বিদিশার হাত থেকে খসে পড়ে গেছে গোপন মেডিকেল ফাইল। একটা আধো-আধো চিৎকার বোধহয় বেরিয়ে এসে থাকবে ওর ঠোঁট চিরে। এখন ওর চোখ দুটো বড়-বড় হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
রণজয় দরজা বন্ধ করার প্রয়োজন মনে করেনি।
বিদিশার মাথা তখনও কাজ করছিল। ও বুঝল, তরুবালার কাছে অচেনা রণজয় অচেনা নয়।
আমার ভুল হয়ে গেছে। আর কোনওদিনও তোমার…।
ডান হাতের এক ঘুসি এসে পড়ল বিদিশার মুখের ওপরে।
ঠোঁট কেটে গিয়ে জিভে নোনতা স্বাদ পেল ও। রণজয়ের বাঁ হাত তখনও ওর চুলের মুঠি ধরে রেখেছে। আর অদ্ভুত এক জান্তব শক্তিতে বিদিশাকে কাবু করে রেখেছে।
রণজয়ের পাগল চোখ অবশেষে খুঁজে পেল দরকারি জিনিসটা। বিদিশা লক্ষ করল, রণজয় অবশেষে তাকিয়েছে রান্নাঘরের দরজার দিকে।
চোখের পলকে এক নৃশংস হঁচকা টানে বিদিশাকে মেঝেতে পেড়ে ফেলল রণজয়। তারপর পাগলের মতো ছুটে গেল রান্নাঘরে। দু-এক সেকেন্ড পরেই ও যখন ফিরে এল, তখন ওর হাতে ধরা রয়েছে দশ ইঞ্চি লম্বা ফলার একটা চকচকে কিচেন নাইফ। তার ধারালো দিকটা করাতের মতো দাঁত কাটা।
ঝুঁকে পড়ে আবার বিদিশার চুলের মুঠি চেপে ধরল রণজয়। এক হ্যাঁচকা টানে ওকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে ছুরি চেপে ধরল ওর বাঁ গালে কানের খুব কাছে।
ফাকিং বিচ! দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল বিদিশার উন্মাদ স্বামী। তারপরই অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করে দিল।
ওই নোংরা কথাগুলো বলতে-বলতে ছুরিতে টান মারল ওর ডান হাত।
বিদিশা এবার চিৎকার করে উঠতে পারল।
চিৎকারটা যখন মাঝপথে তখনই ওর টুটি চেপে ধরল রণজয়ের জঙ্গি ডান হাত।
বিদিশার দম আটকে গেল। চোখ বড়-বড় করে ও নিপ্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রণজয়ের বিকৃত মুখের দিকে। ওর চোখে পড়ল করাতের দাঁতওয়ালা ছুরির ফলাটা। চকচকে ফলায় সামান্য রক্ত লেগে আছে।
বিদিশা এইবার ছটফট করতে শুরু করল। কে-ই বা সহজে মরতে চায়। রণজয়ের মুখ ওর মুখের ওপরে অনেকটা নেমে এসেছে। লম্বা-লম্বা চুল ঝরে পড়েছে রণজয়ের কপালে চোখে। ওর দাঁত বেরিয়ে আছে হিংস্রভাবে। ঠোঁটে লালা। চেনা রণজয়ের মুখোশটা একেবারে সরে গেছে। সাইকিয়াট্রিস্ট-এর মন্তব্য মনে পড়ল বিদিশার : মনস্ট্রাস প্যাথোলজিক্যাল ইনটেনসিফিকেশন অফ অ্যাবারেটেড সেনসুয়ালিটি। এবং ওই মন্তব্যের অর্থ বোধহয় এই মুহূর্তে পুরোপুরি বুঝতে পারল ও।
আচমকা ওকে ছেড়ে দিল রণজয়। ছুরিটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে হাঁপাতে লাগল। তারপর মেডিকেল ফাইলটা তুলে নিল বিছানার কাছ থেকে। ওটা নিজের ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে রেখে একটা চেয়ারে গা এলিয়ে দিল ও। চোখ বুজে নিজের কপালে মাথায় হাত বোলাতে লাগল।
বিদিশা কাশতে কাশতে উঠে বসছে বিছানার। গলায় ভীষণ ব্যথা। বাঁ-গালে অসম্ভব জ্বালা করছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে গলায়, কাঁধে, বুকে। তীব্র কান্না উঠে আসতে চাইছিল গলা দিয়ে, কিন্তু বিদিশা কাঁদতে পারছিল না। ওর চোখের সামনে একটা অশরীরী ছায়া উল্লাসে তাণ্ডব নৃত্য করছিল, ওর দিকে তাকিয়ে হাসছিল, ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল বারবার।
কিছুক্ষণ পর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল রণজয়। বিদিশার কাছে এসে পিঠে হাত রাখল। ক্লান্ত স্বরে বলল, মানু, আমি এক্সট্রিমলি সরি। ব্যাপারটা ভুলে যাও– একটু চুপ করে থেকে তারপর ও আমাকে এক গ্লাস লেবুর শরবত করে খাওয়াও তো।
বিদিশার অবাক হওয়ার ক্ষমতা বোধহয় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই ও অবাক হল না। স্বামীর হুকুম তামিল করতে চলল। তারই ফাঁকে ও আঁচল চেপে ধরেছিল বাঁ-গালে, কিন্তু রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি। তখন রান্নাঘরে গিয়ে একমুঠো চিনি চেপে ধরেছে ক্ষতস্থানে। মাথা ঝিমঝিম করলেও বিদিশা কাঠের তাক ধরে নিজেকে সামলে রেখেছিল–টলে পড়ে যায়নি।
তারপর দুটো ঘণ্টা যে কী ভয়ংকর জ্বালা-যন্ত্রণায় কেটেছে তা বিদিশা আজও ভুলতে পারেনি। বিছানায় শুয়ে রাতের আঁধারে ও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তখনই কোনও একটা দুর্বল মুহূর্তে ও ঠিক করেছিল, আর নয়। এই বন্দি জীবন আর নয়। সব জ্বালা-যন্ত্রণায় দাঁড়ি টানতে হবে।
অন্ধকারে বিছানা থেকে নেমে এসেছিল বিদিশা। আন্দাজে ভর করে টলতে টলতে চলে গিয়েছিল ওষুধের তাকের কাছে। হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজে পেয়েছিল নির্দিষ্ট ওষুধের পাতাগুলো। টেনটেক্স ফোর্ট। চ্যাপটা গোল রুপোলি রঙের ট্যাবলেট। রোজ রাতে রণজয় একটা করে এই ট্যাবলেট খায়। এই ট্যাবলেট খেলে যৌন উত্তেজনা বাড়ে। রণজয়ের এই ট্যাবলেট কেন দরকার হয় তা বিদিশা জানে না। কিন্তু বিয়ের পরে রণজয়ই ওকে খুলে বলেছিল এই রুপোলি ট্যাবলেটের রহস্য। দশটা ট্যাবলেটের একটা পাতার দাম তেরো টাকা মতো।
যে কটা ট্যাবলেট পেল সবকটা নিয়ে বাথরুমে চলে গেল বিদিশা। আলো জ্বেলে দরজা বন্ধ করে মুঠোয় ধরা ট্যাবলেটগুলো অনেকক্ষণ ধরে দেখেছিল ও। পাতা ছিঁড়ে ট্যাবলেটগুলো যখন ও হাতের চেটোয় ঢালল তখন মনে হচ্ছিল ও বিশ-পঁচিশটা ক্যাডবেরি জেম্স খাচ্ছে। শুধু এগুলোর রং লাল-নীল নয়, রুপোলি।
বাথরুমের আয়নার দিকে তাকিয়ে ভেউভেউ করে কেঁদেছিল বিদিশা। মা, বাবা, বাপ্পার কথা মনে পড়ছিল। ওদের আর দেখতে পাবে না বিদিশা। কিন্তু একটু পরেই যে-ঘটনা ঘটবে তার জন্য নিজেকে ছাড়া আর কাকে দায়ী করবে ও। রণজয়ের সঙ্গে এই জীবন ও নিজেই বেছে নিয়েছিল। আজ এই মৃত্যু ও নিজেই বেছে নিচ্ছে।
