বিদিশাকে কেমন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। দু-চোখে ভয় আর উৎকণ্ঠা। ঠোঁটের কোণে রক্তের দাগ। ও জিগ্যেস করল, আপনার লাগেনি তো, শেখর!
শেখর বলল, চিন্তা করবেন না। তেমন কিছু নয়।
দু-চারজন পরামর্শ দিল একটু ফার্স্ট এইড সেরে নেওয়ার জন্য। কে যেন একটা সাইকেল রিকশা ডেকে ওদের তুলে দিল। বলল, কোয়ালিটি স্টপেজের পাশে ওষুধের দোকান আছে। ওখানে দেখিয়ে নিন। আর পুলিশে একটা ডায়েরি করে দেবেন। এদিকটায় ছিনতাই বড্ড বেড়েছে।
রিকশা যখন চলতে শুরু করেছে তখন পিছন থেকে টুকরো একটা মন্তব্য ওদের কানে এল ও এই অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে কেউ কখনও এখানে প্রেম করতে আসে।
উত্তরে একজন বলল, না, না–ওরা আপনি করে কথা বলছিল…।
রাখুন, রাখুন। ও-সব লোকঠকানো প্যাঁচ পুরোনো হয়ে গেছে…।
রিকশা কালো রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল।
.
লাঞ্চের পর সুধীর বোস খড়কে দিয়ে দাঁত খোঁচাতে-খোঁচাতে শেখরের টেবিলের কাছে এলেন। সেখানে বিদিশা আর দেবলীনা দাঁড়িয়ে ছিল। আর একটা চেয়ারে বসে ছিল অশোক। লাঞ্চের পর আধঘণ্টাটাক অফিসের মেজাজটা একটু ঢিলেঢালা থাকে।
বোসদা এসেই ঘোষণা করলেন, শুনেছ শেখরভায়া, আমাদের অফিসে শক্তিশালী জয়েন করেছে।
শক্তিশালী মানে? একটু অবাক হয়ে শেখর জিগ্যেস করল। ওর গলার বাঁ দিকটায় স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো। এখন আর তেমন ব্যথা নেই।
বোসদা হাসলেন : তোমাদের কি সমাস-টমাস কিছুই পড়ানো হয়নি! শক্তিশালীর ব্যাসবাক্য হল, শক্তিপ্রসাদের শালি। আমাদের এম.ডি.-র পি.এ. শক্তিপ্রাসাদের শালি আজ থেকে কোম্পানিতে জয়েন করেছে।
শেখর হাসল। দেবলীনা আর বিদিশাও।
অশোক হেসে বলল, তো আপনার এত হিংসে কেন? আপনিও আপনার শালিকে এখানে ঢুকিয়ে দিন না–।
সুধীর বোস চোখ ছোট করে হেসে বললেন, আমার শালিকে আমি কোথায় ঢোকাব সেটা আমার ওপরেই ছেড়ে দাও না বাবা!
আপনার সঙ্গে না কথা বলা যায় না, বোসদা– বলে হাসি চেপে উঠে চলে গেল অশোক।
বোসদা কপট বিস্ময়ে তিনজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি কী খারাপ কথাটা বললাম। তুমিই বলো, জননী বিদিশার দিকে ফিরে বললেন বোসদা।
বোসদা, প্লিজ… প্রায় আবেদনের গলায় বলল বিদিশা।
দেবলীনা বলল, আমি সিটে যাই। নইলে পি. এল. চক্রবর্তী আবার ঝামেলা করবে।
ও চলে যেতেই বোসদা বললেন, দেবলীনা পালের একটাই বড় ডিফেক্ট, বড় লাজুক।, ভাই, তোমরা গপ্পো করো, আমি নীচ থেকে ঝট করে একটা পান খেয়ে আসি বলে দাঁত খুঁটতে-খুঁটতে সুধীর বোস চলে গেলেন।
অশোকের ছেড়ে যাওয়া চেয়ারটা দেখিয়ে শেখর বিদিশাকে বসতে বলল। তারপর জিগ্যেস করল, এখন কেমন আছেন?
সারাদিনে এই প্রথম ওরা আলাদা কথা বলতে পারছে।
বিদিশার ঠোঁটের কোণ, গাল ফুলে আছে। ঠোঁটের কোণে ক্ষতচিহ্ন চোখে পড়ছে। ফরসা গলায় কালচে দাগ। আজ তেমন করে সাজগোজ করেনি ও। চোখে বিষাদ আর অনিশ্চয়তার ছায়া।
আমি ঠিক আছি। একটু থেমে : আপনি?
হাসল শেখর। ওর টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ইংরেজি পেপারব্যাক বের করল। বলল, আমি কাল সকালের মতোই থ্রিল খুঁজে বেড়াচ্ছি। নিন, এই বইটা দেখুন, ইচ্ছে হলে পড়তে পারেন…।
বিদিশা বইটার নাম দেখল ও ইন্টারভিউ উইথ দ্য ভ্যাম্পায়ার। তারপর মাথা নেড়ে না বলল। তারপর একটু সময় নিয়ে জিগ্যেস করল, সত্যি ঠিক আছেন? আমার খারাপ লাগছে। শুধু শুধু নিজের ঝামেলায় আপনাকে জড়ালাম…।
বিদিশার সাহস শেখরকে হতবাক করে দিয়েছিল। ও চাপা গলায় বলল, ঝামেলার আর কী আছে! কাল হোঁচট খেয়ে ওরকম পড়ে না গেলে আপনার এক্স হাজব্যান্ডকে চন্দ্রবিন্দু করে ছেড়ে দিতাম। একটু থেমে তারপর ও আমার কথা বাদ দিন। আমি তো সবসময় থ্রিল খুঁজে বেড়াই। কিন্তু আপনার ভয় করে না?
বিদিশা কাচের চোখে শেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, না। কাল রাতের পর আমার সমস্ত ভয় পাওয়ার ক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে।
কথাটা বিদিশা মিথ্যে বলেনি।
কাল রাতে এক ডিসপেনসারি থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা সেরে ওষুধ নেওয়ার পর বিদিশাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল শেখর।
সারাটা পথ বিদিশা কোনও কথা বলেনি। শুধু একবার বিড়বিড় করে বলেছে, রণজয় আমাকে বাঁচতে দেবে না। হয় ও, নয় আমি–যে-কোনও একজন থাকবে।
শেখর আগে কখনও বিদিশাদের বাড়ি আসেনি। বিদিশা কখনও আসার কথা বলেনি। কারণ, শেখর তখন ওর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানত না। এখন সবকিছু পালটে গেছে। তাই রাত সাড়ে আটটা নাগাদ যখন ওরা দুজনে অরুণা-সুধাময়-এ পৌঁছোল তখন বিস্ময়, উৎকণ্ঠা, আশঙ্কা, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
অনেক প্রশ্ন, অনেক আলোচনা, অনেক কথা কাটাকাটি। রণজয়ের কাছ থেকে বিপদের ব্যাপারটা যে কত মারাত্মক হতে পারে সেটা অরুণা কিছুতেই বুঝতে চাইছিলেন না। তখন শেখর জামা সরিয়ে নিজের ক্ষতচিহ্নটা দেখাল। অরুণা কথার মাঝখানেই চুপ করে গেলেন। বুঝতে পারলেন, শেখর শেষের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সুধাময় পুলিশে ফোন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। অরুণা বললেন, ফোন করে তরুবালাকে সব জানাতে। বদ্ধ পাগল ছেলে কী ভয়ংকর পাগলামিতে মেতে উঠেছে সেটা মায়ের জানা দরকার। বাপ্পা রণজয়কে ফোন করে সরাসরি হুমকি দিতে বলল। বিদিশা হতাশায় কাঁদতে লাগল। আর এ-বাড়িতে প্রথম অতিথি শেখর বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর গলার পাশটা ব্যথা করছে। সামান্য চিনচিনে জ্বালাও করছে।
