কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ইলিয়াস বলল, শেখ হারিদকে তুমি কতটুকু চেনো?
আমি কোনও জবাব দিলাম না। কারণ শেখ হারিদের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে ইলিয়াস যে যথেষ্ট খবর রাখে সেটা আমি দু-দিনের আলাপেই টের পেয়েছি।
ইলিয়াস অনেক অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কেটে কেটে বলল, রোমিলা, তুমি কাল জানতে চেয়েছিলে আমার বোন আলেয়ার কী হয়েছে ও এখন কোথায়। তখন তোমাকে কোনও উত্তর দিতে পারিনি আমি। কিন্তু এখন, নিজের প্রয়োজনেই সে-উত্তর আমাকে দিতে হবে।
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল ইলিয়াস। হাতে হাত ঘষল। মাথার চুলে আলতো করে হাত বোলাল। অবশেষে ভারী গলায় বলল, আলেয়ার কী হয়েছে তা জানি না, তবে ও কোথায় আছে তা জানি। ও শেখ হারিদের কাছে গত পাঁচ মাস ধরে বন্দি।
আমার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। ঘরটা যেন দুলছে। বুকের ভেতরে ভূমিকম্পের তোলপাড় শুরু হয়েছে যেন। আলেয়া শেখ হারিদের কাছে বন্দি! কী অপরাধে?
সেই কথাটাই ইলিয়াসকে জিগ্যেস করলাম। ও ক্লান্ত স্বরে বলল, অন্যায় আলেয়া করেনি, করেছিলাম আমি। কাগজে একটা লেখা লিখেছিলাম শেখ হারিদের শোষণের বিরুদ্ধে। কাহূরেইন এর জনসাধারণকে সচেতন করতে চেয়েছিলাম শেখের অন্যায়-অবিচার আর শোষণ সম্পর্কে। চেয়েছিলাম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়ছিল ইলিয়াস। ওর ফরসা গাল লাল হচ্ছিল ক্রমে ক্রমে। সামান্য দম নিয়ে ও বলল, সেটাই শেখ জানতে পারেন। কিন্তু আমার গায়ে উনি আঁচড়টি পর্যন্ত কাটেননি। শুধু থাবা বসিয়েছেন আমার মনে। আলেয়াকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল তার লোকেরা। হারিদের প্রাসাদে কোনও অন্তরালে বন্দি করে রাখল।
কিন্তু এ তো অন্যায়! আমি চিৎকার করে উঠলাম। ইলিয়াসদের নিস্তব্ধ বাড়ি কেঁপে উঠল ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে।
আমার কথায় তেতো হাসি হাসল ইলিয়াস ও অন্যায়! এখানে ন্যায়-অন্যায়ের মালিক তো শেখ হারিদ নিজে। তিনি যা করেন সেটাই আইন, সেটাই ন্যায়! একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেওয়াটা তাঁর শখ, যদিও সেটা আসলে একরকম মানসিক বিকৃতি।
আলেয়ার আর কোনও খোঁজ পাওনি?
না, খোঁজ পাইনি। আর কোনওদিন খোঁজ পাব কিনা জানি না। ইলিয়াস বলল, তা ছাড়া শেখ যে-ধরনের শাস্তি দেন বলে শুনেছি..।
আর কিছু বলল না ইলিয়াস। চুপ করে রইল।
আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল। কী বলব, কী বলা উচিত, তা যেন বুঝে উঠতে পারছি না।
অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম দুজনে। খোলা জানলা দিয়ে দেখছি রাতের আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে।
একসময় আমি বললাম, আমি এখন কী করব, ইলিয়াস?
ইলিয়াস মুখ নীচু করে বসেছিল, সেই অবস্থাতেই বলল, তোমাকে কোনওরকম সাহায্য আমি করতে পারব না, রোমিলা। কারণ শেখের বিচারে সেটা আর-একটা অন্যায় হবে। আর তখন..তখন…ইলিয়াসের শরীর কেঁপে উঠল। মুখে হাত চাপা দিল ও। বিকৃত স্বরে বলল, তখন ওরা আমার ছোট বোনকে ধরে নিয়ে যাবে, নাজমাকে ধরে নিয়ে যাবে!
হঠাৎই মুখ তুলল ইলিয়াস। দু-হাতে আমার কাঁধ চেপে ধরল। প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে রুদ্ধ কণ্ঠে বলল, রোমিলা–আমার রোমিলা, তোমার জন্যে আমি প্রাণ দিতে পারি, কিন্তু নাজমা যে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি। ও ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই। আমি ছাড়া ওরও তো আর কেউ নেই! পিসির তো দিন ফুরিয়ে এল, কিন্তু নামার জীবন যে সবে শুরু।
আমি ইলিয়াসের সজল চোখের দিকে চেয়ে রইলাম। নিজের বিপদের অনুভব ইলিয়াসের যন্ত্রণার তরঙ্গে কোথায় ভেসে যেতে লাগল। নাজমা–অপরূপ স্বর্গীয় পুতুল-পুতুল মেয়েটা, ওকে নৃশংস শেখ শাস্তি দেবেন একথা ভাবতেই আমার বুক কেঁপে উঠল।
এমন সময় নিস্তব্ধতা ভেদ করে শুনতে পেলাম গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন। ইলিয়াস বিছানা ছেড়ে উঠল। জানলার কাছে গেল দেখতে।
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। রুমালে চোখ মুছে যখন তাকালাম তখন ইলিয়াস ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর গভীর দুটো চোখে অতল যন্ত্রণার ছায়া।
ওরা এসে গেছে। অস্ফুট স্বরে ইলিয়াস বলল।
আকাশি ভ্যানটা এসে গেছে! আমি জানতাম, ওরা আসবেই।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, নাজমাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।
ইলিয়াস আমার কাছে এগিয়ে এল। ছোট্ট করে বলল, চলো।
ওর সঙ্গে নাজমার ঘরে এলাম। আকাশ আরও ফরসা হয়েছে। জানলা খুলে পরদা সরিয়ে দিল ইলিয়াস। ভোরের পবিত্র আলো এসে পড়েছে বিছানায় ঘুমন্ত নাজুমার মুখে। ওর পাশেই শুয়ে বৃদ্ধা পিসিমা। আমি প্রাণভরে নাজমাকে দেখলাম। ও ভালো হয়ে উঠুক।
একসময় ইলিয়াসকে বললাম, চলো, নীচে যাওয়া যাক।
ইলিয়াস আমাকে সঙ্গে করে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
তারপর সিঁড়ি দিয়ে আমরা নীচে নামতে লাগলাম।
উঠোনে এসে ইলিয়াস হঠাৎ ডুকরে উঠল। আমাকে জাপটে ধরল দু-হাতে। বলল, না রোমিলা, এ হয় না। চলো, পেছনের দরজা দিয়ে আমরা পালিয়ে যাই!
আমি হাসলাম। ওর মাথার চুল আদর করে ঘেঁটে দিলাম। বললাম, তা হয় না। নাজমাকে আমার ভালোবাসা দিয়ো।
ইলিয়াস আমাকে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল আর বলতে লাগল, আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব, রোমিলা! চিরকাল অপেক্ষা করব! একদিন তুমি ফিরে আসবেই। বলো, আসবে না?
আমি হেসে বললাম, রিপোর্টার, তুমি এত সুন্দুর, তোমার চোখ এত সুন্দর, তোমার মন এত সুন্দর…যেখানেই থাকি, ফিরে আমাকে আসতেই হবে।
