বাতাসে ভেসে বেড়ানো বৃষ্টির কুচির পরদা ডিঙিয়ে অতিথিকে চিনে নিতে অসুবিধে হল না।
রণজয় সরকার–তাঁর জামাই। একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোহার গেটের কাছে। বাঁ হাতের নখ দাঁতে কাটছে।
আরে, তুমি! এসো, এসো–এই সাতসকালে হঠাৎ–।
ভোরবেলাতেই লোহার গেটের তালা খুলে দেন সুধাময়। তাই গেট ঠেলে ভেতর ঢুকতে কোনও অসুবিধে হল না রণজয়ের।
ওর পরনে গাঢ় নীল জিনস্-এর প্যান্ট, হলুদ রঙের ঢোলা টি-শার্ট।
হালকা চালে সুধাময়ের কাছে চলে এল রণজয় ও সাতসকালে গাছের যত্ন নিচ্ছেন?
সুধাময় বসেই ছিলেন। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখছিলেন রণজয়কে। এই কাকভোরে কী জন্য এসেছে ছেলেটা? কোনও বদ মতলব নিয়ে আসেনি তো? হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে না। কে জানে, হয়তো অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইতে এসেছে মানুর কাছে।
রণজয়ের মুখ হঠাৎ বিষণ্ণ হল। দু-হাত একসঙ্গে জড়ো করে মাথা নীচু করে নিজের জুতোর দিকে তাকাল ও। নরম গলায় বলল, কাল সারা রাত আমি ঘুমোতে পারিনি। আপনাদের কাছে।
আমি মরমে মরে আছি। আপনি…আপনি আমাকে…।
ঠিক আছে..ঠিক আছে…যাও, ভেতরে যাও। মানু বোধহয় এখনও ঘুমোচ্ছে..।
ছেলেটার চোখে জল। ওর রোগা ফরসা মুখে গাঢ় বিষণ্ণতা মাখানো। সুধাময়ের ভীষণ মায়া হচ্ছিল।
আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন, বাবা– বলে ঝুঁকে পড়ে সুধাময়ের পায়ের ধুলো নিল রণজয়।
থাক, থাক– ওকে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন সুধাময়। কিন্তু তিনি লক্ষ করেননি, রণজয় যখন সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে তখন ওর হাতের মুঠোয় ধরা রয়েছে একটা ধারালো হেঁসো। আগাছা পরিষ্কার করার জন্য সুধাময়ই ওটা নিয়ে এসেছিলেন কোণের ঘর থেকে।
রণজয়ের নিষ্ঠুর বাঁ-হাত চেপে ধরল সুধাময়ের চুলের মুঠি। এক হ্যাঁচকায় তার মাথাটাকে হেলিয়ে দিল পিছনে। পলকের জন্য সুধাময় দেখতে পেলেন মেঘলা আকাশের পটভূমিতে রণজয়ের বিকৃত মুখ ওর দু-চোখের লালসা, আর তীব্র বাঁকা পথে তার গলা লক্ষ করে নেমে আসা হেঁসোটা।
চিৎকার করতে পারলেন না সুধাময়। কিন্তু তার চিৎকারের চেষ্টাটা বুদ্ধুদের মতো বেরিয়ে এল গলার ফাঁক দিয়ে। আর রক্ত ছিটকে গিয়ে ছাপ ফেলল রণজয়ের জিন্স-পরা প্যান্টে।
তার প্রিয় গাছপালার পাশে চিত হয়ে পড়ে গেলেন সুধাময়। তার সামান্য হাঁ হয়ে থাকা মুখে বৃষ্টির কণা ঢুকে পড়ছিল। বাতাসে ছটফট করতে করতে গাছের পাতাগুলো ভীষণ অবাক হয়ে বারবার সুধাময়কে জিগ্যেস করছিল, তোমার কী হল গো? কী হল তোমার? অমন চুপ করে অবাক চোখে তাকিয়ে কী দেখছ? কিন্তু সুধাময় ওদের আর্ত প্রশ্ন শুনতে পাচ্ছিলেন না।
রণজয় হেঁসোটা ফেলে দিল সুধাময়ের দেহের পাশে। তারপর অত্যন্ত সহজ হালকা পায়ে দু-ধাপ সিঁড়ি উঠে চলে এল মোজেইক করা বারান্দায়। সদর দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল, রণজয় সতর্ক হাতে সেটা ঠেলে ঢুকে পড়ল বিদিশাদের বাড়ির ভেতরে। তারপর দরজা লক করে ছিটকিনি এঁটে দিল।
বাড়ির ভেতরটা নিঝুম…আবছায়া অন্ধকার। একে মেঘলা, তার ওপর সব কটা জানলাতেই পরদা টানা। কিন্তু এ বাড়ির ভূগোল রণজয়ের নিজের হাতের চেটোর মতোই চেনা। তাই ও বেড়ালের মতো পা ফেলে এগিয়ে গেল বিদিশার ঘরের দিকে। মানু কোথায়?
বিদিশার ঘরের দরজাটা বন্ধ। এখনও ও ঘুম থেকে ওঠেনি।
তার পরের ঘরটাই অরুণা-সুধাময়ের। অবশ্য এখন থেকে শুধুই অরুণার। সেই ঘরের দরজা স্বাভাবিকভাবেই ভোলা। সুতরাং শাশুড়ির ঘরে ঢুকে পড়ল রণজয়।
অরুণা তখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। তবে হালকা ঘুমের মধ্যে সামান্য এপাশ-ওপাশ করছিলেন। রণজয় ওর ডান হাতটা কলারের পাশ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল পিঠে। তারপর ঢোলা টি শার্টের ভেতর থেকে টেনে বের করে নিয়ে এল খবরের কাগজে ভালো করে মোড়া লম্বা মতো একটা কী যেন। ব্যস্ত হাতে মোড়কের কাগজগুলো খুলে ফেলে দিতেই করাতের দাঁতওয়ালা একটা ঝকঝকে ছুরি দেখা গেল। সেটা ডান হাতে বাগিয়ে ধরে অরুণাকে ধাক্কা মারল রণজয়।
আচমকা রুক্ষ ধাক্কায় চমকে জেগে উঠলেন অরুণা। ঘুম জড়ানো চোখে যা দেখলেন তা যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তার মুখের ভেতরটা কেমন শুকিয়ে গিয়ে জিভটা খসখস করছে। বুঝতে পারলেন, চিৎকারের চেষ্টা করে লাভ নেই, কারণ কোনও শব্দ বেরোবে না তার গলা দিয়ে। আর এ-ও বুঝতে পারলেন, কোন রণজয়কে দেখে বিদিশা এতদিন ভয় পেয়েছে।
রণজয়ের চোখে পাগলের দৃষ্টি, মুখে হাসি, হাতে করাতের দাঁতওয়ালা ছুরি। ও ঠান্ডা গলায় বলল, ভয়ের কিছু নেই। মানুকে ডাকুন।
সুধাময়ের জন্য দুশ্চিন্তা হল অরুণার। মানুষটাতো বাইরে গাছগাছালি নিয়ে থাকার কথা। এখনও সেখানে আছে তো? ওকে কিছু করেনি তো রণজয়!
অরুণাকে এক হ্যাঁচকায় বিছানা থেকে টেনে নামাল রণজয়। তারপর একইরকম শান্ত গলায় বলল, মানুকে ডাকুন।
বিস্রস্ত পোশাক ঠিক করতে করতে বিদিশার ঘরের দরজায় এলেন অরুণা। দরজায় ধাক্কা দিয়ে মেয়েকে নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকলেন। অনেকক্ষণ পর ঘুম জড়ানো গলায় সাড়া দিল বিদিশা।
অরুণার বুকের ভেতরে হাতুড়ি পড়ছিল। সাতসকালের এই অদ্ভুত ঘটনা তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তার মুখের ভেতরে জিভ নড়ছিল, কিন্তু বুঝতে পারছিলেন কথা বলার চেষ্টা করলে কথা জড়িয়ে যাবে।
