বোসদা, প্লিজ… কপট অস্বস্তিতে বলে উঠেছে বিদিশা : ঠোঁটে কুলুপ লাগান।
ঠোঁট থেকে পানের রস মুছে নিয়ে সুধীর বোস মজা করে বলেছিলেন, আমার তো যত রস ঠোঁটেই, মা জননী! সেখানে কী করে গোদরেজের তালা লাগাই!
দেবলীনা রিসেপশন কাউন্টারের দিকে চলে যেতে না যেতেই চায়ের কাপ হাতে বোসদা এসে হাজির। হাসি হাসি মুখ। টাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বোঝা যায়, এই মাত্র অফিসে ঢুকেছেন।
আপনাদের কাছে এগোনো যাবে? না কি কালকের মতো এজ বার আছে?
না, না। আসুন, চেয়ার টেনে নিয়ে বসুন– হাসিমুখে বোসদাকে আমন্ত্রণ জানাল বিদিশা।
বোসদা চোখ সামান্য কুঁচকে বিদিশাকে লক্ষ করেছিলেন। হঠাৎই সিরিয়াসভাবে মন্তব্য করলেন, মা জননী, তোমার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখতে পাচ্ছি। সকাল-সকাল মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল।
এমন সময় সিনিয়ার ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার সৌমেন পাল বোসদাকে এসে ডাকলেন, মিস্টার বোস, একটু আসবেন? আজই একটা আরজেন্ট ড্রয়িং পাঠানোর আছে। আপনার সঙ্গে একটু ডিসকাস করতে হবে।
পরে কথা বলব। ছোটভাই, তুমি দ্যাখো, ম্যাডামের প্রবলেম সলভ করতে পারো কি না– বলে বোসদা চায়ের কাপ হাতেই চলে গেলেন।
শেখর বলল, বলুন, ম্যাডাম, আমার থেকে আপনি কী হেল্প চান?
বিদিশা দিশেহারাভাবে বলল, সেটাই তো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
থানায় ডায়েরি করতে চান?
না, না– চকিতে মাথা নাড়ল বিদিশা, ওতে অনেক জল ঘোলা হবে, স্ক্যান্ডাল হবে।
তা হলে আপনি কী করতে চান?
বিদিশা চিন্তিত গলায় বলল, সেটাই বুঝতে পারছি না। রণজয় সবসময় আমাকে ফলো করছে। সেটা শোনার পর থেকেই আমার ভয় করছে।
এমন সময় বনজারা এসে একটা চিঠি দিয়ে গেল বিদিশাকে। শেখর দেখল, সাধারণ একটা ইনল্যান্ড লেটার।
এখন তা হলে যাই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শেখর, পরে এ-নিয়ে কথা বলব।
বিদিশা ঘাড় নেড়ে চিঠিটা দেখতে শুরু করল। শেখর রওনা হল নিজের সিটের দিকে।
চিঠিটা কে পাঠিয়েছে তা ওপরে লেখা নেই। তবে হাতের লেখাটা বেশ চেনা!
ইনল্যান্ড লেটারটা খুলে ফেলল বিদিশা। তিন পৃষ্ঠা জোড়া বিশাল চিঠি। চিঠির শেষে রণজয়ের নাম লেখা রয়েছে।
বিদিশা ওর খুব চেনা বাংলা হরফগুলোর ওপরে চোখ বোলাতে শুরু করল।
রণজয়ের লেখা প্রেমজর্জর চিঠি। অনেক ভালোবাসা, অনেক দুঃখ-কষ্টের কথা বলা আছে। চিঠিতে। নির্লিপ্তিভাবে চিঠিটা পড়ল বিদিশা। ওর রক্তে নতুন কোনও স্রোত তৈরি হল না।
চিঠির শেষ দিকে রণজয় লিখেছে?
…তোমার সন্তান এখনও আমাকে বাবা বলে ডাকতে চায়। আর আমি তোমাকে বউ বলে ডাকতে চাই, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে চাই। এখনও সময় আছে ফিরে এসো। তা না হলে ফল খুব খারাপ হবে। অ্যাকোয়া রিজিয়া-র নাম শুনেছ? না, সুলতানা রিজিয়ার কোনও আত্মীয় নন ইনি। গাঢ় নাইট্রিক অ্যাসিড আর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড মিশিয়ে তৈরি এক মারাত্মক অ্যাসিড। সোনাও গলিয়ে দিতে পারে অতি সহজে। এই অ্যাসিড ভরা বা তোমার মুখে ছুঁড়ে মারলে তোমার ওই সোনার মতো রঙের কী হাল হবে বুঝতে পারছ?
তাই তোমার পায়ে ধরে বলছি, মানু, ফিরে এসো। আমাকে খারাপ হয়ে যেতে দিয়ো না, লক্ষ্মীটি।
বিদিশার চিঠি ধরা হাত তিরতির করে কাঁপতে লাগল। চিঠিটা কোনওরকমে ড্রয়ারে রেখে দিয়ে ও টেবিলে মাথা নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। কী করবে এখন ও? কী করা যায়?
জটিল দুশ্চিন্তার মধ্যে অফিসের সময়টা ধীরে-ধীরে কাটতে লাগল। তারই মধ্যে শেখর অন্তত বারতিনেক বলেছে, ম্যাডাম, আমাকে কী করতে হবে বলবেন কিন্তু।
লাঞ্চের পর শেখরের সিটের কাছে বসে ওর সঙ্গে গল্প করছিল বিদিশা। কথা বলতে বলতে ও ভাবছিল, শেখরকে ওর বিপজ্জনক জীবনের সঙ্গে জড়ানো ঠিক হবে কি না।
শেখর ওর টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা বই বের করল। বিদিশার দিকে বইটা এগিয়ে দিয়ে বলল, এই বইটা পড়ে দেখুন। একটা সাইকোপ্যাথের কাণ্ডকারখানা। ভীষণ থ্রিলিং।
বিদিশা পেপারব্যাকটা হাতে নিয়ে দেখল। বইটার নাম ইয়র্কশায়ার রিপার। ব্যাক কভার পড়ে বুঝল, ছুরি দিয়ে একের পর এক মহিলা খুনের ঘটনা।
আবার সিরিয়াল কিলার? আপনার কি টেস্ট বলে কিছু নেই। বিদিশা বইটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল।
শেখর হেসে জবাব দিল, টিভিতে যেসব বাংলা সিরিয়াল হয় তার চেয়ে সিরিয়াল কিলার ফার বেটার। তাছাড়া, রণজয়বাবুর কেসটাও বোধহয় অনেকটা এই টাইপের। সত্যি, আপনার লাইফটা কী থ্রিলিং!
বিদিশা অবাক হয়ে শেখরকে দেখল ও আমি দিনরাত দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে গেলাম, আর আপনি বলছেন আমার লাইফটা কী থ্রিলিং! আপনি হেল্প করবেন বলছিলেন…আপনি পারবেন আমার এই থ্রিল ট্যাক্স করতে? আমি থ্রিল চাই না–আমি শান্তিতে বাঁচতে চাই।
শেখর বিদিশার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বলল, আমি ট্যাক্স করলে আপনার ওই মিস্টার হাজব্যান্ড হুউশ করে হাওয়া হয়ে যাবে। আমি ট্র্যাকে দৌড়োনো স্পোর্টসম্যান। এটা অফিস
তাইনা হলে আপনাকে এখনই বাইসেপ ট্রাইসেপ দেখিয়ে দিতাম।
আমি কিন্তু ইয়ারকি করছি না, সিরিয়াসলি বলছি।
আমিও সিরিয়াসলি বলছি। আজ আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব।
সত্যি! বিদিশা শেখরের কথা যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সত্যি! আশ্বাসের হাসি হাসল শেখর। সত্যিকারের সহকর্মীর হাসি।
