এইরকম একটা প্রতিরোধের জন্য রণজয় তৈরি ছিল না। মুখে স্প্রে এসে পড়ামাত্রই ও বিদিশাকে ছেড়ে দিয়ে ছিটকে গড়িয়ে গেল একপাশে।
কিন্তু বিদিশা কোণঠাসা বেড়ালের মতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। ও স্প্রে করেই চলল। কখনও রণজয়ের মুখে, মাথায়, কানে, গলায় কখনও বা হাতে, পায়ে, গায়ে। তাক কখনও ঠিক হচ্ছিল, কখনও বা ভুল। কিন্তু মরিয়া বিদিশা বোতামের ওপরে আঙুলের চাপ এতটুকু আলগা করেনি।
রণজয়ের মাথা ঝিমঝিম করছিল। কিন্তু সেই অবস্থাতেও ও ছুরিটা হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছিল। কোথায় গেল ছুরিটা?
কিছুক্ষণের মধ্যেই সিলিন্ডার প্রায় শেষ হয়ে গেল। খালি বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো চারপাশে দেখল বিদিশা। জানলার তাকে টুকিটাকি অনেক জিনিস। একটা তালাচাবি, সাবানকেস, মোমবাতি, ছোট একটা শেকল, দেশলাই, কাপড় ছড়ানোর প্লাস্টিকের ক্লিপ, আরও কত কী।
দেশলাই! মশা মারার ওই ওষুধে কি সহজে আগুন ধরে? কেরোসিন তেলের মতো? বিদিশার মাথা ঠিকঠাক কাজ করছিল না। ও উদভ্রান্ত নজরে দেখল, রণজয় সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ওর হাতে সেই ছুরি। সারা গা বেগন পাওয়ারে ভেজা। চোখে খুনির দৃষ্টি।
বিদিশা আর কিছু ভাবতে পারল না। দেশলাইয়ের বাক্সটা তুলে নিয়ে কাঠি বের করে নিল। এক ঘষায় সেটা জ্বেলে ছুঁড়ে দিল রণজয়ের গায়ে।
চোখের পলকে যেন দেওয়ালি শুরু হয়ে গেল। রণজয়ের ছুরি বাগিয়ে ধরা লড়াকু শরীরটায় আগুন ধরে গেল দপ করে। তারপর লকলকে শিখায় এলোপাতাড়ি জ্বলতে লাগল।
আগুন ধরে গেল ঘরের বাতাসে, যেখানে ওষুধের বাষ্পের কণা ভেসে বেড়াচ্ছিল। আর বিদিশার শাড়িও রেহাই পেল না। কখন যেন বেগন পাওয়ার ছুঁয়ে গেছে ওর শাড়ি।
বিদিশা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল। রণজয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল জন্তুর গর্জন। আর বন্ধ দরজা দুটোয় কান ফাটানো শব্দ করছিলেন অরুণা ও বাপ্পা–সেই সঙ্গে তীব্র চিৎকার।
এই তুমুল বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিদিশার দিকে আঁপিয়ে পড়ল রণজয়ের জ্বলন্ত শরীর। ওর টলোমলো ডান হাত আনাড়ির মতো ছুরি চালাল বিদিশাকে লক্ষ করে।
বিদিশা তখন চিৎকার করে ছুটেছিল কলঘরের দিকে, আর পরনের শাড়িটাকে গা থেকে খুলে ফেলতে চেষ্টা করছিল। রণজয়ের ছুরি ওর ডান বাহুতে এসে লাগল, কিন্তু সেই যন্ত্রণা বিদিশা বোধহয় টের পেল না। ও পাগলের মতো ঢুকে পড়ল কলঘরে। শাওয়ারের কল খুলে দিল শেষ পাঁচ পর্যন্ত। তারপর শাওয়ারের নকল বৃষ্টির নীচে কয়েক লহমা দাঁড়িয়ে গোড়া কাটা গাছের মতো ঠাস করে পড়ে গেল কলঘরের মেঝেতে।
নকল বৃষ্টি ওর লজ্জাহীন শরীরকে তখন ভাসিয়ে দিচ্ছে। সেই অবস্থাতেও বিদিশা শেষবারের মতো দেখল, রণজয়ের দেহটা মেঝেতে পড়ে গিয়েও দাউদাউ করে জ্বলছে।
চেতনা হারানার আগে বিদিশা অনেকগুলো দরজায় একসঙ্গে ধাক্কা দেওয়ার শব্দ শুনতে পেল। মনে হল, বাইরে থেকে কে যেন সদরে কলিংবেলের বোতাম টিপছে।
তারপর আর কিছু ওর মনে নেই।
.
চোখ খুলেই নার্সিং হোমের সাদা দেওয়াল, সাদা পোশাক পরা নার্স। এ ছাড়া সাবানের ফেনার মধ্যে ভাসছে বেশ কয়েকটা পরিচিত রঙিন মুখ। সেই মুখগুলোর মধ্যে মা-বাবা রণজয়কে খুঁজল বিদিশা। কিন্তু শুধু মাকে দেখতে পেল।
মাথার অসহ্য যন্ত্রণা উপেক্ষা করে ও ভাবতে চেষ্টা করল।
না, এটা সেই প্রথমবারের নার্সিং হোম নয়। টেনটেক্স ফোর্ট খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে বিদিশা এখানে আসিনি। এখানে ও এসেছে অন্য কোনও কারণে।
জলের গভীর থেকে বুদবুদ যেমন ধীরে-ধীরে ওপরে উঠে আসে ঠিক সেইভাবে বিদিশার অচেতন মন চেতনায় ভেসে উঠছিল। শরীরের জ্বালা যন্ত্রণাগুলো একটু-একটু করে টের পাচ্ছিল ও। আর একইসঙ্গে চোখের নজর স্বচ্ছ হয়ে উঠছিল।
এইবার মুখগুলোকে স্পষ্ট করে চিনতে পারল বিদিশা। মা, বাপ্পা, শেখর, বোসদা, দেবলীনা, সুতপাদি আর অশোক চন্দ্র।
ওকে চেতনায় দেখে সবাই স্বস্তির হাসি ফোঁটাল মুখে।
বিদিশাও হাসতে চেষ্টা করল, কিন্তু ঠোঁটে বেশ ব্যথা।
অরুণা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিগ্যেস করলেন, এখন কেমন আছিস?
বিদিশা সামান্য মাথা নেড়ে বলল, ভালো।
আর তখনই ও মায়ের সাদা শাড়ি খেয়াল করল।
ও সামান্য ঠোঁট নেড়ে অস্পষ্টভাবে প্রশ্ন করল, বাপি আসেনি?
অরুণা বাপ্পাকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠলেন। মাথা নীচু করে আঁচলে মুখ গুঁজলেন। শেখর এগিয়ে এসে অরুণাকে আলতো করে ঠেলে সরিয়ে দিল। বিদিশার মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়ে বলল, আপনার এখন কথা বলার দরকার নেই–স্ট্রেইন হবে।
সুতপাদি আর দেবলীনা বিদিশার হাত ধরল, হাসল ঠোঁটে।
বিদিশার সব মনে পড়ে যাচ্ছিল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। নার্সিং হোমে ও কতদিন পড়ে আছে? পাঁচ দিন? সাত দিন? দশ দিন?
ও বিড়বিড় করে বলল, রণজয়…।
শেখর বলল, কথা বলতে বারণ করলাম না! আপনার আর কোনও ভয় নেই…আর কেউ কখনও আপনাকে বিরক্ত করবে না। সেরে উঠে পরে সব শুনবেন।
বাপি… ডুকরে কেঁদে উঠল বিদিশা। ওর চোখ ভিজে গেল।
নার্স এগিয়ে এল শেখরের কাছে। বলল, আপনারা এবার যান। পেশেন্টকে এবার ঘুমের ইনজেকশন দেব।
ওরা একে-একে সরে এল বিদিশার কাছ থেকে।
বিছানার পাশের জানলা দিয়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছিল বিদিশা। কোথাও সাদা মেঘ, আর কোথাও নীল আকাশ। কালো মেঘ কোথাও নেই।
