বাপ্পা চিৎকার করে ডাকছিল, দিদি! দিদি!
অরুণাও কান্না মেশানো গলায় মানু! মানু! করে ডাকছিলেন আর বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন।
রণজয় হঠাৎই বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। চাপা গলায় খিস্তি করে রাগের চোখে ঘুরে তাকাল বিদিশার ঘরের দিকে–যে ঘরে বন্দি আছেন অরুণা। তারপর কয়েক পা এগিয়ে গেল সেদিকে।
বিদিশার চোখে জল, বুকের ভেতরে নাম-না-জানা কষ্ট। ও উঠে বসল ডাইনিং টেবিলে। ব্লাউজ হুকগুলো লাগিয়ে নিল। তারপর লজ্জা ঢাকতে নেমে এল ডাইনিং টেবিল থেকে।
ওকে নামতে দেখেই ক্ষিপ্ত রণজয় এক ঝটকায় ফিরে এল ওর কাছে। এক হাতে টুটি টিপে ধরল ওর।
বিদিশার গলা দিয়ে অস্পষ্ট একটা আঁক শব্দ বেরিয়ে এল। সেই অবস্থাতেই ও চোখের ইশারায় ঘরের কোণে পড়ে থাকা দলা পাকানো শাড়িটা দেখাল। রণজয় বুজতে পারল একটা ছোট্ট ধাক্কায় ওকে ঠেলে দিল সেদিকে।
অরুণা তখনও দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন, কান্না জড়ানো গলায় মানু! মানু করে ডাকছিলেন।
রণজয় সাংঘাতিক বিরক্ত হয়ে খ্যাপা কুকুরের মতো ছুটে গেল সেদিকে। দরজায় একটা জোরালো ধাক্কা মেরে অরুণাকে চুপ করতে বলল। তারপর অশ্রাব্য গালিগালাজের ফোয়ারা ছোটাল।
বিদিশা শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছিল। তখনই খেয়াল করল, টেলিফোনটা ওর একেবারে হাতের নাগালে।
রণজয় এখন বিদিশার কাছ থেকে অনেকটা দূরে। সুতরাং টেলিফোনটা বিদিশা চট করে একবার ব্যবহার করতে পারে। তবে রণজয় সেটা দেখতে পাবে এবং বিদিশাকে হয়তো অবাধ্যতার জন্য হিংস্র শাস্তি পেতে হবে।
রণজয়ের করাতের দাঁতওয়ালা ছুরিটা এখনও পড়ে আছে ডাইনিং টেবিলে–মাত্র কয়েকহাত দূরে। বিদিশা ইচ্ছে করলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটা তুলে নিতে পারে। কিন্তু হাতে পেলেই কি ও জিততে পারবে এই পাগলটার সঙ্গে!
হয় টেলিফোন, নয় ছুরি। যে-কোনও একটা হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারে বিদিশা। গায়ে শাড়ি জড়াতে-জড়াতে এই অঙ্কের হিসেবটাই কষছিল ও।
শেষ পর্যন্ত ও টেলিফোনের পক্ষেই গেল। শাড়ি খানিকটা অংশ মেঝেতে ফেলে দিয়ে সেটা ঠিক করা ভান করে ঝুঁকে পড়ল মেঝেতে।
সেই সুযোগে টেলিফোনের রিসিভারটা মেঝেতে নামিয়ে দিয়ে শেখরের বাড়ির নম্বরটা ঘোরাল ডায়ালে : ফোর সেভেন টু ওয়ান নাইন ওয়ান সেভেন।
বিদিশার পিঠ রণজয়ের নজর আড়াল করে রেখেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তই ও ভাবছিল, এই বোধহয় রণজয় এসে দাঁড়াবে ওর পিঠের কাছে, ধরে ফেলবে ওর অভিসন্ধি। তারপর ওর চুলের মুঠি ধরে এক হ্যাঁচকায় ওকে…।
মেঝেতে পড়ে থাকা রিসিভারে একটি মহিলা কণ্ঠ হ্যালো, হ্যালো করছিল। বিদিশা অতি সন্তর্পণে রিসিভারটা তুলে নিয়ে এল মুখের কাছে। ফিসফিস করে বলল, আমি বিদিশা বলছি। শেখরকে বলুন আমাদের বাড়িতে এক্ষুনি চলে আসতে। ভীষণ বিপদ…।
পিছন থেকে একটা লাথি এসে পড়ল বিদিশার পিঠে। বিদিশা ঠিকরে পড়ল ডাইনিং হলের বড় জানলার কাছে। ওর শাড়ির অর্ধেকটা কোমরে জড়ানো, বাকিটা লুটোপুটি। সেই অবস্থাতেই ও দেখল, রণজয় ডাইনিং টেবিল থেকে ছুরিটা তুলে নিয়েছে। ছুরির এক কোপে কেটে দিল। টেলিফোনের তার। তারপর টেলিফোনটা তুলে নিয়ে জোরে আছড়ে মারল মেঝেতে। সংঘর্ষের শব্দ হল। চুরমার হয়ে যাওয়া প্লাস্টিক আর ধাতুর টুকরো ছড়িয়ে গেল চারদিকে।
রণজয় হাসল বিদিশার দিকে তাকিয়ে। বলল, কী রে, মানু, ভয় পেলি? তারপরই একরাশ খিস্তিখেউড়।
ছুরির ডগাটা বিদিশার ব্লাউজের মাঝামাঝি ঠেকাল রণজয়। ছুরিটা ফেলে দিয়ে ঝুঁকে পড়ল বিদিশার ওপরে। দাঁত দেখিয়ে হাসল, বলল, মানু, আয়, আরও একবার হয়ে যাক।
বিদিশার গা ঘিনঘিন করে উঠল। আবার! টেনটেক্স ফোর্টের তেজ সহজে কমে না।
কিন্তু আর কিছু ভেবে ওঠার আগেই রণজয় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বিদিশার ওপরে। চাপা কর্কশ গলায় বলেছে, তোকে আমি ছাড়ব না!
টেলিফোন আছড়ে ফেলার শব্দে ভয় পেয়েছিলেন অরুণা। বাপ্পাও ভয় পেয়েছিল। সুতরাং কান্নার শব্দ আর দরজার ধাক্কা দুটোই কয়েক পরদা বেড়ে গেল।
রণজয় এবারে আর বিরক্ত হল না। কারণ ওর রক্তে তখন খই ফুটতে শুরু করেছে।
একটা নাম-না-জানা ঘৃণায় বিদিশা হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করল, বাধা দিতে চাইল হামলে পড়া জন্তুটাকে। কিন্তু তার জবাবে বিদিশার গলা টিপে ধরল রণজয়। আর বিদিশা ডুবে যাওয়া মানুষের মতো এলোমেলোভাবে বাতাস আঁকড়ে ধরতে চাইল।
বিদিশার চোখের সামনে রণজয়ের বিকৃত মুখ, কপালে-নেমে-আসা চুল, আর গরম নিশ্বাস। আর ওর হাত নিতান্ত অকারণেই খড়কুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এরকমই একটা অবস্থায় বিদিশার হাত পড়ল বেগন পাওয়ারের স্প্রে সিলিন্ডারে। জানলার ঠিক নীচেই দেওয়ালের কোণ ঘেঁষে সিলিন্ডারটা দাঁড় করানো থাকে। মশা মারার জন্য কেনা হয়েছে এই ওষুধটা। ধাতুর লম্বাটে বোতালের মাথায় সাদা রঙের বোতাম। বোতামে চাপ দিলেই বেরিয়ে আসে ধোঁয়ার মতো স্প্রে। কী বিশ্রী দুর্গন্ধ! নাকে এলেই বিদিশার মাথা ঝিমঝিম করে।
এটা রণজয়ের মুখে স্প্রে করলে কি ওকে থামানো যাবে? মশা মারার বিষে মানুষ কি একটুও অবশ হবে না!
বিদিশা আর ভাবতে পারছিল না। ও মরিয়া হয়ে সিলিন্ডারটা খামচে ধরে রণজয়ের মুখ লক্ষ করে বোতাম টিপে দিল। সাদা ধোঁয়ার মতো স্প্রে রণজয়ের মুখ ঝাপসা করে দিল। উকট দুর্গন্ধে বিদিশার গা গুলিয়ে উঠল। কিন্তু ও দাঁতে দাঁত চেপে বোতাম টিপেই রইল।
