ্যের আশ্রয়। তাই সে মোড় নিল ডান দিকে। এগিয়ে চলল লিন্ডসে স্ট্রিট ধরে। কিন্তু হ্যান্ডলুম হাউসের কাছে পৌঁছেই সে বুঝল শত্রুপক্ষকে সে ধোঁকা দিতে পারেনি। কারণ সে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে সেই পায়ের শব্দও মোড় নিয়েছে তার পিছু পিছু।
চোরাচাউনিতে পিছনে তাকাল রোহিত। আগের দুজনের সঙ্গে তৃতীয় একজন যুবক এখন যোগ দিয়েছে।
এবার আতঙ্কে উদভ্রান্তের মতো হয়ে পড়ল রোহিত রায়। আজ কি তার আর নিস্তার নেই? অন্যান্য দিন আগে তোক পরে তোক ওই পায়ের শব্দকে নানান কায়দায় ঠকাতে পেরেছে। কিন্তু আজ সেই কালান্তক ডট-ড্যাশ শব্দ যেন অমোঘ নিয়তির মতো রোহিতের পিছনে প্রতিটি মুহূর্তে হাজির। কিন্তু যেভাবেই হোক এই পাথরটাকে বাঁচাতেই হবে। পুলিশ যদি তাকে অনুসরণ করে থাকে তা হলে পাথরবিহীন রোহিতকে গ্রেপ্তার করে কোনওরকম কেসই ওরা দাঁড় করাতে পারবে না। আর অনুসরণকারী যদি পুলিশ না হয় এবং রোহিতের বিশ্বাস, পুলিশ নয়–তা হলে বিপদের ধরন আরও ভয়ঙ্কর। ওরা পাথরটাও চায়, সঙ্গে চায় রোহিত রায়কে। কিন্তু মরে গেলেও বহ্নিশিখা ওদের হাতে রোহিত তুলে দেবে না। কিছুতেই না। বহ্নিশিখা শুধু তার। তার একার।
হাতঘড়িতে চোখ রাখল রোহিত। ছটা বাজতে কুড়ি। এই মুহূর্তে কোথায় লুকোনো যায় চুনিটাকে? চকিতে চারপাশে তাকিয়ে উত্তর খুঁজে পেল রোহিত।
নিউ মার্কেট।
মার্কেটের কোনও স্টেশনারি কিংবা ইমিটেশন গয়নার দোকানে এই চুনির লকেট বসানো হারটা লুকিয়ে ফেলবে সে। তারপর নিজেকে লুকিয়ে ফেলবে নিউ মার্কেটের জনতার ভিড়ে। পরে, নিশ্চিন্তে, অবসর সময়মতো ফিরে এসে সেই দোকান থেকে দাম দিয়েই কিনে নেবে পাথরটা। পঁচিশ টাকা দিয়ে ফিরিয়ে নেবে পঁচিশ হাজার টাকার জিনিস।
সুতরাং নিউ মার্কেট লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি পা চালাল রোহিত। এই চেষ্টাই তার শেষ চেষ্টা।
মার্কেটের দরজায় সামনে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল সে। কান পেতে শুনতে চাইল মর্স কোডের ছন্দ। কিন্তু না, কোনওরকম বিশেষ শব্দই তার কানে এল না। সম্ভবত চলমান পথচারী ও যানবাহনের কলগুঞ্জনে সেই শব্দ হারিয়ে গেছে।
আর অপেক্ষা না করে আলোয় পরিবেশে পা রাখল রোহিত। সতর্ক অথচ দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল।
অনুসরণের শব্দ শুনে বিচলিত হয়েছিল রোহিত রায়। এখন সেই শব্দ শুনতে না পেয়ে ত্রাসে উন্মাদ হয়ে উঠল। কে জানে অনুসরণকারী তার ঠিক কতটা পিছনে রয়েছে। দিভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগল রোহিত।
ক্রিসমাস আর বেশি দূরে নেই। তা ছাড়া গত কয়েকদিন হঠাৎ করে বৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই প্রয়োজনীয় কেনাকাটায় বেরোতে পারেনি। এই দুটো কারণেই আজ এমন অমানুষিক ভিড়। এত লোক, এত পায়ের শব্দ কিন্তু এর মধ্যে সেই চেনা পায়ের শব্দ কই?
হঠাৎই রোহিতের মনে হল, অনুসরণকারীকে সে হয়তো ঠকাতে পেরেছে। কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে ভিড়ের মাঝে ভাসতে ভাসতে সে এগিয়ে চলল একটা ইমিটেশন গয়নার দোকানের দিকে।
নাথানি রোল্ড-গোল্ড এম্পোরিয়াম।
ভেতরে ঢুকল রোহিত।
চূড়ান্ত ভিড়ের মাঝে সুবেশা যুবতীদের সংখ্যাই বেশি। অন্যসময় হলে রোহিতের মনোযোগের অনেকটাই খরচ হত দোকানের সুন্দরীদের জন্য, কিন্তু এই সংকটকালে হৃদয়ের তুলনায় মাথা বেশি কাজ করছিল।
সুতরাং দোকানের একেবারে ভেতরে ঢুকে গেল সে। আড়চোখের সতর্ক নজর দোকানের সদরের দিকে। কানের মনোযোগও একই দিকে যদি চোখ ও কানের যুগলবন্দিতে অনুসরণকারীকে চিনতে পারে রোহিত।
হঠাৎ সেই পথে-দেখা যুবক ভিড় ঠেলে ঢুকল দোকানে। দু-চোখে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টি।
তাকে চিনতে পারল রোহিত এবং বুঝল সে রোহিতের অনুসরণকারী নয়, তার পায়ে নেই মর্স কোডের ছন্দ। কিন্তু সাবধানের মার নেই। তাই সকলের অমনোযোগের সুযোগে পকেট থেকে চুনি বসানো বিচেহারটা বের করে এনেছে রোহিত।
একটা সরু চেনের ঠিক মাঝখানে মাঝারি নুড়ির মাপের একটা রক্ত-লাল চুনি।
পাথরটা একপলক দেখে হাতের মুঠোয় লুকিয়ে ফেলল রোহিত। তারপর তাকাল সামনের সেল্সম্যানের দিকে। তার ঠিক পিছনে এবং পাশে হুকের গায়ে ঝুলছে রাশি-রাশি ঝুটো পাথরের মালা।
