তুমি আমাকে আর বিরক্ত কোরো না। নইলে আমি থানা-পুলিশ করতে বাধ্য হব। তোমার মতো ছোটলোক পাগলের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ আমি রাখতে চাই না। তুমি তোমার মাকে নিয়েই থাকো। তোমরা দুজনেই তো অ্যাবনরমাল-ফলে দিব্যি সুখে থাকতে পারবে…।
একইভাবে রণজয় আবার বলল, মানু, তোমাকে আমি ছাড়ব না…।
এবং লাইন কেটে দিল।
হঠাৎই বিদিশার শরীরের ভেতরে যেন লোডশেডিং হয়ে গেল। টলে পড়ে যেতে গিয়েও ও একটা থাম ধরে সামলে নিল। তারপর থামটার হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
সুধীর বোস তার ড্রাফটিং টেবিল থেকে ব্যাপারটা লক্ষ করেছিলেন। তিনি প্রায় ছুটে এসে বিদিশাকে হাত ধরে কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। কোথা থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে ধরলেন বিদিশার মুখের সামনে। বললেন, মা জননী, একচুমুক জল খেয়ে নাও, ভালো লাগবে…।
বিদিশা চোখ বুজে চেয়ারে গা এলিয়ে ছিল। বোসদার কথায় গ্লাসের জলটা ঢকঢক করে খেয়ে নিল। বোসদাকে ওর ভীষণ ভালো লাগছিল। মনে পড়ল, সকালে এই মানুষটাই ওর আর শেখরের আঘাত আর ক্ষতচিহ্ন লক্ষ করে মন্তব্য করেছিলেন, তোমরা কি অফিসের পর ফ্রি স্টাইল কুস্তি লড়তে গিয়েছিলে নাকি? বয়েসকালে আমিও ওরকম অনেক কুস্তি লড়েছি। তা আমাকেও সঙ্গে নিতে পারতেনিদেনপক্ষে না হয় রেফারি হতাম। তারপর দিলখোলা হেসে শেখরকে বলেছেন, শেখর, সত্যি-সত্যি বলো তো, কী করে চোট পেলে?
শেখর মনগড়া একটা সাফাই দিয়েছে। বিদিশাও তাই। কিন্তু এখন চোখ খুলে ও দেখল, বোসদা স্নেহমাখানো উৎকণ্ঠায় ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। কপালে বেশ কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে।
শেখরও কাছে এগিয়ে এসেছিল। ওর আশেপাশে আরও কয়েকজন।
এত মানুষের ভিড় দেখে বিদিশা কেমন অস্বস্তি পেয়ে গেল। ও আলতো গলায় বলল, এখন অনেকটা ভালো লাগছে… তারপর ধীরে-ধীরে উঠে ফিরে গেল নিজের সিটে।
শেখর, বোসদা ও আরও দুজন সহকর্মী বিদিশার সঙ্গে-সঙ্গে যাচ্ছিল। বিদিশা ক্লান্ত গলায় বলল, আপনাদের আসার দরকার নেই। হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে গিয়েছিল…এখন ঠিক আছি…আমি একটু একা থাকতে চাই…।
ওরা আর এগোল না। শেখর শুধু বলল, ছুটির পর আপনার সঙ্গে বেরোব–।
বিদিশা ফিরে না তাকিয়েই ঘাড় নড়ল–অর্থাৎ, ঠিক আছে।
নিজের সিটে এসে ক্লান্তভাবে টেবিলে মাথা নামিয়ে রাখল বিদিশা। রণজয়ের হিংস্র মুখটা ও দেখতে পেল। কী শান্তভাবেই না বাঁচতে চেয়েছিল বিদিশা। অথচ এই অসুস্থ বিকারগ্রস্ত লোকটা ওর জীবনকে নরক করে তুলেছে। বিদিশা কি পালটা জবাব দিতে পারে না ওকে? তিল-তিল টেনশনের ভয়ংকর বিষ কি ও ছড়িয়ে দিতে পারে না ওই অমানুষটার জীবনেও?
বিদিশার বারবারই মনে হচ্ছিল, রুখে দাঁড়ানো দরকার। এইবার রুখে দাঁড়ানো দরকার।
চোখ বুজে থাকা সেই ঘোরের মধ্যে বিদিশা হিংস্র পশুটার গলা শুনতে পেল : মানু, তোমাকে আমি ছাড়ব না।
.
ভোরবেলা থেকেই মিহিদানার মতো বৃষ্টি পড়ছিল। ভোরের আকাশ আর ঘড়ির কাটায় কোনও মিল ছিল না। কিন্তু রোজকার অভ্যেস মতো সুধাময়ের জৈবিক-ঘড়ি তাকে জাগিয়ে দিয়েছিল সাড়ে পাঁচটার সময়ে। নিয়মমাফিক কাজ সেরে সুধাময় বেরিয়ে এসেছেন বাইরের বাগানে। কোণের একটা ঘর থেকে বাগান পরিচর্যার দু-একটি যন্ত্রপাতি নিয়ে চলে এসেছেন তার প্রিয় গাছপালার কাছে। বর্ষার জলবায়ুতে বেড়ে ওঠা সবুজ পাতার দল তাকে মাথা নেড়ে সুপ্রভাত জানাল। সুধাময় হাঁটুগেড়ে বসে পড়লেন ওদের কাছে।
সুধাময়ের পরনে লুঙি আর হাতাওয়ালা গেঞ্জি। তাঁর কাধ আর বাহু দেখলেই শরীরের শক্ত কাঠামো টের পাওয়া যায়। হাতের পিঠে আর কবজির কাছে দড়ির মতো ফুলে রয়েছে শিরা উপশিরা। মাথার কঁচাপাকা চুলে আর চশমার পুরু লেন্সের কাছে বৃষ্টির মিহি গুঁড়ো লেগে আছে। অথচ সেদিকে কোনও খেয়ালই নেই তার। কারণ, তিনি তখন শ্বেত করবী গাছের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আর একইসঙ্গে গাছ কাটার বড় কাঁচি নিয়ে করবী গাছের বেপরোয়া বেড়ে ওঠা ডালপালা হেঁটে মানানসই করে দিচ্ছিলেন।
একটা সিগারেটের জন্য তার ঠোঁটে গলায় কেমন তেষ্টা জাগছিল, কিন্তু সুধাময় চেষ্টা করে সেটা সামাল দিচ্ছিলেন। কয়েকবছর ধরে হাঁপের টানে কষ্ট পাচ্ছেন তিনি। সেই কারণেই রোজকার সিগারেটের অভ্যাস সাংঘাতিকভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। ইচ্ছে আছে, মনের সঙ্গে মোকাবিলায় পেরে না উঠলে এই নেশাটা একেবারে ছেড়েই দেবেন।
এখন তোর ফুলের দিকে মনোযোগ দেওয়ার দরকার নেই–তোর শরীরের দিকে মন দে। শরীর না থাকলে ফুল ফোঁটাবি কী করে? আপনমনে কথা বলার সঙ্গে-সঙ্গে সুধাময়ের কঁচি চলছিল।
শ্বেত করবীর পর চারটে দোপাটি গাছ। একটাতেও ফুল নেই, শুধুই সবুজ পাতা। বর্ষায় কোঁকড়া-ঝকড়া হয়ে বেড়ে উঠেছে।
তোরা দেখছি পাতাবাহার গাছ হয়ে গেলি! অবশ্য কী করে ফুল দিবি! এখন তো ঠিক ফুলের সময় নয়।
হাতের কাঁচি রেখে সুধাময় গাছের পাতার ফাঁকে মাথা ঢুকিয়ে লালচে-সবুজ ডালগুলো খুব ভালো করে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। এই সময়ে নজর না রাখলে একরকম সাদা-সাদা পোকা হয়।
পোকা খুঁজতে খুঁজতেই গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে লোহার গেটের দিকে চোখ গেল তাঁর। গেটের বাইরে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
গাছের পাতার আড়াল থেকে মাথা বের করে নিয়ে এলেন সুধাময়। সকাল ছটায়। এ কোন অতিথি এসে হাজির হল!
