অতিথি দুজন রোমিলার সামনে এসে বহুক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন ওর নগ্ন যৌবনসম্পদ।
রোমিলার মুখ লজ্জায় লাল হল।
কিন্তু আরও দুর্ভাগ্য বোধহয় ছিল ওর কপালে।
একটু পরেই ওকে ডাকা হল শেখদের কাছে। ওকে পায়চারি করতে বলা হল তাদের সামনে। সবদিক থেকে পরখ করে দেখা হল ওর দেহসৌষ্ঠব।
অবশেষে মেজাজি গলায় শেখ হারিদ বললেন, আপনার পছন্দের তারিফ করতে হয়, সিনর রোমানি।–শেখ রেমিলার কোমল মসৃণ স্তন স্পর্শ করলেন চঞ্চল আঙুলে? কিন্তু এবারে দয়া করে বলুন, ওর দেহের কোন অংশটা আপনার চোখে সবচেয়ে আকর্ষণীয়?
হারিদের অতিথি হোঁচট খাওয়া ইংরেজিতে বললেন, ওর সব সুন্দর…তবে আমার মনে হয় এরকম লোভনীয় বুক আমি আগে দেখিনি…।
একটু থামলেন সিনর রোমানি।
আর?–শেখ উৎসাহ দিয়ে জানতে চাইলেন।
আর ওর টানা-টানা চোখদুটোর কোনও জবাব নেই।
বাঘের নখ
রোহিত রায় আচমকা অনুভব করল কেউ তাকে অনুসরণ করছে। প্রথমে সে এতটা নিশ্চিত হতে পারেনি। কারণ রফি আহমেদ কিদওয়াই স্ট্রিট থেকে পার্ক স্ট্রিটে মোড় নেওয়ার পর পায়ের শব্দটা আর কানে আসেনি। সামনের দিকে অলস ভঙ্গিতে এগিয়ে চললেও শিকারী কুকুরের মতো সে সর্বক্ষণ কান খাড়া করে রেখেছে। বিভিন্ন মানুষের পদক্ষেপের বিচ্ছিন্ন শব্দে সেই বিশেষ শব্দটা যেন হারিয়েই গিয়েছিল। কিন্তু ভাঙা বাড়িটা ছাড়িয়ে পেট্রল পাম্পের কাছে পৌঁছতেই শব্দটা আবার শুনতে পেয়েছে রোহিত। হায়েনার মতো হালকা অথচ তৎপর পায়ের শব্দ। সুতরাং বিশাল ঝুঁকি নিয়ে পিছনে ফিরে তাকাল সে। শীতের কুয়াশা ঢাকা সন্ধ্যা এবং দূরের নিওন সাইনের আলোয় স্পষ্টভাবে কারও মুখ নজরে পড়ল না।
অফিস ছুটির সময়। তাই পথচারীর সংখ্যাও কিছু বেশি। তার মধ্যে সেই বিশেষ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা রোহিতের পক্ষে সম্ভব হল না। কিন্তু শব্দটা পিছনে যেন আঠার মতো লেগে রইল। বিচিত্র এক অনুসরণের ছন্দঃ ডট-ড্যাশ, ডট-ড্যাশ…। যেন চাবি টিপে মর্স কোডে ইংরেজি বর্ণমালার এ অক্ষরটাকে কেউ অবিরামভাবে বাজিয়ে চলেছে।
পার্ক হোটেলের নীচে পৌঁছে ফুটপাতে বসা বইয়ের দোকানের কাছে থমকে দাঁড়াল রোহিত। বিচলিত কালো চোখজোড়া মেলে ধরল সামনের কাচের শো-কেসের দিকে। সেই আয়নায় লক্ষ করে চলল পথচারীদের ঝাপসা মুখগুলো। কিন্তু সন্দেহজনক কাউকেই নজরে পড়ল না। অবশেষে বই দেখার ভান করে সে যখন আবার চলতে শুরু করল তখন হঠাৎই তার খেয়াল হল, অনুসরণের অদ্ভুত শব্দটা থেমে গেছে। তা হলে কি তাকে থামতে দেখে অনুসরণকারীও থমকে দাঁড়িয়েছে?
রোহিত রায়ের চলার গতি সামান্য দ্রুত হল। একটা শূন্য অনুভূতিতে তার পাকস্থলীটা যেন মোচড় দিয়ে উঠছে। সে বুঝল, সে ভয় পেয়েছে। যেমন পেয়েছিল কাশ্মীর সীমান্তে দাঁড়িয়ে সাইরেনের আচমকা বুক কাঁপানো শব্দে। অজস্র গাড়ির হর্নের শব্দ তার কানে দামামা বাজাতে লাগল। এতগুলো তীক্ষ্ণ শব্দের মিলিত স্বননে পা টেনে চলার অদ্ভুত শব্দটা ক্ষণিকের জন্য চাপা পড়ে গেল।
চৌরঙ্গী রোডে পড়ে ডান দিকে বাঁক নিল রোহিত। মনে হল, হঠাৎই যেন আলোয় রাজত্ব ছেড়ে আবছা অন্ধকার সীমানায় এসে সে দিয়েছে। ওপারে গান্ধীজির মূর্তির কুয়াশাচ্ছন্ন ফ্যাকাসে আলোয় বৃত্তে ডান্ডি অভিযানের মুহূর্তে কিছুটা যেন দ্বিধাগ্রস্ত। এ-দিকটায় দোকানপাটের সংখ্যা কম থাকায় রাস্তার আলোগুলোই অন্ধকারের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী। ফুটপাত ধরে চলতে-চলতে রোহিত এবার স্পষ্ট শুনতে পেল পায়ের শব্দটাও–এবং পিছন ফিরে তাকাল।
এখানে পথচারী কম। কিন্তু তার মধ্যেও রোহিতের এমন কাউকে চোখে পড়ল না, যার চলায় কোনও অসঙ্গতি নজরে পড়ছে। অথচ এই পা টেনে চলার ডট-ড্যাশ ছন্দ তাকে যেন ক্রমশ পাগল করে তুলছে।
রোহিতের হাতের চেটো ঘামে ভিজে উঠল। ওর সন্দিহান চোখজোড়া প্রথমে জরিপ করল গোলাপী গাউন পরা জনৈকা বৃদ্ধা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মহিলাকে। তার হাতে একটা সাদা ঠোঙা, ধবধবে সাদা চুল, এবং সঙ্গে একটা পিকিনিজ কুকুর। তার একটু পিছনেই একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা। হাতে ব্রিফকেস। সম্ভবত অফিস থেকে ফিরছেন। আর যে-দুজনকে রোহিতের চোখে পড়ল, তারা অল্পবয়েসী তরুণ-তরুণী। সাজে আধুনিক, এবং একান্ত-সংলাপে মগ্ন।
এ ছাড়া কাছাকাছি আর কোনও পঞ্চম ব্যক্তি নেই।
রোহিত এবার কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ল। চলার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। পশ্চিম দিকের খোলা মাঠের হাওয়াকে রুখতে জ্যাকেটের কলার তুলে কান ঢাকতে চাইল। দুরে সারি সারি আলোর ইশারা চোখে পড়ছে : এসপ্ল্যানেড় অঞ্চলের সন্ধের জাঁকজমক। ভয়ার্ত রোহিত যেন কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেল পিছনের অনুসরণকারীর কথা, প্যান্টের ডান পকেটে রাখা অমূল্য চুনিটার কথা…।
সংবিৎ ফিরতেই রোহিত টের পেল তার ডান হাত প্যান্টের পকেটে রাখা চুনিটাকে ঘামে ভেজা মুঠোয় আঁকড়ে ধরেছে। ও জানে, ওর সব আশঙ্কা, আতঙ্কের একমাত্র চাবিকাঠি এই চুনিটা। কী করে এটা রোহিতের হাতে এল সে-ইতিহাস দীর্ঘ। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রপেলারের ব্লেডে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া সুখেন বর্মার দলা পাকানো শরীরটা। সে-স্মৃতি বড় নৃশংস, বীভৎস। এই যে গত চারদিন ধরে পুলিশ তার পিছনে হন্যে হয়ে ঘুরছে, সে শুনতে পাচ্ছে এই অদ্ভুত অনুসরণের ছন্দ–এ সবের কারণ একটাই–এই রক্ত-চুনি-বহ্নিশিখা।
