এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালাতে চালাতে বললাম, সুচরিতা, আমরা একটা কিছু করতে পারি না?
কী? আনন্দে, কৌতূহলে ওর মুখ ঝলমল করছিল।
না, মানে, এই যে সব রহস্য–সেগুলো সম্ভ করার চেষ্টা করলে ক্ষতি কী?
তা হলে তো দারুণ হবে। ছোট্ট মেয়ের মতো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল সুচরিতা।
আমি ওকে গতরাতের সব কথা খুলে বললাম। ও চোখ বড় বড় করে শুনল।
আমি জিগ্যেস করলাম, আচ্ছা, দোতলার বাঁদিক থেকে তিন নম্বর জানলাটা কার ঘরের?
ওই ঘরেই কি আলো জ্বলতে দেখেছিলে তুমি?
মনে তো হয় তাই।
কিন্তু, তা হলে তো ঠিক মিলছে না। একটু চিন্তিতভাবেই জানাল সুচরিতা।
কেন? কেন?
ওই ঘরটায় মানেকজির এক দূরসম্পর্কের বোন থাকেন। তিনি তো বেশ কয়েকদিন হল আছেন। ওঁকে ঠিক এ-ব্যাপারে…।
মাঝপথে বাধা দিলাম আমি, বললাম, সূত্র যখন পাওয়া গেছে, তা যতই সামান্য হোক, তাই ধরেই এগোব আমরা। আমি ওই ভদ্রমহিলার সম্বন্ধে খোঁজখবর নিচ্ছি। ওঁর নাম কী?
নয়না কল্যাণী।
এবার তবে কবুতরে ফেরা যাক। বললাম আমি, কিন্তু আমার সঙ্গে কী অনেক কথা আছে। বলছিলে যেন? হঠাৎই মনে পড়ায় প্রশ্ন করলাম।
কুমার রণজিৎ গতকাল রাতে রিভলভারের গুলিতে মারা গেছেন।
কাগজে পড়েছি। তুমি তাকে দেখেছ নাকি?
না। তবে সিরাজনগরে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল।
সঙ্গে-সঙ্গে একটা সম্ভাবনা বিদ্যুৎ ঝলকের মতো আমার মানসচক্ষে ধরা পড়ল। চকিতে ব্রেক কষে দাঁড় করালাম গাড়িটাকে। ব্যাক করে ঘুরিয়ে নিয়ে হাওয়ার বেগে আবার গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম।
এ কী! কী হল? ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠল সুচরিতা।
এখন আর কোনও প্রশ্ন নয়। এই মুহূর্তে আমাদের কবুতরে পৌঁছানো দরকার। দাঁতে দাঁত চেপে বললাম আমি, তোমার কবুতরে পৌঁছোনো বন্ধ করার চেষ্টা যারা করছিল তাদের উদ্দেশ্য আমি বোধহয় বুঝতে পেরেছি।
তার মানে! কৌতূহলের ঝাপটায় যেন তলিয়ে যাচ্ছে সুচরিতা।
এই কুমার রণজিৎ সম্ভবত তোমার পরিচিত কুমার রণজিৎ নন।
সুচরিতার মুখ থেকে শুধু একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। আমি বলে চললাম, যে এখানে কুমার রণজিৎ পরিচয়ে এসেছে, সে জানে যে, তোমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল হবে। তাই কবুতরে তুমি যাতে না আসতে পারো সেই ব্যবস্থা করেছিল। হয়তো সমর বর্মনই এখানে কুমারের ছদ্মবেশে এসে শত্রুপক্ষের হাতে মারা গেছে।
কিন্তু সমর বর্মন এখানে আসবে কেন?
সুরেন্দ্র পালিত রানী সুলক্ষণার হীরের নেকলেস কবুতরেই লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। তার ম্যানাস্ক্রিপ্টেই এরকম হিন্টস ছিল। বর্মন সেই খবর পেয়ে হয়তো…।
কবুতরের বাইরে গাড়ি থামিয়ে সুচরিতার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললাম। উত্তেজনায় তখন আমার আর মাথার ঠিক নেই। হাঁটতে হাঁটতে ওকে জিগ্যেস করলাম, পুলিশ কি এখনও কবুতরে রয়েছে?
কোনওরকমে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল সুচরিতা।
কবুতরের একতলার দরজা দিয়ে দুজনে ঢুকলাম। ডানদিকেই লাইব্রেরি। সেই ঘরের দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা দিলাম দুজনে। আর সঙ্গে-সঙ্গেই চমকে উঠলাম।
কাঞ্চনবাবু, প্লিজ, একটিবার পেছন ফিরে তাকান। একটিবার দেখুন শিগগিরই। ওই দেখুন, কালো পোশাক পরা একটি নোক আপনার রেখে যাওয়া গাড়ির পেছনের সিটের নীচ থেকে বেরিয়ে এল। গাড়ির দরজা বন্ধ করে একটু হাসল। ওই দেখুন, সে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দুরের বনানীতে। লোকটি কে বলুন তো! লোকটাকে যে আপনি চেনেন না সে কথা হলফ করে বলতে পারি। প্লিজ, আমার কথা এখনও শুনুন। কবুতরে কেন এলেন। ওই লোকটি প্রথম থেকেই পেছনের সিটের নীচে লুকিয়ে ছিল। কী সাঙ্ঘাতিক কান্ড বলুন তো!
আপনাকে তো প্রথমেই বলেছিলাম, প্লিজ কবুতরে আসবেন না।
লাইব্রেরিতে পা দিয়েই আমি চমকে উঠলাম। পুলিশের লোকজন ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। লাইব্রেরির র্যাকে সাজানো থরেথরে বই। মাঝখানে রাখা টেবিলটার নীচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে তাকে। যে-লোকটি শূন্য দৃষ্টি মেলে চিৎ হয়ে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে আছে সে আমার বিশেষ পরিচিত। মেহেতা অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী, গজানন শিকদার।
সুচরিতা আমার কানে ফিসফিস করে বলল, হ্যাঁ, ইনিই কুমার রণজিৎ। আমি শিয়োর।
তা হলে কুমার রণজিৎই মারা গেছেন! শেষ পর্যন্ত কুমার রণজিৎ নিজেই গিয়ে ভঁওতা দিয়ে আমার কাছ থেকে সুরেন্দ্র পালিতের ম্যানাস্ক্রিপ্টটা হাতিয়েছিলেন! বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই যে, কুমার নিজেই গজানন শিকদারের পরিচয় নিয়ে আমার কাছে গিয়েছিলেন। তার মানে মেহেতা অ্যান্ড সন্স থেকে যে-ফোন এসেছিল, সেটা ভঁওতা দিয়ে কুমার রণজিতই করেছিলেন।
যাকগে, ওই ম্যানাস্ক্রিপ্টটার জন্যে হা-হুঁতাশ করে কোনও লাভ নেই। সুচরিতার গা টিপে ফিসফিস করে বললাম, সু, চলো আমরা যাই।
ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরোতে যেতেই একটা হাত আমার কাঁধের ওপর এসে পড়ল।
চমকে পেছন ফিরে তাকালাম আমি। চোখে পড়ল কাঠে খোদাই করা ভাবলেশহীন একটা বলিষ্ঠ চেহারা। একটু মৃদু হাসি ঠোঁটের রেখায় টেনে তিনি বললেন, মিস্টার…প্লিজ টেক ইওর সিট, বলে লাইব্রেরি-ঘরের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন।
আমি সুচরিতার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলাম।
তারপর সপ্রশ্ন দৃষ্টি নিয়ে চোখ তুলে তাকাতেই তিনি বললেন, আ অ্যাম নোন টু এভরিবডি বাই দ্য নেম ক্রসওয়ার্ড। যদিও আমার নাম ওয়াডি ক্রসবি।
