এই মুহূর্তে কারও সাহায্য খুব দরকার এই ভেবে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল সুচরিতা। তখনই দেখল একজন সুপুরুষ যুবক ওর বাড়ির নেমপ্লেটের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
হাতে যেন চাঁদ পেল সুচরিতা। কিন্তু ওকে দেখামাত্রই লোকটি বলে উঠল, মিসেস চৌধুরী, তাই না?
আপনি আমাকে চিনলেন কেমন করে?
একটা সিনেমা-ম্যাগাজিনের একটা ছেঁড়া পাতা তুলে ধরল লোকটি : আমার নাম কাঞ্চন মৈত্র।
দেখুন, ইতস্তত করে শুরু করল সুচরিতা, মানে, আমার ঘরে একজন লোক মরে পড়ে আছে–মানে, তাকে কেউ খুন করেছে। আপনি যদি পুলিশে…মানে…।
তার বেশি আর বলতে হল না। কোথায় বডি? বলে তৎপর হয়ে উঠল কাঞ্চন। সুচরিতা জবাব দেওয়ার আগেই ওকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকল সে।
সুচরিতার মাথা ঠিকঠাক কাজ করছিল না। তাই বোধহয় প্রথম দেখাতেই একজন অচেনা মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলেছে। কিন্তু…।
কোনও উপায় না দেখে সদর দরজা বন্ধ করে কাঞ্চনকে অনুসরণ করে শোবার ঘরে এল সুচরিতা।
ঘরের অবস্থা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল কাঞ্চন। তার মুখ দিয়ে বিস্ময়ের শব্দ বেরিয়ে এল। তারপর নিজেকে সামলে বলল, বাড়িতে আর কে-কে আছে?
আপাতত কেউ নেই, তবে একজন কাজের লোক আছে–এখন বাইরে গেছে।
সে এলে দূরের একটা দোকান-টোকানে পাঠিয়ে দেবেন। ততক্ষণে আমি দেখি কদুর কী করতে পারি। বলে চটপট কাজে লেগে গেল সে।
তাকে সাহায্য করতে নিজেও হাত লাগাল সুচরিতা।
প্রায় একঘণ্টা পর বাইরের দরজায় কারও নক করার শব্দ শোনা গেল।
ওই বোধহয় যতীন এসেছে, বলে কাঞ্চনের দিকে একটা ইশারা করে বলল, প্লিজ কোনও শব্দ করবেন না। আমি এখুনি আবার ওকে বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। সুচরিতা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ইতিমধ্যে লাশটাকে একটা ট্রাঙ্কের মধ্যে রাখা হয়ে গেছে। তখনই হঠাৎ ছোরার হাতলটার দিকে চোখ গেল কাঞ্চনের। সে কি ভুল দেখছে নাকি? এই তো! এই তো লেখা রয়েছে পরিষ্কারভাবেঃ সুচরিতা চৌধুরী।
সর্বনাশ! তা হলে তো ছুরিটার আলাদা একটা ব্যবস্থা করতে হয়! চটপট হাতে রুমাল জড়িয়ে এক হ্যাঁচকায় ছুরিটাকে বের করে নিল কাঞ্চল। রক্ত এতক্ষণে জমাট বেঁধে আসায় বিশেষ অসুবিধেয় পড়তে হল না।
এই সময় আবার ঘরে এসে ঢুকল সুচরিতা। ওকে দেখেই কাঞ্চন বলল, দেখুন তো, কিছুটা ব্রাউন পেপার আনতে পারেন কি না। এই ছোরাটাকে মুড়ে একটা প্যাকেটমতো করতে হবে।
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল সুচরিতা।
ট্রাঙ্কের ডালাটা বন্ধ করতে গিয়েই দ্বিতীয় বিস্ময়। একচিলতে কাগজ উঁকি মারছে ইব্রাহিমের পকেট থেকে।
হ্যাঁ, এ-বিষয়ে আর কোনও সন্দেহই নেই? মৃত লোকটি হোটেল কন্টিনেন্টালের সেই রহস্যময় বেয়ারা ইব্রাহিম।
নীচু হয়ে চিরকুটটাকে বের করে নিল কাঞ্চন। তাতে লেখাঃ কবুতর, রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশ
কাগজটা পকেটে গুঁজল সে।
কিছুক্ষণ পরই ব্রাউন পেপার হাতে ঘরে ঢুকল সুচরিতা।
সব কাজ সেরে তৈরি হয়ে কাঞ্চন বলল, মিসেস চৌধুরী, আপনি ঘরটাকে আর-একবার ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রাখুন। আমি আপনার গাড়িটা নিয়ে এগুলোর ব্যবস্থা করতে রওনা হচ্ছি। গাড়িটা হয়তো কাল আপনাকে ফেরত দিয়ে যাব। আশা করি, আপনি আমাকে বিশ্বাস করবেন।
সুচরিতা এমনভাবে হাসল যার অর্থ, বিশ্বাস না করে উপায় কী!
ওরা দুজনে মিলে ট্রাঙ্কটাকে বাইরে এনে গাড়ির ডিকিতে রাখল। কাঞ্চন গাড়ি ছেড়ে দিল। যাওয়ার আগে সুচরিতার দিকে আশ্বাসের একটা মিষ্টি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে গেল।
সুচরিতা ভাবছিল। মিটিং আগামীকাল। কিন্তু আজ রাত থেকেই সকলের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে কবুতরে। ওরও আজ রাতেই যাওয়ার কথা।
তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল সুচরিতা। যতীন ফিরে এলেই ও বেরোবে। লক্ষ্য কবুতর।
মিটিং-এ ওর থাকাটা কি বিপজ্জনক? তাই কি এই রহস্যময় জঘন্য খুনের খেলা? কিন্তু কারা, কেন, মিটিংয়ে ওর হাজিরা চায় না? সেটাই–সেটাই এখন জানতে চায় সুচরিতা।
.
কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা দেখার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত খুনই হল ইব্রাহিম! কার দলের হয়ে কাজ করছিল ও লাল পাঞ্জা কি? হতে পারে। হয়তো তাদের কথার অবাধ্য হয়েই সুচরিতা চৌধুরীকে ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল ইব্রাহিম। তাই হয়তো লালপাঞ্জার এই নিষ্ঠুর শাস্তি।
কিন্তু চিঠিগুলো গেল কোথায়? সুচরিতা চৌধুরী বাড়িতে ঢোকার আগে কি কেউ ঢুকেছিল ওঁর বাড়িতে? গাড়ি চালাতে চালাতে এই সব কথা মনে পড়ছিল। অথচ একইসঙ্গে আর-এক চিন্তা। সেটা হল, এই লাশটাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লুকিয়ে ফেলতেই হবে–যাতে এটা খুঁজে বের করতে অন্তত দু-তিনদিন সময় লাগে।
হঠাৎই একটা কথা মনে এল। সুচরিতা চৌধুরীকে এই খুনের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন? ওঁর বাড়িকেই খুনের জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হল! ছুরির বাঁটেও ওঁরই নাম লেখা! অর্থাৎ, কেউ-কেউ কবুতরে সুচরিতা চৌধুরীর উপস্থিতি চান না। কারণ? সুচরিতা মিটিংয়ে হাজির হলে কি কোনও বিপদের সম্ভাবনা আছে? কেন? কার?
চিন্তার জালে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। স্টিয়ারিং ধরে সোজা হয়ে বসলাম। শহরতলিতে চলে এসেছি বুঝতে পারলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্জন রাস্তার ধারে একটা গাছের কাছে গাড়ি থামালাম। ক্যারিয়ার খুলে ট্রাঙ্কটাকে বের করে রাস্তার ধারের নদৰ্মার দিকে গড়িয়ে দিলাম। দু চারবার উলটে-পালটে ট্রাঙ্কটা নদৰ্মার মধ্যে গিয়ে পড়ল। এইবার ব্রাউন পেপারে মোড়া ছুরিটাকে পকেট থেকে বের করে চিন্তা করতে লাগলাম, কোথায় লুকোনো যায় এটাকে।
