বাসটা চলে যেতেই রাস্তার ওপারে বিদিশাকে দেখতে পেল শেখর। একা-একা দাঁড়িয়ে এপাশ ওপাশ দেখছে। রণজয়কে খুঁজছে।
যখন ওরা প্রায় অধের্য হয়ে উঠেছে তখন পাখির খাঁচার পিছন থেকে একটা ছায়ার মতো মানুষ ইতস্তত পায়ে এগিয়ে এল বিদিশার কাছাকাছি।
বিদিশা, আমি এসেছি।
চমকে বাঁ দিকে মুখ ঘোরাল বিদিশা।
করুণ মুখে ফরসা রোগা চেহারার রণজয় দাঁড়িয়ে আছে। ওর মধ্যে কেমন দ্বিধা, ইতস্তত ভাব, যেন কোনও অপরিচিত তরুণীর সঙ্গে আলাপ জমাতে এসেছে।
কী বলবে বলো– বিদিশা পাথরের মতো গলায় বলল।
চারদিকে দেখল রণজয়। এই জায়গাটায় তেমন আলো-টালো নেই। কিন্তু এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দু-চারজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
রণজয় বলল, এখানে নয়, মানু…ওদিকটায় চলো। আঙুল তুলে সি. এ. পি. ক্যাম্প স্টপেজ থেকে বাঁ দিকে এ. ই. ব্লকের দিকে চলে যাওয়া নির্জন রাস্তাটা দেখাল ও।
বিদিশার ভেতরে কেমন একটা টেনশন শুরু হল। ওর চোখ রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা শেখরকে খুঁজল।
এমন সময় আচমকা ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। বিদিশা চটপট ছাতা খুলে মাথায় দিল। কিন্তু রণজয়ের সঙ্গে ছাতা ছিল না। ও নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল।
রণজয় আরও কাছে এগিয়ে এল। ওর সারা মুখ ভিজে চকচক করছে। চুল লেপটে আছে ফরসা কপালে। বৃষ্টির ফোঁটায় ওর মুখ খানিকটা ঝাপসা দেখাচ্ছে।
ওকে দেখে বিদিশার মায়া হল। ও রণজয়কে ছাতার তলায় ডাকল, বৃষ্টিতে ভিজো না। এসো।
রণজয় ওর লেডিজ ছাতার নীচে চলে এল। ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানোমাত্রই ও বিদিশার গালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল : মানু..মানু…।
বিদিশা প্রতিক্রিয়ায় গাল সরিয়ে নিল। ও রণজয়কে ছাতার নীচে আসতে বলেছে মানবিকতা বোধ থেকে, ভালোবাসার টানে নয়।
ওর অবাক লাগছিল। কী সহজে ভালোবাসা মরে যায়। এক সময় এই পুরুষটা ওর কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালে বিদিশা ভেতরে-ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা টের পেত, শরীর পিচ্ছিল হয়ে উঠত।
আর এখন! ওর প্রতিটি রোমকূপ সতর্ক হয়ে রয়েছে বিপদের আশঙ্কায়।
বৃষ্টির ফোঁটা ছাতায় আছড়ে পড়ার তুমুল শব্দ হচ্ছিল। ছাতার রডের গা দিয়ে জল পড়ছিল চুঁইয়ে চুঁইয়ে। রণজয়ের ভেজা শরীর বিদিশার পোশাক ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
রণজয় ওর হাত আঁকড়ে ধরে বলল, ওদিকটায় চলো।
বিদিশা ওর আঙুলের জোর টের পেল। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে শেখরকে শেষবারের মতো খুঁজতে চেষ্টা করল। কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটার ধোঁয়াটে পরদা সরিয়ে ও কিছুই দেখতে পেল না।
নির্জন এলাকা থেকে আরও নির্জন এলাকায় ঢুকে পড়েছিল ওরা দুজনে।
সামনেটা বেশ অন্ধকার। বাড়িগুলোও বর্ষার ঘোমটায় মুখ ঢেকেছে। দু-একটা খালি জমিতে বর্ষায় বেড়ে ওঠা গাছপালা আর আগাছার জঙ্গল। বিচিত্র আকারের অর্ধেক তৈরি একটা বাড়ি অন্ধকারে কবন্ধের মতো দাঁড়িয়ে।
মানু, তোমাকে আমি অনেক চিঠি লিখেছি..রোজ তুমি অফিসে গেলেই একটা করে আমার চিঠি পাবে…।
বিদিশা কোনও উত্তর দিল না।
বৃষ্টির তেজ হঠাৎই কমে এল। আর রণজয়ও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ।
মানু, মুখটা তুলে আমার দিকে একবার তাকাও।
রণজয়ের কথায় এমন কিছু ছিল যে, বিদিশা ভয় পেয়ে গেল। ও চোখ নামিয়ে বৃষ্টির খই-ফোঁটা ভিজে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আচমকা ছাতাটা টান মেরে ছিটকে ফেলে দিল রণজয়। বিদিশা অসহায়ভাবে ভিজতে লাগল। রণজয় তো আগেই ভিজে স্নান। সেই অবস্থায় ও হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল বিদিশার পায়ের কাছে। জাপটে ধরল বিদিশার ভিজে লেপটে যাওয়া শাড়ি, সেই সঙ্গে বিদিশাকে।
আমি তোমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, মানু। তোমাকে ফিরে না পেলে আমি মরে যাব। কথা বলতে বলতে রণজয় মুখ ঘষছিল বিদিশার ঊরুতে। টের পাচ্ছিল, বিদিশার কোমল ভিজে শরীর, ভালোবাসার থরথর করে কাঁপছে।
আসলে বিদিশা ভয়ে কাঁপছিল। আর দমবন্ধ করে মরিয়া হয়ে শেখরকে খুজছিল বারবার।
রণজয়ের জড়ানো স্বর তখনও ভেসে আসছিল বিদিশার কোমরের কাছ থেকে : তোমাকে ফিরে না পেলে আমি শেষ হয়ে যাব, মানু…।
বিদিশার গা ঘিনঘিন করছিল। শরীরটা কাঠ। ও কোনওরকমে বলল, সেটা আর কিছুতেই সম্ভব নয়…।
চাবুকের মতো এক ঘটকায় উঠে দাঁড়াল রণজয়। বাঁ হাতের থাবায় চেপে ধরল বিদিশার গলা। ওর চোখে উন্মাদের দৃষ্টি। মুখ বেঁকেচুরে বদলে গেছে। অচেনা রণজয় বেরিয়ে এসেছে নির্জন বৃষ্টিভেজা রাস্তায়।
চাপা হিংস্র গলায় রণজয় বলে উঠল, ফাকিং বিচ!
বিদিশার গলায় অসহ্য ব্যথা করছিল। মাথায়, মুখে, শরীরে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখের সামনে ও মৃত্যু দেখতে পাচ্ছিল। কী বোকার মতোই না ও রণজয়ের কথার ফাঁদে পা দিয়েছে। এই জানোয়ারটা একটুও বদলায়নি, বদলাতে পারে না।
গলার ওপরে আঙুলের চাপ বাড়ছিল। বিদিশার মুখ দিয়ে এতটুকু আওয়াজ বেরোনোর উপায় নেই। রণজয় শক্ত হাতে ওর টুটি টিপে ধরেছে।
বৃষ্টি অনেক ফিকে হয়ে এসেছিল। আকুল হয়ে সি. এ. পি. ক্যাম্প স্টপেজের পাখির খাঁচার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বিদিশা এক দীর্ঘ ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেল। ছাতা মাথায় লম্বা-লম্বা পা ফেলে সে এগিয়ে আসছে। মাঝে-মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে অন্ধকারে কিছু একটা ঠাহর করতে চাইছে।
বিদিশা বেশ বুঝতে পারছিল, চিৎকার করে কোনও লাভ নেই। আর ওর কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখ দুটো ওর ভয়ংকর স্বামীকে দেখতে বাধ্য হচ্ছিল।
