বিদিশাও হাসল–নির্ভর করতে পারার হাসি।
আর তখনই অত্যন্ত সিরিয়াস মুখে বোসদা এগিয়ে এলেন শেখরের টেবিলের কাছে। যথারীতি পানের রসে ঠোঁট লাল।
জড়ানো গলায় বোসদা বললেন, সেনভায়াকে একটা কথা জিগ্যেস করতে পারি?
শেখর হেসে বলল, এত ফরমালিটির কী আছে? বলুন—
বোসদা সামান্য ঝুঁকে পড়লেন শেখরের মুখের কাছে ও বলতে পারো সেনভায়া, সেনসেক্স মানে কী?
শেখর বোসদার অশ্লীল ইঙ্গিতটা ধরতে পেরে বলল, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। ওটা সেনসিটিভ ইনডেক্স না কী যেন–ঠিক জানি না।
তাই বলো। সেনসেক্স ওয়ার্ডটা শুনে আমি ভাবতাম শুধু বুঝি বদ্যিদেরই সেক্স আছে, আর কারও নেই. চলে যাওয়ার আগে বোসদা বিদিশার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, কিছু মনে করলে না তো, মা জননী। সেনভায়া বড় ভালো ছেলে…তবে মাঝে-মাঝে নুন দিয়ে লুচি খায়…।
বোসদা চলে যেতে বিদিশা শেখরের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, নুন দিয়ে লুচি খাওয়ার মানে?
ও কিচ্ছু নয়, বোসদার বাজে ইয়ারকি। শুনুন, আমি তা হলে আজ থেকে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।
বিদিশা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। এই মুহূর্ত থেকেই ও যেন অনেকটা ভরসা পাচ্ছে।
শেখরের কাছ থেকে উঠে চলে যাওয়ার আগে বিদিশা বলল, একটু আগে রণজয়ের একটা চিঠি পেয়েছি–অফিসের ঠিকানায়। পরে আপনাকে দেখাব। আমার মুখে অ্যাসিড বা ছুঁড়ে মারার হুমকি দিয়েছে।
শেখর শুধু বলল, ওসবে পাত্তা দেবেন না–আমি আছি।
বিদিশা নিজের টেবিলে ফিরে আসছিল, অশোক চন্দ্র ওকে ডাকল, ম্যাডাম, আপনার ফোন।
বিদিশা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ডানদিকের দেওয়ালের কাছে অশোক টেলিফোনের রিসিভার হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
বিদিশা ওর কাছে গিয়ে ফোন ধরল।
হ্যালো।
কেমন আছ, মানু? রণজয়।
রাগে জ্বলে উঠল বিদিশা : তোমাকে বলেছি না যে অফিসে এভাবে ফোন করবে না। তোমার সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই, কোনও সম্পর্ক নেই। আমি…।
ও-প্রান্তে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল রণজয়। ধরা গলায় বলল, আমার কষ্টটা তুমি কেন বুঝতে চাও না বলো, তো! আমি যে একা-একা শেষ হয়ে গেলাম।
বিদিশা বাঁকা সুরে বলল, একা কেন? তোমার মা তো রয়েছে।
রণজয় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, সেইজন্যেই তো কষ্ট আরও বেশি। দেখা হলে তোমাকে সব বলব। কাল রাতে তো সে কথাই বলতে চেয়েছিলাম, তুমি হঠাৎ অকারণে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলে। আজ তোমার সময় হবে? অফিস ছুটির পর দেখা করতে পারবে?
বিদিশার কৌতূহল হচ্ছিল। তাই ও দ্বিধায় পড়ে গেল। তরুবালার সঙ্গে কী হয়েছে রণজয়ের? ঝগড়াঝাটি? কী নিয়ে? বিদিশার চলে যাওয়া নিয়ে?
ও-প্রান্ত থেকে রণজয় অধৈর্য হয়ে উঠল, মানু, একটিবার আমার সঙ্গে দেখা করো। তুমি পাশে না থাকলে আমি কেমন করে সেরে উঠব? কেমন করে আবার ভালোবাসব তোমাকে?
বিদিশা ঠিক করল, রণজয়ের সঙ্গে দেখা করবে–তবে শেখর সঙ্গে থাকবে। শেখর সঙ্গে থাকলে ও ওই ভয়ংকর মানুষটার সঙ্গে দেখা করার জোর পাবে।
ঠিক আছে। কোথায় দেখা করবে বলো– বিদিশা ঠান্ডা গলায় বলল।
মানু, মানু, আই লাভ য়ু, লাভ– উত্তেজনায় রণজয়ের গলা কাঁপছে ও সি. এ. পি. ক্যাম্প বাস স্টপে আমি সাতটার সময় তোমার জন্যে ওয়েট করব। তুমি আসবে তো?
আসব– বিদিশা ইচ্ছে করেই শেখরের কথা বলল না। রণজয়কে ও একটা মানসিক ধাক্কা দিতে চায়।
আমি…আমি তোমাকে অনেকগুলো চিঠি লিখেছি…অফিসের ঠিকানায়…।
জানি। একটা আজ পেয়েছি।
চিঠির খারাপ কথাগুলো ধোরো না, মানু। ওগুলো রাগের মাথায় লিখেছি।
বিদিশা কোনও জবাব দিল না।
রণজয় আবার কথা বলল চাপা গলায়, মানু, চিঠি পড়ে তুমি কিছু মাইন্ড কোরো না। তোমার সঙ্গে দেখা হলে সব বুঝিয়ে বলব।
ঠিক আছে। এখন তা হলে রাখছি। সন্ধে সাতটায়, সি.এ.পি. ক্যাম্প বাস স্টপে।
টেলিফোন রেখে দিয়ে শেখরের টেবিলের কাছে গেল বিদিশা। অচেনা একজন ভিজিটর ওর টেবিলে বসে টেকনিক্যাল কথাবার্তা বলছিল। বিদিশা ইশারায় ডাকল ওকে।
শেখর উঠে কাছে আসতেই বিদিশা নীচু গলায় বলল, আজ সন্ধে সাতটায় আমার ডেঞ্জারাস এক্স-হাজব্যান্ডের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেব। সাবধান থাকবেন…।
শেখর হেসে বলল, দারুণ থ্রিলিং ব্যাপার হবে। আপনার হাজব্যান্ড এক্স হোক আর ওয়াই হোক–আই ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু আপনার কাছে যা শুনেছি, যদি হঠাৎ করে ভদ্রলোক খেপে উঠে আপনাকে অ্যাটাক করেন?
বিদিশা সিরিয়াস চোখে তাকাল শেখরের দিকে আপনি কী করতে চান?
শেখরও সিরিয়াস গলায় বলল, আপনি যা হুকুম করবেন।
বিদিশা ঠান্ডা স্বরে বলল, দেন হিট হিম–।
আই উইল লাভ টু। সাংঘাতিক থ্রিলিং ব্যাপার হবে।
.
সেই সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার এতটুকু কমেনি। মাঝে-মাঝে খাপছাড়াভাবে দু-তিনবার বৃষ্টি হয়েছে। বিদিশা আর শেখর যখন সি.এ.পি. ক্যাম্প বাস স্টপে এসে নামল তখন বৃষ্টি ছিল না। কিন্তু আকাশে কোনও চঁদ-তারা নজরে পড়ছিল না। বরং খানিকটা লালচে আভা দেখা যাচ্ছিল।
বাস থেকে নামার আগেই ওরা ঠিক করেছিল ওরা অচেনা লোকের মতো বাসের দুই দরজা দিয়ে নামবে। নেমে শেখর বিদিশার কাছ থেকে অনেকটা দূরে সরে যাবে। দূর থেকেই ও বিদিশার ওপরে লক্ষ রাখবে। রণজয়ের সঙ্গে বিদিশার ব্যক্তিগত কথাবার্তার মাঝে ও থাকতে চায় না।
শেখর পিছনের দরজা দিয়ে নেমে সোজা রাস্তা পেরিয়ে চলে গেছে উলটো দিকের বাস স্টপে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচ-সাতজন মানুষের মাঝে গা-ঢাকা দিয়েছে। ওর হাতঘড়িতে তখন সাতটা বেজে ছমিনিট।
