ঠিক-ঠিক বলতে গেলে আট মিনিটের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম দুজনে।
জায়গাটা বেশ কিছুটা ঘিঞ্জি। দেখে মনে হয় এ-অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে নিম্নবিত্তের সংখ্যাই বেশি। ইলিয়াস বোধহয় আমার মনের কথা টের পেয়েই বলে উঠল, গোটা কাহূরেইন তেলের ওপরে ভাসছে। অথচ সব পয়সাই ঢুকছে শেখ হারিদের পকেটে। দেশের লোক সব অভাবে ধুঁকছে।
ইলিয়াসের কথায় বেশ খানিকটা ঘৃণা ও অসন্তোষ প্রকাশ পেল। কিন্তু পরমুহূর্তেই ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তুমি শেখের অতিথি। তোমার সামনে এসব কথা বলে ফেললাম বলে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু সত্যি কথাটা কি জানো? দেশের লোকের সহ্যের সীমা পার হয়ে যেতে চলেছে। ধস একদিন নামবেই।
আগামী সেই দিনটার আশায় ওর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
বাড়ির সদর দরজা পেরিয়েই হাঁকডাক শুরু করে দিল ইলিয়াস, নাজমা! নাজমা। দ্যাখ কাকে নিয়ে এসেছি।
সদর পেরিয়েই একটা খোলা উঠোন। তারপর বাড়ি।
একটু পরেই বাড়ির দোতলার বারান্দায় সাদা-চুল এক বৃদ্ধা এসে দাঁড়ালেন। তার কাখে অপূর্ব রূপসী একটি মেয়ে। বয়েস বারো কি তেরো। নিশ্চয়ই নাজমা। আর বৃদ্ধা সম্ভবত ওর পিসিমা।
আমাদের দেখে মেয়েটা কোল থেকেই একেবারে হইহই শুরু করে দিল। ইলিয়াস ওর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল, সবুর কর, এক্ষুনি আমরা ওপরে যাচ্ছি।
সেকেলে জীর্ণ ঢঙের সিঁড়ি ভেঙে ইলিয়াস আমাকে ওপরে নিয়ে গেল। চলতে-চলতে বলল, কোথায় শেখ হারিদের প্রাসাদ, আর কোথায় এই বাহাত্তরে বাড়ি।
আমি মাথা নীচু করে সিঁড়ি ভাঙছিলাম, চট করে মুখ তুলে ওকে দেখলাম। তারপর বললাম, তুমি তো অবুঝ নও। ওই প্রাসাদ কাদের কান্না-ঘাম-রক্তে তৈরি তা নিশ্চয়ই তুমি জানো, আমার চেয়ে ভালো করেই জানো!
ইলিয়াস হেসে বলল, ইন্টারভিউতে একটা কথা জুড়ে দেব, ভারতীয় তরুণীদের সঙ্গে কথায় পেরে ওঠা মুশকিল।
দুজনেই চড়া গলায় হেসে ফেললাম।
অবশেষে নাজমার ঘরে এলাম।
ঘরটা আকারে মাঝারি। মেঝেতে রংচটা একটা পুরোনো কার্পেট পাতা। বড়-বড় দুটো জানলার জাফরি ঝোলানো। হয়তো রোদের তাত ও চোখ ঝলসানো আলো স্তিমিত করার জন্যে। ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা একটা খাটো বিছানায় নাজমা এখন আধশোয়া অবস্থায়। দুটো তাকিয়া ওর পিঠের কাছে গোঁজা। রঙিন সুতো দিয়ে কী একটা বোধহয় বুনছিল, সেটা বিছানার একপাশে রাখা। এখন মুগ্ধ একাগ্র চোখে ও শুধু আমাকে দেখছে।
নাজমা যেন কোনও স্বর্গীয় পুতুল। দুধে-আলতা ওর গায়ের রং। টানা-টানা কালো চোখ। ধারালো নাক ও চিবুক। পাতলা গোলাপি ঠোঁট। নাকে ছোট একটা লাল পাথর ঝিলিক মারছে। এছাড়া তেমন কোনও সাজগোজ বা প্রসাধন নেই। আমি থমকে দাঁড়িয়ে মেয়েটার অপরূপ সৌন্দর্য আশ মিটিয়ে দেখতে লাগলাম।
ইলিয়াস আমার কনুই স্পর্শ করল, বলল, বিছানাতেই বোসো। নাজমা তোমাকে কাছ ছাড়া করবে বলে মনে হয় না।
নাজমা হাততালি দিয়ে উঠল, তোমার কথা কাল দাদার কাছে কত শুনেছি। তুমি আজ আমাকে সারাদিন ধরে ইন্ডিয়ার গল্প শোনাবে। নানান দেশের গল্প শুনতে আমার দারুণ লাগে।
ইলিয়াস বলল, ব্যস, এবারে আমার ছুটি। তবে রোমিলা, আর-একটা রিকোয়েস্ট, আজ আমাদের এখানে খেয়ে যাবে তুমি–অবশ্য যদি তোমার আপত্তি না থাকে।
আমি মুখ ফিরিয়ে ইলিয়াসকে দেখলাম। অপরূপ সৌন্দর্য ওদের জন্মগত অধিকার। একটু থেমে ওকে বললাম, ভদ্রতার জন্যে যদি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হত তাহলে সেটা তোমার হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না, ইলিয়াস।
আমরা তিনজনেই হালকা গলায় হেসে উঠলাম। ইলিয়াস ঘর ছেড়ে চলে গেল। আর আমি ফুটফুটে পুতুলটার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলাম।
ঘরের দেওয়ালে বাঁধানো বেশ কিছু ছবি রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি রঙিন পার্সিালপি। কিন্তু যে-ছবিটির প্রতি আমার নজর পড়ল সেটা তিনজনের একটি গ্রুপ ফটো। ইলিয়াস ও নাজমা দুপাশে। ওদের মাঝে দাঁড়িয়ে বছর কুড়ির এক যুবতী। নিশ্চয়ই আলেয়া। একেবারে নাজমার মুখটি অবিকল কেটে বসানো।
আমি সেদিকে আঙুল দেখিয়ে নাজমাকে জিগ্যেস করলাম, মাঝখানে কে? তোমার দিদি আলেয়া?
হ্যাঁ। ছবির দিকে না তাকিয়েই নাজমা বলল। একটা দুঃখ ছায়া ফেলল ওর কণ্ঠস্বরে।
তোমার দিদি এখন কোথায়?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, জানি না…একটু থেমে আরও বলল, দাদা জানে।
ঠিক এই সময়ে ওর পিসিমা এক গ্লাস শরবত হাতে ঘরে ঢুকলেন। আমাকে দিলেন। তারপর নীরবে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। নাজমা ছোট্ট করে বলল, আমার পিসিমা। খুব ভালো বাদামের শরবত তৈরি করে, খেয়ে দ্যাখো।
আমি সৌজন্যবশত গ্লাসটা ওর দিকে এগিয়ে ইশারা করতেই নাজমা খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, আমি তো ওটা রোজই খাই, ডাক্তারবাবু খেতে বলেছেন। বাদামের শরবত খেলে আমার পা ধীরে-ধীরে সেরে উঠবে।
কথাটা বিশ্বাস করতেই মন চাইল, কিন্তু ইলিয়াসের মুখে যা শুনেছি তাতে মনে হয় নাজমাকে ভুলিয়ে রাখার জন্যেই হয়তো ওকথা বলা হয়েছে। শরবতটা রোজ খেলে ওর শরীরের পুষ্টি বাড়বে।
শরবত শেষ করতেই আবার গল্প।
আমি নাজমাকে ভারতের নানান কথা শোনাই। পরক্ষণেই ও হাত-পা নেড়ে আমাকে ইরান বা কাহরেইন সম্পর্কে সাতকাহন করে শুনিয়ে দেয়। রাজ্যের বিষয় নিয়ে গল্পেগুজবে ইরান ও ভারত দেশ দুটো ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসতে থাকে। ঘড়ির কাটার কথা একেবারে ভুলে গেলাম দুজনে।
