কী আশ্চর্য! আর-একটু হলেই শেখরের থ্রিল-খোঁজা জীবন খতম হয়ে যেতে পারত, অথচ শেখরের মনে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। বরং অল্পের জন্য রণজয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ওর আপশোশ হচ্ছিল।
একটু পরেই বিদিশা যখন কথা বলল, তখন ও একেবারে অন্য মানুষ।
সুধাময়-অরুণা বারবার বলেছিলেন যে, ওর কিছুদিন অফিসে না যাওয়াই ভালো। বিপদটা কেটে যাক, তারপর দেখা যাবে।
উত্তরে বিদিশা রুক্ষ গলায় বলে উঠল, এ-বিপদ কোনওদিন কাটবে না। যেদিন আমি অফিসে যাওয়া শুরু করব সেদিনই আবার বিপদ হতে পারে। তা ছাড়া বাড়িতে বসে থাকলেই যে কোনও বিপদ হবে না তার কী মানে আছে! যে মানুষটার মাথার গণ্ডগোল সে কখনও সুবিধে-অসুবিধে ভেবে কাজ করে নাকি? আমি কাল অফিসে যাব। আমাকে ভয় পেতে দেখলেই রণজয় আরও পেয়ে বসবে।
বহু তর্কবিতর্ক করেও বিদিশাকে টলানো গেল না। শেখরও কিছুক্ষণ চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিল। অরুণা অনেক কান্নাকাটি করলেন, কিন্তু বিদিশার একরোখা জেদকে হারাতে পারলেন না।
বিদিশাদের পারিবারিক ব্যাপারের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে শেখরের ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। ও বাড়িতে একটা ফোন করে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। এখন দ্বিতীয়বার ফোন করে বলল, এখনই রওনা হচ্ছে।
ও চলে আসার আগে বিদিশা ছোট্ট করে জিগ্যেস করেছিল, কাল অফিসে আসছেন তো?
অফ কোর্স। জবাব দিয়েছিল শেখর, আমি অফিসে না এলে আপনাকে সেলি বাড়িতে পৌঁছে দেবে কে?
উত্তরে ম্লান হেসেছিল বিদিশা। পৃথিবীটা এখনও রণজয়রা কিনে নিতে পারেনি…শেখররাও আছে।
.
শেখর বলল, আজ অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরোবেন। আপনাদের বাড়ির কাছটা বেশ অন্ধকার। সন্ধে পার হলেই লোকজন ফিকে হয়ে আসে।
কয়েক মুহূর্ত ভেবে বিদিশা সায় দিল, বলল, তা হলে আধঘণ্টা আগে বেরোব।
ঠিক তখনই পি. এল. চক্রবর্তী কোথা থেকে যেন প্রায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। বিদিশার পিঠে হাত দিয়ে তাগাদা দিতে-দিতে বললেন, অ্যাই, বিদিশা, চলো, চলো। খুব জরুরি কয়েকটা ডিকটেশন দেওয়ার আছে।
বিদিশা কুঁকড়ে সরে গেল চক্রবর্তীসাহেবের সুযোগসন্ধানী হাতের আওতা থেকে। উঠে দাঁড়াল চট করে।
প্রশান্ত চক্রবর্তীর স্বভাবটাই এইরকম। সবসময় ছোঁকছোঁক করে বেড়ান। বিদিশার শরীরের যেখানে-সেখানে যৌনতা খুঁজে বেড়ান। বিদিশার গা ঘিনঘিন করে। এই লোকটাও রণজয়ের চেয়ে কম অসুস্থ নয়। শুধু রোগ-লক্ষণগুলো অন্যরকম।
চোখের ইশারায় শেখরকে আসছি বলল বিদিশা। দেখল শেখরের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ও চক্রবর্তীসাহেবের অসভ্যতায় ভেতরে-ভেতরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে।
পি. এল. চক্রবর্তীর ডিকটেশন আর গায়ে-পড়া গালগল্পের হাত থেকে বিদিশা রেহাই পেল প্রায় ঘণ্টা-দেড়েক পর। নিজের টেবিলে ফিরে ও চিঠিগুলো টাইপ করতে বসবে, দেখল ওর টেবিলে একটা ইনল্যান্ড লেটার পড়ে আছে।
চেয়ারে গুছিয়ে বসে চিঠিটা খুলল বিদিশা।
যা ভেবেছিল তাই। রণজয়ের চিঠি। সেই একঘেয়ে কাঁদুনিঃ তুমি ফিরে এসো। আর চিঠির শেষ দিকে নির্লজ্জভাবে নোংরা ভালোবাসার কথা লেখা রয়েছে। সেই সঙ্গে কঁচা হাতের রেখায় আঁকা নারী-পুরুষের মিলনের ছবি।
রাগে চিঠিটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে লিটার বিনে ফেলে দিল বিদিশা। শরীরে ও কেমন এক অসহ্য জ্বালা টের পাচ্ছিল। ওর শান্তশিষ্ট জীবনটা একটা ভয়ংকর জন্তু কীরকম তছনছ করে দিচ্ছে।
বিদিশা আনমনাভাবে ভোলা জানলার দিকে তাকাল। আকাশে গাঢ় মেঘ। কিন্তু কোথাও কোথাও নীলের আভাস। আর কতদিন থাকবে এই মেঘ? লুকিয়ে থাকা নীলের জন্য আকুল হল বিদিশা।
বিদিশা কতক্ষণ যে ও-ভাবে বসে ছিল খেয়াল নেই। হঠাৎই দেখল, বঞ্জারা ওর টেবিলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
ম্যাডাম, আপনার ফোন আছে।
বিদিশা উঠে দাঁড়াল। রোবটের মতো নিপ্রাণ পায়ে এগিয়ে গেল টেলিফোনের দিকে। ও জানে, এই টেলিফোনটা কে করেছে। কিন্তু এত দেরি হল কেন? আরও অনেক আগে এই ফোনটা আসা উচিত ছিল।
হ্যালো টেলিফোনে যান্ত্রিক স্বরে কথা বলল বিদিশা।
কাল রাতের ওই শুয়োরের বাচ্চাটা কে? ক্ষিপ্ত রণজয়ের কথা ফেটে পড়ল রিসিভারে।
বিদিশা একটা ধাক্কা খেল। ভাবল, রিসিভার নামিয়ে রাখবে। কিন্তু তার পরই একটা তীব্র জেদ আর রাগ ফুটতে শুরু করল ওর মাথার ভেতরে। না, হার মানবে না বিদিশা। ও এই অসভ্য পাগলটার মোকাবিলা করবে।
ছোটলোকের মতো কথা বোলো না। এটা অফিস। এখানে ভদ্রলোকেরা কাজ করে। চাপা ধমকের সুরে বলল বিদিশা।
ও-প্রান্তে আসল রণজয়নোংরা হাসি। বলল, তুমি কি ভেবেছ ওই ভাড়া করা জানোয়ারটা তোমাকে বাঁচাতে পারবে! আমি ওটাকে খতম করে দেব। কেটে টুকরো-টুকরো করে ভাসিয়ে দেব মানিকতলার খালে। তারপর তোমাকে চৌরাস্তায় ন্যাংটো করে…।
চুপ করো। বদ্ধ পাগল কোথাকার বিদিশা হিসহিস করে বলল।
মানু, আমি তোমাকে কতবার বলেছি…।
রণজয়ের কথার ওপরে কথা বলল বিদিশা, তুমি একটা আস্ত পাগল। তোমার মাথার ভেতরে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে আছে। তোমার পাগলামি তোমার মা সহ্য করতে পারে–সেখানে গিয়ে পাগলামি করো–আমার সে-দায় নেই।
মানু– মিষ্টি করে বলল রণজয়, তোমাকে আমি ছাড়ব না, কিছুতেই ছাড়ব না। মিষ্টি সুরে বলল, কিন্তু সেই মুহূর্তে রণজয়ের মুখটা দেখলে বিদিশা ভয় পেত।
