তারপর ইলিয়াসের বাঁধন ছাড়িয়ে সদর দরজা খুলে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম আমি।
ভোরের আলোর দেখলাম, আকাশি ভ্যানটা খানিক দূরে দাঁড়িয়ে, তার দু-পাশে দুজন প্রহরী।
ওদের সঙ্গে ভ্যানে ওঠার আগে গাড়িতে রাখা ঝোলা-ব্যাগ থেকে আমি ইলিয়াসের দেওয়া গোলাপের তোড়াটা নিয়ে নিতে চাই। সেটাই আমার সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরতম প্রেমের একমাত্র স্মৃতি।
.
হিতেশ কাপুর
দ্বিতীয়বার পথ চিনে যেতে কোনও কষ্ট হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আয়েষার ঘরের দরজায় সামনে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে উঁকি মারতেই কারণটা পরিষ্কার হল। হাসান বিছানায় পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, জরিপ নজরে দেখছেন আয়েষার শিথিল দেহ। তার সঙ্গে দুজন সশস্ত্র প্রহরী। সকলেই দরজায় দিকে পেছন করে দাঁড়িয়ে।
নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। ঘৃণাভরা স্বর ছিটকে বেরোল আমার মুখ থেকে ও আপনারা মানুষ না পশু? এ জঘন্য কাজ আপনারা কেন করলেন?
বিদ্যুৎগতিতে হাসান ও তার দুজন অনুচর ঘুরে তাকাল। কিন্তু আমাদের দুজনকে দেখামাত্রই ওদের ভাবভঙ্গি সহজ-স্বাভাবিক হয়ে গেল।
হাসান গম্ভীর গলায় বললেন, আপনাদের এখানে আসা উচিত হয়নি, মিস্টার কাপুর। কী করে এ-ঘর আপনারা খুঁজে পেলেন?
আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম, আমার কথার জবাব দিন! দেখুন তো কী অবস্থা করেছেন মেয়েটার!–আঙুল তুলে বিছানায় শোয়া অসহায় মেয়েটিকে দেখালাম।
আপনারা শেখ হারিদের অতিথি, কিন্তু অতিথির সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। হাসান ঠান্ডা স্বরে বললেন, ছিঃ, এ বড়ই লজ্জার কথা! যান, এখনই চলে যান।
কিন্তু ইতিমধ্যে মোহন খান্নার জেদ চেপে গেছে, ও বলল, যাব, কিন্তু তার আগে এই জঘন্য অত্যাচারের কারণ জানতে চাই। আপনাকে বলতেই হবে।
হাসান একই রকম গলায় বললেন, আপনাদের কাছে কৈফিয়ত দিতে আমি বাধ্য নই, কিন্তু আপনারা যখন এত পীড়াপীড়ি করছেন তখন শুনুন। তবে তারপর কিন্তু চলে যেতে হবে। আয়েষার দিকে মুখ ফিরিয়ে আঙুল তুললেন হাসান : এই মেয়েটির বাবা মাননীয় শেখ হারিদ সম্পর্কে অসম্মানজনক কিছু মন্তব্য করেন তার পত্রিকায়। সুতরাং তাকে উচিত শাস্তি দিতে তার মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে দেশের আরও দশজন নাগরিক সাবধান হবে। শেখের বিরুদ্ধে যাওয়ার আগে তারা দশবার ভাববে।
কিন্তু এর এ-অবস্থা করলেন কেন?–উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলাম।
হাসান সহজ সুরে বললেন, সবই আল্লার ইচ্ছে। আমাদের শেখ একজন অতি সাধারণ মানুষ। তাঁর বিশ্বাস এসব ব্যাপারে কোনও উপযুক্ত শাস্তি বেছে দেওয়া তাঁর একার পক্ষে অসম্ভব। তাই তিনি মহান আল্লার শরণাপন্ন হয়েছেন। এই মেয়েটিকে রাখা হল পোষা পাখির বাগানে। সঙ্গে রাখা হল আরও অনেক মেয়েকে। তাদের প্রত্যেকের বন্ধু অথবা আত্মীয়, কেউ না কেউ শেখের বিরুদ্ধে অন্যায় আচরণ করেছে। পোষা পাখিদের অনেকেই অক্ষত অবস্থায় এক বছর পরে ছাড়া পায়। কিন্তু শেখ হারিদের অতিথিরা যাদের বেছে নেয় তাদের শাস্তি পেতে হয়। প্রত্যেক অতিথিকে বলা হয় শয্যাসঙ্গিনী বেছে নিতে। বেছে নেওয়ার পর প্রত্যেককে জিগ্যেস করা হয়। সঙ্গিনীর দেহের কোন অংশ তার চোখে সবচেয়ে সুন্দর। তারপর সেই অঙ্গগুলো অস্ত্রোপ্রচার করে বাদ দেওয়া হয় পাখিদের শরীর থেকে অবশ্য অতিথির সঙ্গে সে রাত কাটানোর পর, আগে নয়। পরে যখন মেয়েটি মোটামুটি সেরে ওঠে তখন তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় তার বাড়িতে। সেখানে সে হয়ে থাকে আল্লার ন্যায়বিচারের জীবন্ত প্রমাণ।
একটু থেমে হাসান আবার বললেন, মিস্টার কাপুর, আয়েষাকে আপনিই পছন্দ করে বেছে নিয়েছিলেন, শেখ হারিদ নয়। আর ওর সুন্দর হাতের তারিফ আপনি নিজের মুখেই করেছেন, যেমন মিস্টার খান্না করেছেন তার সঙ্গিনীর পায়ের তারিফ। অতএব আল্লার বিচারের বাণী আপনাদের মুখ থেকেই বেরিয়ে এসেছে। মহামান্য শেখ হারিদকে দয়া করে এর জন্যে দায়ী করবেন না।
আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। চিৎকার করে ফেটে পড়লাম হাসানের ওপর ও নির্লজ্জ শয়তান কোথাকার! তোমরা ওই মেয়েগুলোকে নিয়ে নৃশংস খেলায় মেতেছ আর দায়ী করছ ভগবানকে? এর মাশুল তোমাদের কড়ায় গণ্ডায় গুণতে হবে।
হাসান এবারে সত্যি-সত্যি হাসলেন, নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের হাসি। আমার শরীরে যেন আগুন ধরে গেল।
মাননীয় শেখকে আপনাদের অভিযোগের কথা জানানো হবে এবং তাতে যে তেলের চুক্তির বিশেষ সুবিধে হবে তা মনে হয় না। হাসান তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে লাগলেন, ভারতের আর্থিক অবস্থার কথা সারা দুনিয়ার সবাই জানে। তেলের চুক্তি সফল হওয়াটা আপনাদের পক্ষে খুব জরুরি। সুতরাং এখনও যদি সব হম্বিতম্বি ছেড়ে ক্ষমা চেয়ে নেন তা হলে এ-ব্যাপারটা যাতে বেশিদূর না গড়ায় সেদিকে আমি নজর দিলেও দিতে পারি।
লোকটার স্পর্ধা আর নিশ্চিন্ত ভাব আমাকে জ্ঞানহীন ক্ষিপ্ত করে তুলল। সমস্ত ধৈর্য ও সহ্যশক্তির বাঁধন পলকে ছিঁড়ে গেল। চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়লাম একজন সশস্ত্র রক্ষীর ওপর। চোখের নিমেষে তার রিভলভারটা তুলে নিলাম হোলস্টার থেকে। কিন্তু সেটা উঁচিয়ে ধরার আগেই হাসান লাফিয়ে পড়লেন আমার ওপর। রিভলভারটা কবজার জন্যে শুরু হল দুজনের ধস্তাধস্তি।
