কল থেকে মগে করে জল নিয়ে মুখে ঢালল ও। তারপর একে-একে সবকটা ট্যাবলেট ঢেলে দিল মুখে। বারবার জল খেল।
ট্যাবলেটগুলো খাওয়া শেষ করে বাথরুমের ভেজা মেঝেতে বসে পড়ল বিদিশা। পেটটা ভার লাগছে। গাল জ্বালা করছে। মাথা টং হয়ে আছে।
হঠাৎই বিদিশা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল বাচ্চা মেয়ের মতো। তারই মধ্যে ও টের পাচ্ছিল, বুকের ভেতরে একটা কষ্ট হচ্ছে। আর মাথার ঝিমঝিম ভাবটা যেন বাড়ছে।
খুব আবছাভাবে বিদিশা টের পেরেছিল বাথরুমের বন্ধ দরজায় কে যেন ধাক্কা দিচ্ছে। সত্যি, না ওর মনের ভুল? এর পর আর কিছুই ওর মনে নেই।
.
দেড়দিন পর বিদিশার জ্ঞান ফিয়েছিল সুকিয়া স্ট্রিটের সিটি নার্সিং হোম-এ। চোখ খুলতেই ও মা-বাবা আর রণজয়কে দেখতে পেয়েছিল। মুহূর্তে বিদিশার চোখে জল এসে গিয়েছিল। অশরীরী ছায়াটা তার নাচ থামিয়ে কোথায় যেন চলে গেছে।
নার্সিং হোমের চিকিৎসা আর যত্নে আটদিনেই সুস্থ হয়ে উঠেছিল বিদিশা। মা-বাবাকে বলে ও চলে এসেছিল সল্ট লেকে। অরুণা-সুধাময় তখনকার মতো রণজয়কে বুঝিয়েছিলেন, মানসিক আঘাতটা সামলে উঠলেই ও মানিকতলায় চলে যাবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আয় হয়নি। বিদিশা প্রচণ্ড একরোখা জেদ ধরেছিল, সল্ট লেক ছেড়ে ও কোথাও যাবে না। অরুণার সঙ্গে এ নিয়ে বেশ মন কষাকষি হয়েছিল। কিন্তু বিদিশা সরাসরি সুধাময়কে একদিন প্রশ্ন করেছিল, বাপি, তোমার হাতে বেড়ে ওঠা রক্তকরবী গাছটাকে কেউ যদি রোজ টেনে মুচড়ে ছিঁড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তুমি কী করবে?
সুধাময় কেঁদে ফেলেছিলেন এ কথায়। তার লম্বা কাঠামো নুয়ে পড়েছিল। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, আমি সারাজীবন বহু কষ্ট করেছি, মানু। কখনও ঘুষ নিইনি, কখনও ঘুষ দিইনি। আর তোকে আমি বলব ঘুষ দিয়ে ভালোবাসা আদায় করতে! অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করা মানেই তো ঘুষ দেওয়া! তুই আমাদের চোখের সামনে থাকবি। এ বাড়িতে তোর অধিকার কিছু কম নয়।
বাবাকে টপ করে একটু চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল বিদিশার। কিন্তু কী করবে! এখন তো আর ও সেই ছোট্টটি নেই।
সেইদিন থেকে সল্ট লেকে অভয়ারণ্য খুঁজে পেয়েছিল বিদিশা।
বেশ মনে পড়ে, রণজয় দু-চারবার যাতায়াত করেছিল ওদের বাড়িতে। ওকে দেখতে এসেছিল। ওর সঙ্গে ভালো করে কথাও বলেছিল। মানিকতলায় ফিরে যাওয়ার জন্যে অনুরোধও করেছিল।
কিন্তু বিদিশা টলে যায়নি। রণজয়ের সঙ্গে ওর ভালোবাসার স্মৃতিগুলোকে নিষ্ঠুরভাবে চাপা দিয়েছিল বিপজ্জনক মারাত্মক সব স্মৃতি। করাতের দাঁতওয়ালা লম্বা ছুরিটা ও সবসময় চোখের সামনে দেখতে পেত।
এর পর রণজয় প্রায় মাসছয়েক চুপচাপ হয়ে যায়। কোনও যোগাযোগ করেনি, কোনও চিঠি দেয়নি, একটা টেলিফোনও করেনি।
তারপর হঠাত্ একদিন ও ফোন করেছে সুধাময়কে। ফোন করে লিগাল সেপারেশন চেয়েছে। একই ব্যাপারে অরুণাকেও ফোন করেছে রণজয়। কথাবার্তা ঢিমে তেতালায় হলেও এগিয়েছে। সেসব শুনে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে বিদিশা। আর অরুণা মাঝে-মাঝেই জেদী মেয়েকে বোঝাতে চেয়েছেন ধর্মের কথা।
বিদিশা ধর্মের কথা শোনেনি। শোনার মতো মনের অবস্থা ওর ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ও সামলে নিতে পেরেছিল। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে শর্টহ্যান্ড আর টাইপ শিখতে শুরু করেছিল। কয়েক বছর আগে বিভিন্ন পরীক্ষার ফাঁকে-ফাঁকে শর্টহ্যান্ড-টাইপ নিয়ে ও বেশ কিছুটা এগিয়েছিল। এখন তীব্র প্রয়োজনে সেই পুরোনো চর্চাটাকে মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরল।
সুধাময়ের যোগাযোগ আর চেষ্টায় ইন নামের এই ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালট্যান্সি ফার্মে স্টেনোগ্রাফার কাম-টাইপিস্টের চাকরি পেয়েছে বিদিশা। আর একইসঙ্গে ওর জীবনের ছবিটা একটু একটু করে বদলে গেছে। মুখ ফিরিয়ে নেওয়া জীবন আবার স্মিত হেসে তাকিয়েছে ওর দিকে।
এখন, ওর সেই নতুন বাঁচার জায়গায় বসে, শেখরকে নিজের কথা বলছিল বিদিশা।
রণজয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্কের সব কথা অরুণা কিংবা সুধাময়কে খুলে বলেনি বিদিশা। তাই শেখরকেও বলল অনেক রেখে-ঢেকে রণজয়ের অস্বাভাবিক মনের কথা বলল, বলল ওর বাঁ-গালের কাটা দাগের ইতিহাস, আর আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার কথা।
সব কথা বলতে বলতে বিদিশার চোখে জল এসে গিয়েছিল। সেটা লক্ষ করে শেখর বলল, ম্যাডাম, এখন চোখের জল ফেলার সময় নয়–চোখের জল মুছে নেওয়ার সময়।
বিদিশা চোখ মুখে নিল রুমালে। তারপর গতকাল রাতের ঘটনা বলল।
রণজয় আমাকে ছাড়বে না, শেখর। যেভাবেই হোক, ওর মাথায় এখন ঢুকেছে আমাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা। ও যখন-তখন যা খুশি করে ফেলতে পারে।
অফিসে লোকজন আসতে শুরু করেছে। ম্যানেজার পি. এল. চক্রবর্তী একবার এসে বিদিশাকে গুড মর্নিং বলে গেছেন। চায়ের ট্রলি এসে গেছে ফ্লোরে।
দেবলীনা হঠাৎ এসে দাঁড়াল বিদিশার টেবিলের কাছে। বলল, কাল দারুণ দুটো চুড়িদার কিনেছি। ভীষণ ব্রাইট রং। লাঞ্চের সময় এসো, দেখাব।
দেবলীনার ছিপছিপে ফরসা চেহারা। চোখে বড় ফ্রেমের চশমা। ছাই রঙের ওপরে সাদা কালোয় কাজ করা একটা চুড়িদারে ওকে বেশ মানিয়েছে। বিদিশাকে ও প্রায়ই শাড়ি ছেড়ে চুড়িদার পরতে বলে। তা হলে নাকি বিদিশাকে আরও সুন্দর দেখাবে।
এই প্রস্তাবের কথা জানতে পেরে বোসদা পান চিবোতে-চিবোতে বলেছিলেন, না, মা জননী, তুমি চুড়িদার পোরো না। তাহলে আমার আর চরিত্র বলে কিছু থাকবে না। এমনিতেই শাড়ি পরে তোমাকে যা ফ্যান্টা লাগে! আমি তো সবাইকে স্পষ্ট করেই বলি? আমি তোমাকে দেখতেই রোজ অফিসে আসি। হাসলেন বোসদা? তা হলেই বোঝে। এর ওপর তুমি যদি চুড়িদার ধরো তাহলে আমাদের মতো বুড়োগুলো কী ধরবে।
