বাঁ হাতে শক্ত করে ওর গলা খামচে রেখে ডান হাতে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় কষাল রণজয়।
বিদিশা চোখে সরষে ফুল দেখল। তার পরই চোখের সামনে একটা কালো পরদা নেমে এল যেন। মুখের বাঁ দিকটা অসহ্য যন্ত্রণায় অসাড় হয়ে মাথা ধরে গেল। ঠোঁটে নোনা স্বাদ পেল ও। এই অন্ধকার বৃষ্টিভেজা রাতে ও কি রণজয়ের হাতে খতম হয়ে যাবে?
শেখর সেনের কথা মনে পড়ল : .যদি হঠাৎ করে ভদ্রলোক খেপে উঠে আপনাকে অ্যাটাক করেন?
আপনি কী করতে চান?
আপনি যা হুকুম করবেন।
দেন হিট হিম–
শেখর সেন যখন স্বামী-স্ত্রীকে দেখতে পেল তখন বিদিশার শরীরটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় হাঁটুগেড়ে বসে পড়েছে। আর ফরসা রোগা একটা বদ্ধ উন্মাদ তখনও হিংস্রভাবে বাঁ হাতে খামচে ধরে আছে বিদিশার গলা।
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। শেখরের মাথার ভেতরেও। অন্ধকার এ. ই. ব্লকের রাস্তাটা চোখের সামনে টালিগঞ্জের ভোরবেলার রাস্তা হয়ে গেল। যে-রাস্তায় শেখর প্রতিদিন ভোরবেলা দৌড়োয়।
অনেক কষ্টে একঘেয়ে জীবনে খ্রিল দেখা দিয়েছে। শেখরের মনে পড়ল মাই লাইফ উইথ নাইফ, ইয়র্কশায়ার রিপার-এর কথা। বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে থ্রিল নেমে এসেছে বাস্তবের রাস্তায়। এ-সুযোগ ছেড়ে দেওয়ার কোনও মানে হয় না।
হাতের ছাতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ছুটতে শুরু করল শেখর। আবছায়া অবয়বের অমানুষটা তখন বিদিশাকে পেড়ে ফেলেছে পথের ওপরে। দু-হাতে ওর শাড়ি-জামাকাপড় ধরে টানছে। আর আপনমনেই চিৎকার করে কীসব বলছে। শেখরের মাথায় সে-সব তখন একবর্ণও ঢুকছিল না।
ছুটতে ছুটতে লোকটার প্রায় ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ল শেখর। সপাটে এক লাথি চালাল লোকটার কোমরে। লোকটা খানিকটা দূরে ছিটকে পড়ল, কিন্তু বিদিশার শাড়ির আঁচল তখনও তার মুঠোয় ধরা।
শেখর আনন্দে টগবগ করে ফুটছিল। বইয়ের পাতা শেষ পর্যন্ত তা হলে সত্যি হল!
ও পড়ে যাওয়া রণজয়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে না পড়ে ওর একটা পা চেপে ধরল। তারপর ওর দেহটা হিড়হিড় করে টানতে লাগল পিচের রাস্তায় ওপরে।
শেখরের মাথার ভেতরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছিল বারবার। আর ঝিম্ফাক মিউজিক বাজছিল। রণজয়ের পলকা শরীরটাকে নিয়ে ও দিশেহারার মতো ছুটে বেড়াচ্ছিল রাস্তার এদিক-সেদিক।
এক সময় ও থামল। হাঁফাতে-হাঁফাতে ঝুঁকে পড়ল রণজয়ের ওপরে। বাঁ-হাতে চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলল ওকে। তারপর ওর কেটে-ছেড়ে যাওয়া মুখে ডান হাতের এক ভয়ংকর ঘুষি বসিয়ে দিল।
আঁক শব্দ করে উঠল রণজয়। ওর নাক ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল। শেখর পর-পর আরও তিনটে ঘুষি চালাল। চুলের মুঠি ধরে থাকা মাথাটা ঝাঁকুনি খেয়ে গেল তিনবার।
শেখর শুনতে পাচ্ছিল, ওর কানের ভেতরে কে যেন বারবার বলছে, দেন হিট হিম। দেন হিট হিম, দেন হিট হিম… আর শেখর সেই অলৌকিক নির্দেশের প্রতিটি শব্দ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করছিল।
ক্লান্ত শেখর আহত রণজয়কে একসময় ছেড়ে দিল। বৃষ্টি তখন আরও জোরে নেমেছে।
শেখর একপলক অন্যমনস্ক হয়ে ঘুরে তাকিয়েছিল দুরে রাস্তায় পড়ে থাকা বিদিশার দিকে। সেই ফাঁকে রণজয় কোথা থেকে একটা লুকোনো ছুরি বের করে নিমেষে চালিয়ে দিল শেখরের মুখ লক্ষ করে।
ঠিক সেই সময়ে হেডলাইট জ্বেলে একটা গাড়ি বাঁক দিয়েছিল এ. ই. ব্লকের দিকে। গাড়িটার আলো রণজয়ের মুখে এসে পড়েছিল, আর শেখরের পিঠ-কাঁধ গাঢ় ছায়া ফেলেছিল রণজয়ের শরীরে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ছুরিটা চালিয়েছিল রণজয়।
নেহাতই প্রতিবর্তী ক্রিয়ার বশে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল শেখর। তাই ছুরির ফলা ওর গলা আর ঘাড়ে রক্তাক্ত আঁচড় টেনে দিল। শেখর আহত জন্তুর মতো গনগনে রাগে রণজয়ের দু-পায়ের ফাঁকে এক মারাত্মক লাথি কষিয়ে দিল।
রণজয় চকিতে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল বটে, কিন্তু লাথিটা পুরোপুরি এড়াতে পারল না।
ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসা গাড়িটার হেডলাইটের আলোয় রণজয়ের রক্তমাখা মুখ ফ্যাকাসে লাগছিল। ও গাড়িটার দিকে একবার তাকিয়েই খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে ছুটে পালাল অন্ধকারে। ওকে তাড়া করতে গিয়ে শেখর হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। ওর গলা বেয়ে তখন দরদর করে রক্ত পড়ছে। কিন্তু ওই জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্যেও শেখর থ্রিলের কথা ভাবছিল, বিদিশার কথা ভাবছিল।
জ্ঞান হারানোর আগে শেখর দেখল, গাড়িটা ওর কাছটিতে এসে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেছে। দুজন ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে এসেছেন। কেউ যেন ওকে বহুদূর থেকে জিগ্যেস করছে, কী ব্যাপার, দাদা? কী হয়েছে?
আর একজন যেন কোথা থেকে বলে উঠল, মনে হয় ছিনতাইয়ের কেস।
কথাবার্তার শব্দ ক্রমেই বাড়ছিল।
কে যেন হুড়হুড় করে খানিকটা ঠান্ডা জল ঢেলে দিল শেখরের মুখে। ও চমকে চোখ মেলে তাকাল। এ কী! ও রাস্তায় পড়ে কেন? এই অন্ধকারে বৃষ্টিতে ও কী করছে? গলার পাশটা জ্বালা করছে। কয়েকটা ছায়া-ছায়া মুখ ঝুঁকে রয়েছে ওর শরীরের ওপরে।
তাড়াতাড়ি উঠে বসল শেখর। আর তখনই ওর রণজয়ের ব্যাপারটা মনে পড়ল। ও পকেট থেকে রুমাল বের করে চেপে ধরল গলায়। কয়েকটা হাত ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল।
উঠে দাঁড়িয়ে বিদিশাকে দেখতে পেল শেখর। ছাতা দুটো কুড়িয়ে নিয়ে ওর কাছে এগিয়ে গেল। নানাজনের প্রশ্নের উত্তরে ছিনতাইয়ের চেষ্টার কথাই বলল শেখর। কেন যেন মনে হল, রণজয়ের ব্যাপারটা বলে ফেলা ঠিক হবে না।
