আবছা চেনা রাস্তাগুলো দিয়ে ছুটে চলার সময় দাদা আর মোহনদার কথা মনে পড়ল। ওদের কোনও বিপদ হয়নি তো? আমাকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিয়ে ওরা পুরোপুরি নিরাপদ হতে পারল কিনা কে জানে।
ভালো-মন্দ নানান ভাবনা ভাবতে-ভাবতে পথের নিশানা কখন হারিয়ে ফেলেছি জানি না। যখন খেয়াল হল তখন আমি অজানা এক বড় রাস্তায়। শিরা-উপশিরা দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইতে লাগল। মাথার ভেতরে ঝড় উঠল যেন। চিন্তা-স্মৃতি সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। পথের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বিশ্রাম নিলাম। তারপর ড্যাশবোর্ডের আলোর রোড ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম পুরোনো স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার। ইলিয়াসের বাড়ির রাস্তা যেমন করে হোক চিনে নিতেই হবে আমাকে।
আঘণ্টার চেষ্টায় সফলতা এল। সঠিক রাস্তা খুঁজে পেলাম। তারপর অত্যন্ত সতর্কভাবে ধীরে-ধীরে গাড়ি চালিয়ে রাস্তার পর রাস্তা পেরিয়ে যেতে লাগলাম। অবশেষে একসময় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।
এখন আমার চোখের সামনে ইলিয়াসের বাড়ি। রাতের আলো-আঁধারিতে কেমন রহস্যময় দেখাচ্ছে।
আমি গাড়ি থেকে নামতেই নিজেকে কেমন অসহায় মনে হল। এতক্ষণ গাড়ির ভেতরে থাকায় এক ধরনের নিরাপত্তা অনুভব করছিলাম। এখন সেই আড়াল ছেড়ে নির্জন রাতের দুনিয়ায় পা রাখতেই মনে হল, এক বিরূপ পরিবেশে আমি হাজির হয়েছি। আমার চারপাশে বিপদ। যে কোনও মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারি আমি।
আতঙ্ক দ্বিধা ইত্যাদি কাটিয়ে উঠলাম কয়েক পলকেই। এবং সঙ্গে-সঙ্গে ছুটে গেলাম ইলিয়াসের বাড়ির দরজা লক্ষ করে।
দরজায় পৌঁছতেই বুঝলাম যা আশা করেছিলাম তাই, দরজা বন্ধ!
নিশুতি রাতে দরজা ধাক্কা দিয়ে শোরগোল তুলতে একটু সঙ্কোচ হল। কিন্তু পরক্ষণেই প্রয়োজন ছাপিয়ে গেল সঙ্কোচকে।
ইলিয়াস! ইলিয়াস! বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে ডেকে উঠলাম আমি।
কোনও সাড়া নেই। অন্ধকার বাড়িটা গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে।
ইলিয়াস! ইলিয়াস! আরও জোরে ডেকে উঠলাম আমি। একইসঙ্গে ধাক্কার তীব্রতাও বেড়ে গেল।
সচকিতে চারপাশে তাকালাম। আমাকে অনুসরণ করে কেউ এসে পৌঁছয়নি তো ইলিয়াসের বাড়ির কাছাকাছি? মনে পড়ল, গতকাল আমার আলফা স্পোর্টস অনুসরণ করে এখানে এসে হাজির হয়েছিল আকাশি রঙের ভ্যানটা। ওরা ইলিয়াসের বাড়ি চিনে গেছে। তা হলে…।
কে?
চিন্তায় ছেদ পড়ল। চোখ তুলে দেখি দোতলার একটা ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। একটা জানলার পরদা সরে গেছে। সেখানে এক পুরুষের সিট। এবং কণ্ঠস্বর ইলিয়াসের।
ইলিয়াস! দরজা খোলো! আমি রোমিলা!–আমার আশঙ্কা কেটে গিয়ে আশ্বাস ভরসা ফিরে এল। চোখে জল এসে গেল আমার। ভাবতে পারিনি পথ চিনে এখানে আমি আসতে পারব, দেখা পাব মহম্মদ ইলিয়াসের।
ছায়ামূর্তিটা দ্রুত জানলা থেকে সরে গেল। তারপর পায়ের শব্দ। অবশেষে সদর দরজা খুলল। আমি ইলিয়াসের দরাজ বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বললাম, ইলিয়াস, ভীষণ বিপদ! আমাকে বাঁচাও।
সবল দু-হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরল ইলিয়াস। বুঝল আমার শরীর ক্লান্তিতে শিথিল হয়ে এলেও উত্তেজনায় থরথর কাঁপছে।
কী হয়েছে, রোমিলা?–জানতে চাইল ইলিয়াস। কিন্তু পরক্ষণেই কী ভেবে বলল, না, থাক। আগে ওপরে চলো, তারপর কথা হবে।
সদর দরজা বন্ধ করে আমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল ইলিয়াস। তারপর উঠোন পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম দুজনে।
যে-ঘরে এসে বসলাম, সে-ঘরটা গতকাল দেখিনি। ছিমছামভাবে সাজানো ইলিয়াসের ঘর। মাঝারি আলোয় ঘরটা কেমন এক রহস্যময় চেহারা নিয়েছে। বিছানার চাদর এলোমেলো। ইলিয়াস নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছিল। এখন ভালো করে তাকিয়ে দেখি ওর চোখে ঘুম জড়িয়ে আছে। তাতেই মনে হচ্ছে ও আবার কিশোর বয়েসে ফিরে গেছে। এই বিপদের মুহূর্তেও ওকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে, আদর করতে ইচ্ছে করছে। ও ছাড়া আমার যেন আর কেউ নেই।
আমাকে ধরে বিছানায় বসাল ইলিয়াস। নিজেও বসল। দেখলাম, সামনের একটা কারুকাজ করা টেবিলের ওপর রয়েছে আমার দেওয়া হলুদ ফুলের গুচ্ছ। সযত্নে ফুলদানিতে সাজিয়ে রেখেছে। ইলিয়াস। মনে পড়ল, ওর লাল গোলাপের ঋণ আমি শোধ করতে পারিনি।
কী হয়েছে রোমিলা? ইলিয়াস নরম স্বরে জানতে চাইল।
আমি যেটুকু জানি ওকে খুলে বললাম, আমার দাদা হিতেশ কাপুর ও তার অফিস কলিগ মোহন খান্না বোধহয় শেখ হারিদের সঙ্গে কোনও বিপদে জড়িয়ে পড়েছে। কারণ, আমাকে ঘোর রাতে ডেকে ওরা গাড়ি নিয়ে রওনা করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তলে-তলে কী কাণ্ড ওরা করছে। তা জানি না। তবে এটুকু জানি, ওরা অন্যায় কোনও কাজে স্বেচ্ছায় জড়িয়ে পড়বে না। শেখ হারিদের সঙ্গে বোধহয় ওদের কোনও গোলমাল শুরু হবে। দাদার কথায় সেরকমই মনে হয়েছে।
ইলিয়াস একাগ্রমনে সব শুনতে লাগল।
ওকে আরও বললাম, দাদা আমাকে বাসিরায় যেতে বলেছিল। সেখানে গিয়ে ইন্ডিয়াব এমব্যাসিতে আশ্রয় নিতে বলেছিল। কিন্তু রাতবিরেতে আমি সেখানে পথ চিনে যেতে ভরসা পাইনি। সেইজন্যে আমি তোমার কাছে ছুটে এসেছি, ইলিয়াস! আমাকে তুমি বাঁচাও, বাসিরায় পৌঁছে দাও!
ইলিয়াসের চোয়ালের রেখা ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। বুঝতে পারছি, সংশয় ও দ্বিধার কোনও আলোড়ন চলছে ওর বুকের ভেতরে।
