হঠাৎই একটা মতলব মাথায় আসাতে হেসে উঠলাম। তারপরই ছুরিটাকে পকেটে রেখে চটপট গাছে উঠে পড়লাম। দুটো ডালের খাঁজে সাবধানে গেঁথে দিলাম ওটা। গাছে উঠে খোঁজার কথা পুলিশের নিশ্চয়ই মাথায় আসবে না।
গাছ থেকে নেমে হাতঘড়ির দিকে নজর দিলাম। পৌনে বারোটা। ফিরে যাওয়ার জন্যে গাড়িতে উঠে গাড়ি ছাড়তেই মনে পড়ল সেই কাগজটার কথা। ইব্রাহিমের পকেট থেকে পাওয়া চিরকুটটার কথা। কবুতর, রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশ। কবুতরে রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশে কি কিছু ঘটবে নাকি? কবুতরের ঠিকানাটা ভাগ্যিস মনে রয়েছে এখনও। অতএব ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ঝড়ের বেগে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম কবুতরের উদ্দেশে। যে করেই হোক, বারোটা পঁয়তাল্লিশের আগেই কবুতরে আমার পৌঁছোনো চাই-ই চাই! আরও জোরে চাপ দিলাম অ্যাকসিলারেটরে।
শেষ পর্যন্ত এসে হাজির হলাম কবুতরে। হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত বারোটা চুয়াল্লিশ। আর এক মিনিট বাকি।
গাড়ি ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সামনেই দেখা যাচ্ছে প্রসাদজির বাগানবাড়ি কবুতর। কবুতর নাম সত্যিই সার্থক হয়েছে। গোটা বাড়িটা ধপধপে সাদা। যেন কোনও রাজহংসী ডানা মেলে রয়েছে উড়ে যাওয়ার জন্যে।
কবুতরের সদর গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। বাড়িটার কোনও ঘরেই আলো দেখা যাচ্ছে না। নিঝুম নিস্তব্ধ। সুরকি ঢালা পথ ধরে এগিয়ে চললাম। কিন্তু কিছুটা যেতেই এক বিকট শব্দ ভেসে এল বাড়ির ভেতর থেকে।
গুড়ুম।
নিশ্চয়ই গুলির শব্দ!
শব্দটা একতলার কোনও ঘর থেকেই এল বলে মনে হল। পরমুহূর্তেই দোতলার একটা ঘরে আলো জ্বলে উঠল। আমি তীরবেগে ছুটলাম শব্দের উৎস লক্ষ্য করে। কে জানে, পরমুহূর্তে আমি কী দেখতে চলেছি!
দৌড়ে গিয়ে উঠোন পার হয়ে একতলার একটা ঘরের কাছে পৌঁছোলাম। ঘরের সবকটা ফ্রেঞ্চ উইন্ডোই ভেতর থেকে আটকানো। অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছে না। জানলার শার্সিগুলো ধরে টানাটানি করলাম। নাঃ, ভেতর থেকেই বন্ধ।
হঠাৎই আমি একটু ভয় পেলাম। এইরকম অবস্থায় কেউ যদি আমাকে আবিষ্কার করে, তবে! একথা মনে হতেই আবার ছুটলাম গাড়ি লক্ষ্য করে। গাড়িতে পৌঁছে আর-একবার ঘুরে তাকালাম কবুতরের দিকে। সেই আলোটা এখন নিভে গেছে। গাড়িতে বসে স্টার্ট দিলাম।
গাড়ি চালাতে চালাতে আবার মনে হল ইব্রাহিমের পকেটে পাওয়া সেই চিরকূটটার কথা। ইব্রাহিমের এখানে আসার কথা ছিল। আর তার বদলে এসেছি আমি। একেই বলে ভাগ্যের পরিহাস। কিন্তু সুচরিতা? সুচরিতা যদি কবুতরে পৌঁছে থাকে, তবে ও গেল কোথায়! গুলির আওয়াজে কি কারওরই ঘুম (একজন বাদে, যার ঘরে আলো দেখা যাচ্ছিল) ভাঙল না!
যাই হোক, আমি আবার আসব এই কবুতরে মিটিংয়ে যোগ দিতে। নোবডি ক্যান স্টপ মি ফ্রম কামিং হিয়ার। আপনা থেকেই আমার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
.
পরদিন ভোরবেলা খবরের কাগজে খবরটা দেখে চমকে উঠলাম। কবুতরে আমার প্রায় চোখের সামনে গতকাল রাতে যিনি নিহত হয়েছেন, তিনি সিরাজনগরের বর্তমান প্রধান কুমার রণজিৎ সেন।
তা হলে মিটিং-এ এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তাকে খুন করে কার লাভ? কেউ কি চেয়েছিল যে, কুমার রণজিৎ মিটিংয়ের আলোচনায় যোগ না দেন। কিন্তু কেন?
এ কী জটিল রহস্যের মুখোমুখি হলাম! রহস্যময় পাণ্ডুলিপি। ইব্রাহিমের মৃত্যু। সুচরিতা চৌধুরির নাম ধার করে লেখা প্রেমপত্র। সুচরিতা চৌধুরীকে মিটিংয়ে যেতে বাধা দেওয়া। কুমার রণজিতের মৃত্যু। লালপাঞ্জা–উঃ, কে জানে এর পরের অধ্যায় কী!
যা হোক, কবুতরে যাওয়ার জন্যে তৈরি হলাম। অসুবিধে হবে না। কারণ, সুচরিতা চৌধুরীর গাড়িটা সঙ্গে রয়েছে। মিনিটদশেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে গাড়িতে করে রওনা দিলাম। উদ্দেশ্য– কবুতর। কে জানে, হয়তো আরও কী রহস্য সেখানে আমার জন্যে ওত পেতে রয়েছে।
কবুতরে পৌঁছেই প্রথম যেটা চোখে পড়ল তা হল সারা বাড়ি জুড়ে একটা থমথমে ভাব। গেটের কাছে গাড়ি থামিয়ে সুরকি ঢালা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। বাড়ির কাছে পৌঁছোতেই কবুতরের একতলার বাঁদিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল সুচরিতা চৌধুরী। গাঢ় বেগুনি রঙের শাড়িতে কী সুন্দরই না দেখাচ্ছে!
কিছুক্ষণ বোধহয় হাঁ করে চেয়েছিলাম ওর দিকে। চমক ভাঙতেই জোর করে হাসার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু সুচরিতার চোখের তারায় আশঙ্কার ছায়া কেঁপে উঠল। হরিণী-গতিতে ও এগিয়ে এল আমার কাছে। অস্ফুটভাবে বলল, আপনি এখানে। আপনার-আপনার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।
একটু অবাক হলেও সে-ভাবটা মুখে প্রকাশ করলাম না। কবুতরের বাইরে এসে দুজনে উঠে বসলাম গাড়িতে। গাড়ি ছেড়ে দিলাম। লক্ষ্য, উদ্দেশ্যবিহীন।
কিছুদূর যাওয়ার পর আড়চোখে তাকালাম সুচরিতার দিকে। ওর চোখে সপ্রশ্ন দৃষ্টি দেখে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম, ভয় নেই। ইব্রাহিমকে খুঁজে বের করতে পুলিশের অন্তত দিনদুয়েক লাগবে।
তারপর ওকে শুরু থেকে আমার কাহিনি শোনালাম–সব বললাম। শেষে জিগ্যেস করলাম, কিন্তু সুচরিতা, এদিকের খবর কী?
একথা বলেই হৃৎপিণ্ডে এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। চোখ, মুখ, কান লাল হয়ে উঠল সর্বনাশ! ওকে নাম ধরে ডেকে ফেলেছি!
কিন্তু এ কী! সুচরিতা মাথা নীচু করে ছিল। আমার দিকে চোখ তুলে এক চিলতে হাসল। আমি সাহস করে বাঁ হাতটা ওর হাতের ওপর রাখলাম। বুঝলাম আমরা দুজনেই দুজনকে জানতে চাই।
