ডাইনিং টেবিলে কাবাব, বিরিয়ানি, ফলসামগ্রীর আশ্চর্য সমাহার যে-কোনও খাদ্য-বিলাসীকে দিশেহারা করে দেওয়ার মতো। রোমিলা ও মোহন আনন্দের সঙ্গে এটা-ওটা চেখে চলল। প্রতিটি খাবারের পরই পরিবেশন করা হচ্ছে দেশি-বিদেশি পুরোনো-নতুন নানান রঙের নানান স্বাদের সুরা। সন্দেহ নেই ওই রাজকীয় নৈশভোজের স্মৃতি সহজে ভুলে যাওয়ার নয়।
আমার খাওয়ার ভঙ্গিতে হয়তো নির্লিপ্ত ভাব ধরা পড়েছিল। তা ছাড়া খেতেও যে তেমন আগ্রহ ছিল তা নয়। হয়তো সেই কারণেই হাসান বললেন, মিস্টার কাপুর, আপনি তো ঠিকমতো খাচ্ছেন না। আর তেমন কথাবার্তাও বলছেন না।
হাসান আমার পাশেই বসে ছিলেন।
মুহূর্তের দ্বিধা কাটিয়ে আমি মনস্থির করে ফেললাম। তারপর মনের বোঝা হালকা করার জন্যে নীচু গলায় বললাম, আপনি হয়তো আমাকে সাহায্য করতে পারেন, মিস্টার হাসান। গতকাল বাগানে যে-মেয়েটিকে আমি পছন্দ করেছিলাম মনে আছে?
নিশ্চয়ই মনে আছে। অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি। অবশ্য সুন্দরী ছাড়া কাউকেই মাননীয় শেখ তাঁর উদ্যানে স্থান দেন না। একটু থেমে হাসান বললেন, মেয়েটি আপনার মনোরঞ্জন করতে পেরেছে আশা করি?
তার অনেক বেশিই করেছে। আমি জবাব দিলাম।
তা হলে আপনাকে অসুখী দেখাচ্ছে কেন, মিস্টার কাপুর?
শ্বাস টেনে বললাম, ওকে আমি আবার দেখতে চাই। শেখকে বলে তার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন না আপনি?
এই প্রথম শেখের একান্ত সচিবের ঠোঁটে হাসির আভাস দেখলাম। না, বন্ধুত্বের হাসি সেটা নয়, বরং তাকে ঠোঁটের বিকৃতি বলা যায়। এ-হাসি মন ছোঁয় না।
হাসান বললেন, আপনার অনুরোধ রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব, মিস্টার কাপুর। আপনি ওকে এমনভাবে উপভোগ করেছেন যা কোনও পুরুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সবই আল্লার ইচ্ছে, তাতেই আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ইচ্ছে করলেও আমি অথবা মাননীয় শেখ, কেউই এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারব না। সবই আল্লার মরজি।
হাসান মুখ ফিরিয়ে নিলেন। স্পষ্ট বোঝা গেল, এ-বিষয়ে আর আলোচনা চালাতে তিনি নারাজ।
আমার অস্বস্তি ও অস্থিরতা যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। খাওয়াদাওয়ার পর নিজের ঘরে এসেও হাসানের কথাগুলো মনে পড়তে লাগল। যতই দুশ্চিন্তা ও অস্বস্তি বাড়ছে ততই যেন এক জেদ চেপে বসছে মনের গভীরে, আয়েষার সঙ্গে দেখা আমাকে করতেই হবে।
এক সময় মন স্থির করে উঠে দাঁড়ালাম। তখন রাত কত জানি না, চুপিসারে বেরিয়ে এলাম ঘরের বাইরে।
অলিন্দে আবছা আলো জ্বলছে। হয়তো রাত বেড়ে ওঠায় এই ব্যবস্থা। ছায়ায়-ছায়ায় লুকিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে চললাম প্রাসাদের পেছন দিকে। প্রকাণ্ড অলিন্দ, বিশাল হলঘর, বারান্দা ইত্যাদি পেরিয়ে আসার সময় কেমন যেন গা-ছমছম করতে লাগল। লুকিয়ে চলার পথে যখনই শেখের কোনও ভৃত্য অথবা রক্ষী নজরে পড়ছে তখনই ঘন অন্ধকারের আড়ালে চকিতে আত্মগোপন করছি। অপেক্ষা করছি রুদ্ধশ্বাসে। তারপর পথ পরিষ্কার হলে আবার এগিয়ে চলি গোপন অভিসারে।
এক সময় পেছনের মাঠে যাওয়ার দরজাটা আমার চোখে পড়ল। দরজা বন্ধ। কিন্তু তাতে কোনও ক্ষতি নেই। কারণ আয়েষাকে উদ্যানে আর পাওয়া যাবে না। প্রাসাদের কোথাও ওকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সুতরাং বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে-ঘুরতে প্রাসাদের এক অন্দরমহলে পৌঁছে গেলাম। অন্দরমহল অথচ কড়া পাহারার ব্যবস্থা সেখানে নেই। এবং তার গঠনও বড় বিচিত্র। ঠিক যেন কোনও হোটেলের মতো সরু অলিন্দ। অলিন্দের দু-পাশে পরপর ছোট-ছোট ঘর। যেন জায়গা বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে। প্রাসাদের অন্যান্য অংশে যে-বিশাল ঘর-বারান্দা ইত্যাদি দেখেছি, এ-জায়গাটা ঠিক তার উলটোটা।
জানি, আমার অনুসন্ধান হয়তো হাস্যকর, নিছক পাগলামি। অনেকটা খড়ের গাদায় উঁচ খোঁজার মতো। কিন্তু এক অদ্ভুত জেদ আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলল। আয়েষার মিষ্টি মুখটা বারবার ভেসে উঠছে মনের পরদায়। কিছু একটা আমাকে করতেই হবে। ফলে প্রত্যেকটা দরজা আমি খুলে দেখতে চেষ্টা করলাম। কোনও দরজা বন্ধ, কোনওটা খোলা। খোলা দরজায় উঁকি মেরে নজরে পড়ল ছিমছাম ঘর। পরিপাটি বিছানা বালিশ। সম্পূর্ণ খালি। ঘরে কেউ নেই।
হতাশ না হয়ে সরু অলিন্দ ধরে এগিয়ে চললাম। একটার পর একটা দরজা খুলে দেখতে চেষ্টা করছি, কিন্তু আয়েষা কোথাও নেই।
শেষপ্রান্তে পৌঁছে অলিন্দ যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে এসে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালাম। হতাশায় মন ভেঙে পড়তে চাইছে। ঠিক তখনই একটা চাপা গোঙানি আমার কানে এল।
খুব কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে গোঙানিটা আসছে। মনে হল সামনের একটা বন্ধ দরজার পেছন থেকেই। ঝটিতে এগিয়ে গেলাম দরজার কাছে। হ্যাঁ, এই দরজাটাই। হাতলটা ঘুরিয়ে চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল।
দরজা খুলতেই অ্যান্টিসেপটিক আর ইথারের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারল। চটপট ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম আমি।
ঘরটা আধো অন্ধকার, কিন্তু তবুও ঘরের কোণে রাখা বিছানাটা আমার অস্পষ্টভাবে নজরে পড়ল। আবার একটা হালকা গোঙানি ভেসে এল বিছানায় দিক থেকে। শব্দটা এখন অনেক জোরে, শোনাল, কারণ এখন আর দরজার আড়াল নেই, দূরত্বও ততটা নয়।
আমি বিছানায় দিকে ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেলাম। বিছানায় শোয়া মানুষটিকে দেখে চমকে উঠলাম। হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল গলার কাছে। এ আমি কী দেখছি!
