আয়েষা বিছানায় শুয়ে আছে। ওর দু-চোখ বোজা।
আমি ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লাম। ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালাম। পরক্ষণে আর একটা আর্ত গোঙানি বেরিয়ে এল ওর ঠোঁট চিরে।
আয়েষা!–ওর কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে ডেকে উঠলাম আমি। তাপে আমার হাত যেন পুড়ে যাচ্ছে। কপাল থেকে গালে হাত সরালাম। সেখানেও একই উত্তাপ। আয়েষার জ্বর হয়েছে নাকি।
আয়েষা, চোখ খোলো। আমি হিতেশ। বলেছিলাম না তোমার সঙ্গে দেখা করব দ্যাখো, আমি এসেছি।
ও চোখ খুলল। ওর অপরূপ দৃষ্টি এখন শূন্য। কয়েক মুহূর্ত পরে যেন আমাকে দেখতে পেল। ওর নজর ক্রমে স্পষ্ট হল।
হিতেশ! ওঃ হিতেশ, তুমি কেন এলে?–ওর ঠোঁট কেঁপে উঠল শুধু! অস্পষ্ট ফিসফিস শব্দগুলো বেরিয়ে এল কোনওরকমে।
মনে হল আয়েষাকে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। ওর চোখের পাতা বুজে আসতে চাইছে বারবার। যেন অসম্ভব ভারী হয়ে উঠেছে।
আমার ভীষণ অবাক লাগল। কী হয়েছে আয়েষার? ও কি অসুস্থ? ঘরটার মধ্যে কেমন যেন একটা হাসপাতাল-হাসপাতাল ভাব। আমি ওর বিছানার পাশে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লাম।
তোমার কী হয়েছে, আয়েষা?
আয়েষার শরীর হালকা-নীল চাদরে ঢাকা। অথবা আবছা আলোয় চাদরের রঙটা ওরকম মনে হচ্ছিল।
আমি একটা হাত রাখলাম ওর চাদরে ঢাকা বাহুর ওপর। কিন্তু হাত ঠেকল কোমরে। অবাক হয়ে ওর কাঁধের দিকে নিয়ে এলাম আমার অনুসন্ধানী হাত। সঙ্গে-সঙ্গে বিদ্যুতের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল আমার সারা শরীরে। আমার মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। আতঙ্কঘন বরফের আঙুল যেন খেলে বেড়াচ্ছে আমার শিরদাঁড়ার ওপর। একটা অস্ফুট আর্তনাদ অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে।
আয়েষার কাঁধের কাছে বাহুর কোনও অস্তিত্ব নেই। কাঁধের পর উদ্ধত বুক, পাঁজর, কোমর।
একটানে চাদরটা সরিয়ে দিলাম ওর শরীর থেকে।
স্পর্শের পর চোখে দেখা প্রমাণ পেলাম। আয়েষা এখনও সম্পূর্ণ নগ্ন। কিন্তু ওর যুবতী স্তন বা অন্যান্য দেহসৌষ্ঠব আমার নজর কাড়ল না। প্রচণ্ড অবিশ্বাসে আমি স্থবির হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর কাঁধের দিকে। কাঁধ, গলা ও বুক ঘিরে পুরু ব্যান্ডেজ। ব্যান্ডেজে গৌরী স্তনের কিছু অংশও ঢাকা পড়েছে। কিন্তু কাঁধের পাশে বাহুর কোনও অস্তিত্ব নেই।
কাঁধের গা ঘেঁষে ওর অপরূপ হাত দুটো কেটে নেওয়া হয়েছে।
ও..আয়েষা! আমি গভীর শ্বাস ফেলে ডুকরে উঠলাম।
ও ধীরে-ধীরে চোখ খুলল। মাথা তুলতে চেষ্টা করল। ওই আচ্ছন্ন অবস্থাতেও বুঝতে পারল, আমি সব দেখেছি, জেনেছি।
দুর্বল গলায় বিড়বিড় করে আয়েষা বলল, হিতেশ, তুমি এ-অবস্থায় কেন দেখতে এলে আমাকে? বাবাকে শাস্তি দিতে ওরা আমার হাত কেটে নিয়েছে।
ও ক্লান্ত হয়ে আবার এলিয়ে পড়ল বালিশে। কাঁপা হাতে চাদরটা টেনে দিলাম ওর নগ্ন দেহের ওপর। কিছুক্ষণ বসে রইলাম ওর বিছানায় পাশে। অপলকে চেয়ে দেখতে লাগলাম আয়েষার সুন্দুর ঘুমন্ত মুখ। আমার মনে পড়ল। মোহনের সঙ্গিনী মেয়েটির কথা। সেও বোধহয় আশেপাশে কোনও ঘরে একইরকম বিছানায় শুয়ে আছে।
এক সময় ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গেলাম দরজায় কাছে। দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম অলিন্দে। তারপর দরজা টেনে বন্ধ করে দিলাম। ঘেন্না ও হতাশায় আমার শরীরের ভেতরটা গুলিয়ে উঠছে। কিন্তু তার চেয়েও তীব্র হয়ে উঠছে অন্ধ রাগ। কী জঘন্য এই মানুষগুলো। একটা নিরপরাধ মেয়েকে ওরা এরকম পৈশাচিক শাস্তি দিল!
তখন আমার কাণ্ডজ্ঞান বোধহয় লোপ পেয়েছিল, কারণ বিন্দুমাত্রও লুকোনোর চেষ্টা না করে আমি সটান সেই অলিন্দ ধরে ফিরে চলেছি। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, দ্বিতীয় কোনও প্রাণীর সঙ্গে আমার মোলাকাত হল না। মৃত নিস্তব্ধ প্রাসাদ-পুরীতে আমি সম্পূর্ণ একা পথিক।
সামান্য অসুবিধে হলেও ফেরার পথ চিনে নিতে পারলাম। মোহনের ঘরের কাছে এসে দরজায় টোকা মারলাম। একটু পরেই ও দরজা খুলে দিল। গত রাতের সুখশয্যার পর আজ বোধহয় গভীর ঘুমে ডুবে যেতে পারেনি।
ঘরে ঢুকেই তাড়াহুড়ো করে ওকে সব খুলে বললাম। রাগে উত্তেজনায় আমার কথা জড়িয়ে গেল, তেমন করে গুছিয়ে বলতে পারলাম না। কিন্তু মোহন খান্না মোটামুটি সব বুঝতে পারল।
কথা বলতে বলতে আমার কান্না পেয়ে গেল আয়েষার জন্যে।
শেখের লোকগুলো কি মানুষ, না জানোয়ার! তোমাকে তো প্রথমেই বলেছিলাম, কাহরেইন সম্পর্কে যেটুকু খোঁজখবর পেয়েছি তাতে দেশটা সুবিধের নয়।
মোহন আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, দাঁড়াও, দাঁড়াও। একটু ভাবতে দাও।
কিন্তু বুঝতে পারলাম, বাইরে যতই শান্ত ভাব দেখাক না কেন ভেতরে-ভেতরে মোহনও অস্থির হয়ে উঠেছে, আর সেইসঙ্গে ভয়ও পেয়েছে।
সেই মুহূর্তে হঠাৎ আমার মনে পড়ল রোমিলার কথা।
মোহন! রোমিলাকে যে করে হোক এখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে। আমি যে সব দেখে ফেলেছি এটা যদি শয়তানগুলো টের পায় তাহলে ওরা কী করবে বিশ্বাস নেই।
মোহন আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করল যে অত ভয়ের কিছু নেই, কিন্তু আমার মন মানতে চাইল না। মোহন বারবার বলল, দ্যাখো, আমরা এখানে বিদেশি। আমাদের নিয়ে চট করে কিছু করে উঠতে পারবে না শেখের লোকেরা।
কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। কারণ রোমিলা আমার ভীষণ প্রিয়।
অবশেষে মোহন খান্না রাজি হল।
দুজনে মিলে ডাকাডাকি করে রোমিলাকে জাগালাম। বললাম, জলদি সব জিনিসপত্র গোছগাছ করে নিতে।
