বিদিশা দরজা খুলল। রণজয়কে দেখেই ওর ফরসা মুখ পলকে রক্তহীন হয়ে গেল। ও আকুল আর্ত চোখে অরুণার দিকে তাকাল। যেন বোঝাতে চাইল, ওদের আর কিছু করার নেই। একটা ভয়ংকর বিষধর পাগল সরীসৃপ ধারালো দাঁত নিয়ে হাজির হয়েছে পাখির খাঁচায়। কামড় সে দেবেই।
অরুণাকে এক ঝটকায় পাশে ঠেলে দিল রণজয়। অদ্ভুত এক তৎপরতায় বিদিশাকে টেনে নিল কাছে। চাপা গলায় অস্বাভাবিক সুরে হিসহিস করে বলল, মানু, আমার..মানু…।
বিদিশা সিঁটিয়ে কাঠ হয়ে ছিল। রণজয়ের বাঁ-হাত কিছুক্ষণ অসভ্যের মতো ঘুরে বেড়াল ওর পিঠে। তারপর ওকে পাশে সরিয়ে অরুণাকে ডেকে নিল রণজয়, আপনি এ-ঘরটায় ঢুকুন। আমি আর আপনার মেয়ে ও-ঘরটায় থাকব।
রণজয়ের কাণ্ড দেখে স্তম্ভিত অরুণা চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন মেয়ে-জামাইয়ের দিক থেকে। কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না কিছুতেই। রণজয় তাকে ডেকে যখন বিদিশার ঘরে ঢুকতে বলল তখন তার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল।
বাপ্পা সদর দরজার দিকে ওর ছোট ঘরটায় ঘুমোচ্ছে। ওর ঘুম থেকে উঠতে এখনও অনেক দেরি। রণজয় কি ওকেও ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুলবে নাকি!
অরুণার ঘরের লাগোয়া গ্রিল দেওয়া বারান্দায় গেলে বাগানটা দেখতে পাওয়া যায়। আর একইসঙ্গে লোহার গেট, পিচের রাস্তাও দেখা যায়। সুতরাং বারান্দায় দিকের দরজাটা খুলে চিৎকার চেঁচামেচি করলে রাস্তার লোকজন শুনতে পাবে। কিন্তু এই ভোরে রাস্তায় মানুষজন পাওয়া মুশকিল। তা ছাড়া রণজয় হয়তো সেই সুযোগের কথা আঁচ করেই অরুণাকে বিদিশার ঘরে ঢুকতে বলেছে।
বিদিশার ঘরে ঢুকে অরুণা যখন সুধাময়ের চিন্তায় আর আতঙ্কে বিমূঢ় হয়ে আছেন তখন রণজয় এক চিলতে হেসে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার আগে ছোট্ট করে বলল, প্লিজ, চিৎকার-টিকার করবেন না। করলে আপনার মেয়ের গলা কেটে দেব– কথা শেষ করার সময় হাতের ছুরিটা উঁচিয়ে দেখিয়েছে রণজয়। তারপর বন্ধ দরজার হাঁসকল টেনে দিয়েছে।
মাথা ঝাঁকিয়ে হাত চালিয়ে কপালে এসে পড়া চুল ঠিক করল রণজয়। তারপর রুক্ষভাবে বিদিশাকে আঁকড়ে ধরে টেনে নিয়ে চলল ডাইনিং হলের দিকে।
বন্ধ ঘরের ভেতরে বন্দি হয়ে অরুণা কাঁদতে শুরু করেছিলেন। রণজয়ের সঙ্গে ডাইনিং হলের দিকে যেতে যেতে সেই কান্নার গোঙানি শুনতে পেল বিদিশা। ওরও কেমন কান্না পেয়ে গেল। একইসঙ্গে সুধাময়ের চিন্তাটাও চলে এল মাথায় ও বাপি কোথায়?
ডাইনিং হলে এসেই এক অভদ্র ধাক্কায় বিদিশাকে একটা চেয়ারের দিকে ঠেলে দিল রণজয়। বিদিশা বেশ ব্যথা পেল কোমরে, কিন্তু যন্ত্রণায় চিৎকার করতে ভয় পেল।
ছুরি হাতে রণজয় উদভ্রান্ত বিদিশাকে একবার দেখল, তারপর এগিয়ে গেল বাপ্পার ছোট ঘরের দিকে।
বিদিশা এবার চিৎকার করে উঠল, কিন্তু প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ক্ষিপ্ত চিতার মতো ওর দিকে ছিটকে এল রণজয়। এক ধাক্কায় ওকে চেয়ারসমেত কাত করে ফেলে দিল মেঝেতে।
বিদিশার ভয়ের চিৎকারটা মাঝপথে থেমে গিয়ে ব্যথার গোঙানি বেরিয়ে এল।
অগোছালোভাবে পড়ে থাকা বিদিশার দিকে তাকিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ দিল রণজয়। বিদিশা ওর ভয়ংকর চোখ-মুখ দেখে ভয়ে কাঁদতে শুরু করল।
সকালবেলাতেই নানারকম শব্দ আর কথাবার্তা বোধহয় বাপ্পার ঘুম হালকা করে দিয়েছিল। কারণ, বাপ্পার ঘরের দরজা খোলার শব্দ হল। রণজয় ছুটে সেই দরজায় কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই বাপ্পা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ওর পরনে ডোরাকাটা পাজামা আর স্যান্ডো গেঞ্জি।
বাপ্পাকে দেখে বিদিশা চিৎকার করে উঠল, শিগগির! ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দে! জলদি।
বুট পরা পায়ে বিদিশার পাঁজরে প্রচণ্ড এক লাথি কষাল রণজয়। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ফাকিং বিচ! তারপর এক লাফে পৌঁছে গেল বাপ্পার ঘরের দরজায়। কিন্তু বাপ্পা ততক্ষণে দিদির কথা মতো ঘরে ঢুকেই দরজায় খিল এঁটে দিয়েছে।
রণজয় বন্ধ দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর বাপ্পার ঘরের দরজাতেও হাঁসকল টেনে দিল। ও জানে, বাপ্পার ঘর থেকে পালানোর কোনও উপায় নেই। তা ছাড়া ওর ঘর থেকে চেঁচিয়ে রাস্তার কাউকে ডাকা বেশ কঠিন। কারণ, ওর ঘরের পাশ ঘেঁষে পরপর দুটো খালি প্লট আগাছা আর জঙ্গলে ছেয়ে আছে।
ছুরি হাতে এবার বিদিশার কাছে এসে দাঁড়াল রণজয়। ছুরিটা ডাইনিং টেবিলের একপাশে রেখে দিয়ে ওর দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে তেরছাভাবে হাসল, বলল, এসো বউ, আর কোনও লজ্জা নেই–এবারে ফুলশয্যা হয়ে যাক।
বিদিশার ফরসা সুন্দর মুখ ভয়ে বেঁকেচুরে গেছে। কোমরে, পাঁজরে অসহ্য ব্যথা। ডাইনিং হলের এক কোণে রাখা টেলিফোনের দিকে তাকাল ও। যদি কোনওরকমে শেখরকে একটা ফোন করা যেত। কিন্তু ফোন করেই বা কী হত! শেখর টালিগঞ্জ থেকে আসতে-আসতে কম করেও একটি ঘণ্টা। তখন কি আর সাহায্যের কোনও দরকার হবে!
কিন্তু টেলিফোন আর কাউকে করা যায় না? বাড়ির কাছাকাছি কাউকে? পাশের লেনের রমেশবাবুকে, কিংবা ডক্টর সান্যালকে?
হঠাৎ-ই বিদিশা টের পেল, ও বোকার মতন দিবাস্বপ্ন দেখছে। রণজয়ের সামনে এখান থেকে কাউকে ফোন করা অসম্ভব। টেলিফোনের আর-একটা প্যারালাল লাইন রয়েছে সুধাময়-অরুণার ঘরে। সেটা মনে রেখেই বোধহয় রণজয় অরুণাকে বিদিশার ঘরে টেনে এনে বন্দি করেছে। কিন্তু সেখান থেকেও বা ফোন করবে কেমন করে! যদি সুধাময় থাকতেন বাড়িতে, তা হলে…।
