রোমিলার মুখে আতঙ্ক ছায়া ফেলল। ঘুম-ঘুম চোখে তৈরি হয়ে নিতে লাগল ও। তারই মধ্যে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার দাদা?
এখন সময় নেই। পরে সব বুঝিয়ে বলব। আমি ও মোহন প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠলাম।
রোমিলার মুখ-চোখ হতবিহ্বল। আমার এবং মোহনের দিকে তাকিয়ে ও বোধহয় বুঝতে পারল সত্যিই ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। সঙ্গে-সঙ্গে আরও দ্রুত ব্যস্ততায় সব গুছিয়ে নিতে লাগল।
মিনিটকয়েক পরেই রোমিলাকে সঙ্গে করে আমরা প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
রোমিলার ব্যবহারের জন্যে যে-গাড়িটা শেখ হারিদ দিয়েছিলেন সেটা কতকগুলো ফুলগাছের পাশে দাঁড় করানো ছিল। রোমিলা গাড়ি চালাতে জানে। সুতরাং মালপত্র পেছনের সিটে চাপিয়ে ওকে চটপট ড্রাইভারের সিটে ঠেলে বসিয়ে দিলাম। তারপর জানলায় মুখ দিয়ে বললাম, শোন রোমু, সমুদ্রের গা ঘেঁষে যে-রাস্তাটা উত্তরে গেছে সেটা ধরে ছ-সাত মাইল গেলেই কাহরেইন-এর বর্ডার পড়বে। তারপর বাসিরায় দশ মাইল ভেতরে ঢুকলেই রাজধানী আনাম। সুতরাং সেখানে পৌঁছতে তোর বড়জোর ঘণ্টাখানেক লাগবে। তারপর সোজা চলে যাবি ইন্ডিয়াব এমব্যাসিতে। আমাদের কাছ থেকে কোনও খবর না পাওয়া পর্যন্ত সেখানই থাকবি। আমরা দু-একদিনের মধ্যেই তোর সঙ্গে যোগাযোগ করব।
রোমিলা অধৈর্য হয়ে বলল, কিন্তু এখন তোমরা কী করবে? তা ছাড়া আমি সরে পড়েছি সেটা টের পেলে শেখ কী ঝামেলা বাঁধবেন কে জানে!
আমি জ্বালাধরা গলায় বললাম, আমি কী ঝামেলা বাঁধাই সেটা আগে দ্যাখ! তাছাড়া গোলমানের সময় তুই এখানে থাকিস তা আমি চাই না। অতএব ঝটপট রওনা হয়ে যা। পথে কোথাও গাড়ি থামাবি না।
গাড়ির ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও রোমিলা গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেল প্রাসাদের সিংহদুয়ার দিয়ে।
আমি আর মোহন চিন্তায় মশগুল হয়ে প্রাসাদে ফিরে এলাম।
ঘরে বসে দুজনে যখন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছি, তখন মোহন বলল, রোমিলা যে চলে গেল সে ব্যাপারে হারিদকে কী বলবে? মনে রেখো, এখনও আমাদের তেলের বৈঠকে কোনও ফয়সালা হয়নি।
আমি রাগে বিরক্তিতে বলে উঠলাম, তেলের বৈঠক গোল্লায় যাক, আমি শুধু ওই বেচারি মেয়েটার কথা ভাবছি। এখন কী হবে ওর?
হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। রোমিলা রওনা হওয়ার পর প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেছে। এতক্ষণে ও নিশ্চয়ই বর্ডার পেরিয়ে গেছে। এখন ওর আর বিপদের ভয় নেই। একথা ভেবে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম।
উঠে দাঁড়িয়ে মোহনকে বললাম, আমি আয়েষার কাছে যাচ্ছি। তুমি কি সঙ্গে আসবে, মোহন?
মোহন আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। বুঝল, কোনও কিছুতেই আমি নিরস্ত হব না। তখন সে রাজি হল।
বাইরে বেরিয়ে টিমটিমে অলিন্দ ধরে আমরা রওনা হলাম।
.
রোমিলা কাপুর
দাদার কথায় গাড়ি নিয়ে তো বেরিয়ে পড়লাম কিন্তু বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করতে লাগল।
গাড়ি ছুটিয়ে চলেছি জনহীন রাস্তা ধরে। স্টিয়ারিংয়ের ওপরে আমার হাত কাঁপছে। সারা শরীর কাঁপছে। রাতের বাতাসে ঠান্ডা আমেজ গায়ে কাঁটা তুলছে।
বারবার করে ভেবে কোনও অনুমান বা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম না, কী এমন বিপদে পড়েছে দাদারা। তবে এটুকু বুঝলাম, বিপদটা সাঙঘাতিক, নইলে আমাকে এভাবে সাত তাড়াতাড়ি রওনা করিয়ে দিত না। আর বিপদের মূলে যে শেখ আবদুল অল হারিদ, সে-ইঙ্গিত তো দাদার কথাতেই পাওয়া গেল।
আমার মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা তোলপাড় করতে লাগল।
হঠাৎই দুটো রাস্তার ক্রসিংয়ে এসে পৌঁছলাম। মনে সামান্য খটকা লাগতেই গাড়ি থামিয়ে দিলাম। দাদা বলেছে, উত্তর দিকের পথ ধরে ছ-সাত মাইল গেলেই কারেই-এর সীমান্তে পৌঁছে যাব। তারপর সীমান্ত পেরিয়ে বাসিরা। বাসিরা থেকে ইন্ডিয়াব এমব্যাসি। তাহলে সামনের ডানদিকমুখী পথটাই কি বাসিরা যাওয়ার পথ?
মনের মধ্যে সন্দেহ ও দ্বিধা উঁকি মারতেই শেখ হারিদের দেওয়া রোড-ম্যাপটার কথা মনে পড়ল। ওটা সবসময় আমি কাছে কাছে রাখি, ঝোলা-ব্যাগের মধ্যে। ঝোলা ব্যাগটা পাশেই সিটের ওপর রাখা ছিল। ওটার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে রোডম্যাপটা বার করে নিলাম। একই সঙ্গে আরও একটা জিনিস বেরিয়ে পড়ল বাইরে। ইলিয়াসের আজকের–উঁহু, বরং বলা ভালো, কাল সকালে দেওয়া গোলাপগুচ্ছ। সময়ে কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে ওদের তাজা জলুস।
ফুলের তোড়াটা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিলাম। গন্ধের মাদকতা যেন বেড়ে গেছে সময়ের তালে-তালে। আমার মনে পড়ল ইলিয়াসের কথা।
ইলিয়াসের কাছে গেলে কেমন হয়?
রোড-ম্যাপ দেখে বাসিরার পথ চিনে যেতে আমার অনেক সময় লাগবে। জানি না, শেখের রক্ষীবাহিনী ইতিমধ্যেই আমার পিছু নিয়েছে কিনা। সুতরাং এই মুহূর্তে আমার হাতে যে-জিনিসটা কম তা হল সময়। বাসিরার পথ চিনে যাওয়ার চেয়ে ইলিয়াসের বাড়িতে পৌঁছনো বোধহয় সহজ। কারণ একবার হলেও সেই পথে আমি গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করেছি।
মন স্থির করতে আর বেশিক্ষণ সময় লাগল না। গাড়িতে স্টার্ট দিলাম। আমার লক্ষ এখন কানাম, ইলিয়াসের বাড়ি।
স্মৃতিকে ঝালিয়ে পথ চিনে এগোতে শুরু করলাম। যদি বা পথ ভুলে যাই তা হলে সঙ্গে রয়েছে রোড-ম্যাপ। কেন জানি না, ইলিয়াসের কথা মনে পড়তেই দুশ্চিন্তার ভার অনেকটা কমে গেল। শুধু একটা জিনিসই খারাপ লাগছিল, এত রাতে গিয়ে ওদের বিব্রত করা। কিন্তু এই সঙ্গিন বিপদে আমি যে নিরুপায়!
