দুপুর একটা নাগাদ গল্পের ঢেউ থামল। কারণ ইলিয়াস ঘরে এসে হাজির হল। আমাদের দিকে তাকিয়ে মজাদার মুখভঙ্গি করে বলল, আসুন মেমসাহেবরা, খানা তৈরি। তারপর আবার আড্ডা দেওয়া যাবে।
সুতরাং তখনকার মতো গল্প থামল। ওই ঘরেই খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম আমরা।
খাওয়াদাওয়ার পাট চুকে যাওয়ার পর ইলিয়াসও আমাদের আসরে যোগ দিল। সোজা কথায়, গুলতানি একেবারে জমে উঠল। এহেন বিষয় নেই যা আমাদের আলোচনায় জায়গা পেল না। ঘোড়ার পিঠে চড়ে সময় একেবারে হাওয়ার বেগে ছুটতে লাগল।
আকাশের আলো ম্লান হয়ে আসতেই আমি সচেতন হলাম। ইলিয়াসকে বললাম, এবারে আমি ফিরতে চাই। ও হেসে বলল, তোমার তো বাড়ি ফেরার তাড়া ছিল।
বুঝলাম, ঠাট্টা করছে। তাই হেসে বললাম, তুমিও ইন্ডিয়াতে কখনও এসো, তখন মজা টের পাওয়াব।
আমরা দুজনে নাজমাকে ছেড়ে উঠলাম। ও হঠাৎই বলল, দিদি এক মিনিট। তোমাকে একটা জিনিস দিই।
তারপর তাকিয়ার নীচ থেকে রুমালের মতো একটা জিনিস বের করল। রুমালটা রঙচঙে সুতোয় বোনা।
নাজমা বলল, আমি বুনেছি।
আমি আলতো করে ওর কমনীয় গাল টিপে দিলাম। বললাম, ভাগ্যিস এসেছিলাম, তাই এমন সুন্দর জিনিসটা পেলাম।
ইলিয়াস আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, আমার গোলাপের তোড়ার চেয়েও সুন্দর?
আমি কপট রাগে ওর দিকে কটমট করে একবার দেখলাম।
নাজমা বারবার বলল, আবার এসো! আবার এসো!
আমি হেসে বললাম, নিশ্চয়ই আসব। তারপর বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম আমি আর ইলিয়াস।
চলো, তোমাকে পৌঁছে দিই। ইলিয়াস বলল।
একশোবার। না পৌঁছে দিলে আমি যাব কেমন করে?
ইলিয়াস বলল, সামনের বড় রাস্তায় পৌঁছলেই ট্যাক্সি পাওয়া যাবে।
কিন্তু তার আর দরকার হয়নি।
আমি হঠাৎ জিগ্যেস করলাম, আবার কবে দেখা হচ্ছে?
কেন, কাল নটায়!–চটপট বলে উঠল ইলিয়াস। শুনে আমার ভালো লাগল।
অবাক হয়ে ভাবলাম, মানুষের প্রত্যাশা কী দুরন্ত বেগেই না বাড়তে থাকে! বাড়তে বাড়তে যদি তা কখনও বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায় তখন?
আর কয়েক পা এগোতেই আলেয়ার কথা মনে পড়ল আমার। ক্ষণিকের দ্বিধা কাটিয়ে জানতে চাইলাম, আলেয়ার কী হয়েছে ইলিয়াস? ও এখন কোথায়?
একটা বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইলিয়াস বলল, আল্লা জানেন।
আমি কী বলব ভাবছি, এমন সময় হঠাৎই লাল রঙের আলফা স্পোর্টস কারটা আমার চোখ পড়ল। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িটা কে নিয়ে এল এখানে?
কিন্তু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই আকাশি রঙের ভ্যানটা নজরে পড়ল। ইলিয়াসের দিকে তাকিয়ে দেখি ওর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
আচমকা দুটো ছায়া আমার সামনে এসে হাজির হল।
আমরা চমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। ভয়ে বুক কাঁপছে।
ইলিয়াস আমার বাহু আঁকড়ে ধরল শক্ত হাতে।
ছায়ামূর্তি দুজনের একজন ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে বলে উঠল, মিস কাপুর, আমরা আপনার দেহরক্ষী। আপনার গাড়িটা আমরা নিয়ে এসেছি। বাড়ি ফিরতে আপনার কোনও অসুবিধে হয়েছে শুনলে মাননীয় শেখ ভীষণ দুঃখ পাবেন।
আমি করুণ চোখে ইলিয়াসের দিকে একবার তাকালাম। ওর চোখে-মুখে ঘৃণা যন্ত্রণা ভয় আক্রোশ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
ইলিয়াসকে ছেড়ে আমি দেহরক্ষী দুজনের সঙ্গে এগিয়ে গেলাম। ইলিয়াস আচ্ছন্নের মতো আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল : বিদায়!
আলফায় উঠে যখন স্টার্ট দিলাম তখন আমার চোখ ঝাপসা হয়ে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্ধকার ক্রমে গাঢ় হয়ে আসছে। ইলিয়াসের অবয়ব অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে একটু-একটু করে।
আকাশি ভ্যানটা আমার আগে-আগে যাচ্ছে, আর আমি সেটাকে অনুসরণ করে চলেছি।
এটুকু বুঝলাম, শেখ হারিদের অনুচরদের চোখে ধূলো দেওয়া নেহাত সহজ নয়। ওরা নিশ্চয়ই আমাদের ট্যাক্সি অনুসরণ করে ইলিয়াসের বাড়ি পর্যন্ত এসেছে। সে-কথা ভাবতেই দুশ্চিন্তা জুড়ে বসল মাথায়। আগামীকাল ইলিয়াসের সঙ্গে দেখা হবে তো?
ছুটন্ত গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রাখতেই দেখলাম, গাঢ় নীল আকাশে এক ফালি সুদৃশ্য চাঁদ আমার পাশে ছুটছে। পার্শিয়াল গালফ-এর নোনা বাতাস আমার নাকে এসে ঝাপটা মারল। ভাবতে অবাক লাগল, আমি দেশছাড়া হয়ে হাজার-হাজার মাইল দূরের এক বিদেশি রাস্তায় গাড়ি ছুটিয়ে চলেছি।
.
হিতেশ কাপুর
সে-রাতে শেখ আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নৈশভোজে। সুতরাং অস্থির মন নিয়েই মোহন ও রোমিলার সঙ্গী হলাম। রোমিলা একটু আগেই বেড়িয়ে ফিরেছে। ভীষণ ক্লান্ত ছিল ও। নৈশভোজে যেতে রাজি হচ্ছিল না। আমিই বলেকয়ে ওকে রাজি করিয়েছি। বলা যায় না, ওকে অনুপস্থিত দেখলে শেখ হারিদ কী থেকে কী ভেবে বসবেন।
ভোজের আসরে উপস্থিত ছিলেন শেখ হারিদ নিজে, পাশে তার প্রিয় বেগমদের একজন, আর দুই ছেলে। ছেলে দুটি চেহারায় বাপের মতো, তবে অনেক রোগা। এখনও ওদের দাড়ি গজায়নি। অবশ্য একজন যে বাবার মতো চমকদার দাড়ি তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা করছে সেটা তার গাল দেখলেই বোঝা যায়।
আসরে আরও হাজির ছিলেন কয়েকজন মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ অফিসার। তাদের মধ্যে দুজন সকালে তেলের আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া পার্টির তদারকিতে শশব্যস্ত হয়ে যথারীতি হাজির রয়েছেন সদা উপস্থিত বিশ্বস্ত অনুচর হাসান।
শেখ হারিদ বেশ খোশমেজাজে গল্প করছেন সবার সঙ্গে। তিনি কথা বলার সময় অন্য সবাই চুপ করে শুনছেন। তার কথা যেন আর শেষ হতে চায় না। অতিথিসেবার দায়িত্ব তিনি যথাযথ পালন করে চললেন। বিশাল কারুকার্যময় ঘরে বেজে চলেছে দেশীয় সংগীতের সুর। স্বল্পবাস সুন্দরী মেয়েরা ঘুরেফিরে খাবার পরিবেশন করছে রুপোর পাত্রে। সব মিলিয়ে খাঁটি মধ্য প্রাচ্যের পরিবেশ।
