জড়াজড়ি হুটোপাটির মধ্যে হঠাৎই গুলি ছুটে গেল–গুড়ুম!
এবং একই সঙ্গে হাসানের মুখে বিস্ময়ের স্থির অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। তারপর বিস্ময় ধীরে ধীরে পরিণত হল অসহ্য যন্ত্রণায়। হাঁটু মুড়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়লেন তিনি।
সর্বনাশ করেছে!–মোহন খান্না আশঙ্কাভরা গলায় বলে উঠল।
আমি ওকে গুলি করতে চাইনি, কিন্তু যাই বলো ছুঁচোটা উচিত শিক্ষা পেয়েছে।
কথা বলতে-বলতেও আমি রিভলভার তাক করে রেখেছি দুই রক্ষীর দিকে। না, আমার মনে কোনও দুঃখ বা অনুশোচনা জাগেনি! বরং বারবার মনে পড়ছিল আয়েষার কথা।
ওর মালিকটাকে শেষ করতে পারলে আরও খুশি হতাম।
আমাদের এক্ষুনি পালাতে হবে।–মোহন বলল!
কিন্তু আয়েষার কী হবে?
আমরা যদি ধরা পড়ি তাহলে ওর কোনও উপকারেই আসব না। শিগগির চলো, তর্ক করার সময় নেই।
ভেবে দেখলাম, মোহনের কথায় যুক্তি আছে। সুতরাং রাজি হলাম। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে সেটা বাইরে থেকে লক করে দিলাম। দুই প্রহরী ঘরে বন্দি রইল।
তারপর অলিন্দ ধরে ছুটতে শুরু করেছি দুজনে।
আমাদের কানে আসছিল চিৎকার, কোলাহল, ছুটন্ত পায়ের শব্দ। কারা যেন ক্ষিপ্র পায়ে ছুটে আসছে আমাদের লক্ষ করে। বাইরে যাওয়ার একটা দরজা খুঁজে পেতেই সেদিকে ছুটে গেলাম। দরজা পার হতেই আমরা চলে এলাম প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে। হাঁফাতে-হাঁফাতে বাগান পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম প্রাসাদের ঘেরা পাঁচিলের কাছে। তাড়া খাওয়া জন্তুর মতো নিমেষে পাঁচিল টপকে লাফিয়ে পড়লাম বাইরে।
ছায়া আর অন্ধকারের আড়ালে-আড়ালে সরু রাস্তা ধরে উদভ্রান্তের মতো ছুটে চললাম। ঢালু রাস্তা এঁকেবেঁকে নেমে গেছে বন্দরের দিকে। প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে আসার পর পেছনে ছুটন্ত পায়ের শব্দ আর শুনতে পেলাম না। ছুটতে ছুটতে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম সাগরের কিনারায়।
জলে ছোট-বড় নানান মাপের নৌকো ভাসছে। সেদিকে তাকিয়ে হাঁফাতে-হাঁফাতে মোহন খান্না বলল, নৌকো নিয়ে পালানোই সহজ হবে।
আমারও সেইরকমই মনে হল। সুতরাং একটা ছোট্ট পালতোলা নৌকো বেছে নিয়ে আমরা ভেসে পড়লাম।
জলে খানিকটা এগোতেই সমুদ্রের হাওয়া এসে সাদা পালটা ফুলিয়ে দিল। বাতাস আমাদের ঠেলে নিয়ে চলল উপকূল থেকে সাগরে।
এত সহজে পালাতে পারব ভাবিনি। হয়তো সৌভাগ্য আমাদের সহায় ছিল। ধীরে ধীরে তীরের আলোকবিন্দুগুলো আরও ছোট হয়ে মিলিয়ে গেল। ক্রমে মিলিয়ে গেল শেখ হারিদের ছায়াময় বিশাল প্রাসাদ। কিন্তু মনে হল, প্রাসাদের কাছাকাছি অনেকগুলো উজ্জ্বল আলোর ফুটকি ব্যস্তভাবে চলেফিরে বেড়াচ্ছে। অনুসন্ধান কি এখনও চালিয়ে যাচ্ছে ওরা?
চারদিক এখন শূন্য, শান্ত। শুধু ছলছল সাগরের জল চাঁদের আলোর চিকচিক করছে।
উত্তর দিকে যাব ঠিক করেছিলাম, তারপর পাড়ে নৌকো ভেড়াব। কিন্তু ওলটপালট বাতাস সব পরিকল্পনা তছনছ করে দিল। বাতাস আমাদের রাতের আঁধারে ভাসিয়ে নিয়ে গেল দক্ষিণ দিকে–অসহায় ভাবে ছেড়ে দিল থইথই সাগরের অকূল পাথারে।
একদিন একরাত পরে একটা ট্যাঙ্কার আমাদের উদ্ধার করল। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে, চেহারা সূর্যের খরতাপে ঝলসে গেছে। দরকারি পরিচর্যার পর ট্যাঙ্কারটা আমাদের পৌঁছে দিল আবাদানে।
রোমিলা! রোমিলা! ওর কথা ভেবে-ভেবে আমি শুধু ছটফট করছি। ও ঠিকমতো পৌঁছতে পেরেছে তো ভারতীয় দূতাবাসে?
আবাদান থেকে অবশেষে আমরা যখন বাসিরায় পৌঁছলাম তখন তিন-তিনটে দিন কেটে গেছে। আমরা সোজা চলে গেলাম ভারতীয় দূতাবাসে।
কিন্তু…।
.
ঘটনার পর তিন মাস কেটে গেছে। রোমিলার কোনও খবর পাইনি। বহু চেষ্টা করেছি, বহু লেখালিখি করেছি, কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। কাহরেইন-এ লোক মারফত খবর নিয়েছি, না, ওই বর্ণনা অনুযায়ী কোনও মেয়েকে কেউ দেখেনি। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব কিছুই করতে বাকি রাখিনি। মোহন খান্নাও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে, কিন্তু ফলাফল তাতেও শূন্য। আমাদের আদরের ছোট বোনের কোনও হদিস আজও পাইনি।
তাই শুধু ভাবি, এর জন্যে কে দায়ী? নিয়তি, না আমি নিজে?
.
উপসংহার
আকাশি ভ্যান যেখানে এসে থামল সেটা শেখ হারিদের প্রাসাদ।
রোমিলাকে রক্ষীরা ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখল একটা ছোট ঘরে। প্রথমবার প্রাসাদে এসে যে-বিলাসবহুল আপ্যায়ন ও পেয়েছিল এ যেন তার ঠিক বিপরীত।
পরের দিনটা রোমিলার জীবনে এক অতুলনীয় আতঙ্কের দিন।
সকালবেলা শেখ হারিদ এলেন ওর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু আগেকার ভদ্র নম্র ব্যবহারের ছিটেফোঁটাও এখন নেই তার মধ্যে। খুব কর্কশ রুক্ষ ভঙ্গিতে তিনি বললেন, মিস কাপুর, আপনার দাদা অত্যন্ত অন্যায় একটা কাজ করেছেন। যদি তার ভালো চান তাহলে বিনা মতলবে যা বলা হবে অক্ষরে-অক্ষরে শুনবেন। নইলে বিপদে পড়বেন।
শেখ চলে গেলেন। তখন প্রাসাদের ভৃত্যরা এসে রোমিলাকে নিয়ে গেল একটা স্নান ঘরে। ওর পোশাক খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন করা হল, তারপর সুবাসিত সাবানে ওকে স্নান করিয়ে সুগন্ধি ছড়িয়ে দেওয়া হল ওর নগ্ন দেহে। এবং ওই নগ্ন অবস্থাতেই ওকে নিয়ে যাওয়া হল প্রাসাদের পিছনদিকের এক মনোরম উদ্যানে। সেখানে ওরই মতো জনা কুড়ি নগ্ন রূপসী ঘোরাফেরা করছে। ঠিক যেন উর্বশীদের নন্দনকানন।
দুটোদিন রোমিলার স্বচ্ছন্দে কেটে গেল।
তৃতীয় দিন শেখ হারিদ বাগানে এলেন। সঙ্গে দুজন প্রৌঢ় বিদেশি অতিথি এবং একজন অনুচর। ওঁরা চারজন পায়চারি করতে লাগলেন বাগানের মধ্যে।
