আমি আগ্রহে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালাম।
প্যান্টের পকেট থেকে ভাঁজকরা কয়েকটা কাগজ বের করল ইলিয়াস। সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে পড়বার জন্যে তৈরি হল। বলল, এটা পার্সি ভাষায় লেখা, কিন্তু আমি ইংরেজি অনুবাদ করে পড়ে শোনাচ্ছি। বোর করলে সঙ্গে-সঙ্গে জানাবে, লজ্জা করবে না।
ও হাসল। আমিও হাসলাম। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে ইলিয়াস ইন্টারভিউটা আমাকে পড়ে শোনাতে লাগল। পড়া এবং শোনার ফাঁকে ফাঁকে চলতে লাগল আমাদের চায়ের চুমুক।
চা এবং ইন্টারভিউ-পাঠ প্রায় একই সঙ্গে শেষ হল। তখন ইলিয়াস প্রশ্ন করল, কেমন লাগল?
দারুণ?–একটু থেমে আরও বললাম, এটা কিন্তু মোটেই মন-রাখা কথা নয়।
সত্যি, এত চমৎকার ও সাবলীলভাবে ইন্টারভিউটা ইলিয়াস লিখেছে যে, স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা বেরিয়ে আসে।
ওর নানান গুণ আমাকে বিপজ্জনকভাবে মুগ্ধ করে চলেছে।
প্রশংসার জন্যে নরম গলায় আমাকে পালটা ধন্যবাদ জানাল ইলিয়াস। তারপর কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, তোমার তো আবার বাড়ি ফেরার তাড়া রয়েছে, নইলে…
হঠাৎই চুপ করে গেল ও।
আমি জানতে চাইলাম, নইলে কী?
ইলিয়াস একরাশ কুণ্ঠা নিয়ে নীচু গলায় বলল, কাল নাজমাকে তোমার কথা গল্প করেছিলাম। ও ভীষণ জেদ ধরেছে তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। আসলে আমি চাকরিতে বেরিয়ে পড়ি। বাড়িতে ওর পিসির কাছে থাকে নাজমা। ফলে তেমন গল্পগুজব করার সঙ্গী পায় । তার ওপর তুমি ভারত থেকে এসেছ শুনে তো একেবারে আলাদীনের প্রদীপ হাতে পেয়েছে।
কথা বলতে বলতে একটা খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ছিল ইলিয়াসের চোখে-মুখে। হঠাৎই সেটা দপ করে নিভে গেল। অনেকটা সাফাই দেওয়ার সুরে বিড়বিড় করে ও বলতে লাগল, আসলে আমি নাজমাকে বলেছিলাম, বাড়িতে আনা যাবে না–হয়তো রাজি হবে না। অচেনা লোকের বাড়িতে হুট করে কে-ই বা আসতে রাজি হয়, বলো!
ইলিয়াস আমার কাছে ঝুঁকে এল, বলল, আমি অনেকভাবে ওকে নিরাশ করতে চেয়েছি, কিন্তু তবুও মেয়েটা আশা ছাড়েনি। বারবার একই কথা বলছিল..
আমি একটু দ্বিধায় পড়লাম। নাজমার প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার দুঃখ যে ইলিয়াসের কাছে কতখানি সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু তবুও আমার মনে হচ্ছিল, ইলিয়াসের বাড়িতে গেলে আমার কষ্ট বাড়বে। আমি যেদিন ভারতে ফিরব সেদিন আমার পা টেনে ধরবে কাহরেইন এর মাটি। বহুদিনের পোষা পাখির মতো আমার ডানা ভারী হয়ে যাবে। আর উড়তে পারব না আমি।
হঠাৎই আমরা মনে হল, নাজমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এল না কেন ইলিয়াস? তা হলে ওরও আশ মিটত, আর আমাকেও অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হত না।
এই চিন্তাটাই মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করতে করতে একসময় বলে ফেললাম ইলিয়াসকে।
নাজমাকে তুমি সঙ্গে করে নিয়ে এলেই পারতে।
ইলিয়াস চোখ তুলে সরাসরি আমার দিকে তাকাল। বলল, সম্ভব হলে তো নিয়েই আসতাম, রোমিলা। ওর–ওর…।
আমি তীক্ষ্ণ নজরে ইলিয়াসকে জরিপ করছিলাম। হঠাৎই যেন অদ্ভুত এক বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে ওর চোখেমুখে।
আমি জিগ্যেস করলাম, কী হয়েছে নামার?
ইলিয়াস নীচু গলায় বলল, ও হাঁটতে পারে না। প্যারালিসিসে ওর দুটো পা বহুবছর ধরে অকেজো হয়ে গেছে।
সে কী! কী করে?
ইলিয়াসের বলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তবুও সংক্ষেপে সব বলল আমাকে। নাজমার যখন তিন বছর বয়েস তখন কী একটা অসুখে হঠাৎ করেই ওর পায়ে প্যারালিসিস দেখা দেয়। তারপর সেটা ক্রমে বাড়তে থাকে। বহুরকম চিকিৎসা করেও কোনও কাজ হয়নি।
কথা বলতে বলতে ইলিয়াসের চোখে জল এসে গিয়েছিল।
আমি ভারী গলায় বললাম, সরি, ইলিয়াস। অজান্তে তোমাকে ব্যথা দিয়ে ফেলেছি। চলো, আমি তোমার বাড়িতে যাব–নাজমাকে দেখতে যাব।
ইলিয়াসের জলভরা চোখ পলকে আনন্দে চকচক করে উঠল। ও অবিশ্বাসের সুরে বলল, সত্যি?
আমি হেসে বললাম, ট্রুথ, নাথিং বাট দ্য ট্রুথ।
ইলিয়াস আচমকা আমার হাতটা ধরে হ্যান্ডশেক করে বলে উঠল, গ্রেট। কাম অন, লেন্স গো।
ইলিয়াস চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। সেইসঙ্গে আমিও।
ওর ইচ্ছে পূরণ করতে পেরে আমার আনন্দ হচ্ছে। আমার একটা হাত কখন যেন ইলিয়াস বগলদাবা করে বন্দি করে ফেলেছে। গোলাপের তোড়াটা আমি আমার ঝোলা ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছি। ইলিয়াসও হলুদ ফুলের গুচ্ছটা ওর ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছে। ও দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলেছে আর পাকা গাইডের ভাবভঙ্গিতে ইরান, কাহরেইন ইত্যাদি সম্পর্কে লাগাতার বকবক করে চলেছে। যেন এক অদ্ভুত পাগলামি পেয়ে বসেছে ওকে।
বাজার এলাকাটা পেরিয়ে এসেই ইলিয়াস ইশারায় একটা ট্যাক্সি ডাকল। আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, রোমিলা, আলফা আলফার জায়গায় পড়ে থাক। আলফা সঙ্গে নিলে পেছন পেছন ওই আকাশি ভ্যানও আসবে। না কি তোমার দেহরক্ষী চাই?
আমি প্রাণ খুলে হেসে উঠলাম। বললাম, একজনকেই সামলাতে পারছি না তার ওপর আরও দুজন এলে তো তুলকালাম কাণ্ড হবে। আমি ইশারায় ইলিয়াসের হাতে বন্দি আমার হাতটা দেখালাম।
ওঃ, সরি!–বলে ইলিয়াস চটপট হাতটা ফেরত দিল।
ইতিমধ্যে ট্যাক্সিটা সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। দরজা খুলে দিয়েছে ড্রাইভার। দুজনে চটপট উঠে বসলাম ভেতরে। ইলিয়াস দেশীয় ভাষায় কী যেন নির্দেশ দিল ড্রাইভারকে। তারপর আমাকে লক্ষ করে বলল, আমার বাড়ি একেবারে কাহরেইন-এর সীমানার কাছাকাছি। জায়গাটার নাম কানাম। তবে পৌঁছোতে মিনিট দশেকের বেশি লাগবে না।
