সেই ভয়ংকর রাতটার কথা মাকে বলেনি বিদিশা। কিন্তু মা যখন গালের কাটা দাগটা দেখিয়ে জিগ্যেস করেছিল, এ কী! কী করে কাটল?
বিদিশা কান্না চেপে বলেছিল, রণজয়…।
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অরুণা আর কোনও কথা জিগ্যেস করতে পারেননি।
ওর জীবনে চরম ঘটনাটা ঘটেছিল নভেম্বরের শেষ দিকে। শীত তখন চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে।
রণজয় ফোন করেছিল, ওর হেড অফিসে প্রোডাকশন মিটিং না কী যেন আছে। তাই ফিরতে রাত হবে। বিদিশা ছোট্ট করে হুঁ বলেছিল।
তারপর যথারীতি সংসারের কাজ নিয়ে ডুবে গিয়েছিল। সন্ধের মুখে একবার মাকে ফোন করেছিল। বুঝতে পেরেছিল, তরুবালা আড়ি পেতেছিল। তবুও সাধারণ কয়েকটা কথাবার্তা বলেছিল মায়ের সঙ্গে।
রান্নাবান্না ইত্যাদির কাজ সেরে টিভি দেখতে বসেছিল বিদিশা। শুনতে পাচ্ছিল, নীচে তরুবালা টেপ রেকর্ডারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট শুনছেন। রণজয়ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালোবাসে।
তরুবালা এমব্রয়ডারি কাজ খুব ভালো পারেন। তার হাতের কয়েকটা কাজ বাঁধানো রয়েছে একতলা-দোতলার ঘরের দেওয়ালে। রণজয়ও অল্পস্বল্প এমব্রয়ডারির কাজ জানে। মায়ের হাতের কাজে প্রশংসায় ও সবসময় পঞ্চমুখ।
বিদিশা বুঝেছে, রণজয়ের ভেতরের অনেকটাই দখল করে রয়েছেন তরুবালা।
প্রথম-প্রথম বিদিশা নিজের মতামত স্পষ্ট করে জানাত। দরকার হলে তর্কও জুড়ে দিতে স্বামীর সঙ্গে। কিন্তু ওকে থাপ্পর মারার সেই অস্বাভাবিক ঘটনার পর ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। স্বামীর সঙ্গে একমত হওয়ার জন্য সবসময় প্রাণপণ চেষ্টা করত।
টিভি প্রোগ্রামটা ভীষণ একঘেয়ে লাগছিল বিদিশার। তাই টিভি অফ করে ও চলে এসেছিল দোতলার ছোট্ট ঝুলবারান্দায়। নীচের গলিতে সন্ধেবেলার ব্যস্ততা। গলির মোড়ে তেলেভাজার দোকানে ভিড়। বড় রাস্তা দিয়ে হুসহুস করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে।
একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল বিদিশা। ও ঘরে ফিরে এল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে হঠাৎই সাজতে শুরু করল।
তখনই ও লক্ষ করল, ড্রেসিং টেবিলে ধুলোর আস্তরণ।
সাজগোজ সংক্ষেপ করে ড্রেসিং টেবিলের ধুলো ঝাড়তে লেগে গেল বিদিশা। তারপরই ঘরটার অগোছালো অবস্থা চোখে পড়ল ওর। কোণের টেবিলে কয়েকটা ম্যাগাজিন ছড়ানো তার পাশে রণজয়ের এলোমেলো বইপত্র আর ফাইল। বিছানার চাদর অনেকদিন পালটানো হয়নি। পিলো কভারগুলোও বদলানো দরকার। আলনার জামাকাপড়গুলোও কীরকম বিচ্ছিরিভাবে অগোছালো হয়ে রয়েছে।
সুতরাং বিদিশা কাজে নেমে পড়ল।
সব কাজ শেষ করে ও যখন রণজয়ের ফাইলপত্রগুলো সাজিয়ে নিয়ে দেওয়ালের তাকে রাখতে যাচ্ছে তখনই ছোট মাপের মেডিকেল ফাইলটা নজরে পড়ল ওর।
বিদিশা প্রথম ভেবেছিল, ওটা বোধহয় রণজয়ের বাবার মেডিকেল ফাইল। এ-ফাইল এখানে কেন? তিনি মারা গেছেন প্রায় চার বছর। গ্যাসট্রিক, ডায়াবিটিস ইত্যাদি নানান রোগে ভুগতেন ভদ্রলোক। তরুবালার ঘরের দেওয়ালে তার ফটো আছে।
কিন্তু ফাইলের মলাট ওলটাতেই অবাক হয়ে গেল বিদিশা। প্রথম পৃষ্ঠাতেই পাওয়া গেল রোগীর নামঃ রণজয় সরকার।
কী অসুখ হয়েছে রণজয়ের?
ফাইলটা নিয়ে বিছানায় বসে পড়ল বিদিশা। মেডিক্যাল রিপোর্ট আর প্রেসক্রিপশনের মতো একের পর এক ওলটাতে লাগল। বেশিরভাগটাই বুঝতে পারল না। কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার জেনে ওর বেশ খটকা লাগল।
রণজয়ের মাথার খুলি সুষম নয়। লম্বালম্বি দুভাগ করলে বাঁ-দিকের অংশটা বেশ বড়। ওর মধ্যে আবেগের জটিলতা রয়েছে। ডাক্তারি ভাষায় লেখা যেসব টুকরো-টুকরো শব্দ বিদিশার নজর কাড়ল সেগুলো হল? মনস্ট্রাস প্যাথোলজিক্যাল ইনটেনসিফিকেশন অফ অ্যাবারেটেড সেনসুয়ালিটি, সাইকোপ্যাথিক স্টেট একসি, সাইকোনিউরোটিক টেন্ডেনসিস, অ্যালার্মিং ডিজঅর্ডার ইন দ্য ফ্রন্ট্রাল লোব অফ দ্য ব্রেইন।
এ কোন অসুখে ভুগছে রণজয়!
বিদিশা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। রণজয়ের মাথার ঠিক নেই, মনেরও ঠিক নেই!
এতদিন যেসব অদ্ভুত আচরণ বিদিশা লক্ষ করেছে, তার আসল কারণ তা হলে এই! এই কারণেই চেনা রণজয়ের ভেতর থেকে হঠাৎ-হঠাৎ অসুস্থ মনের অচেনা রণজয় বেরিয়ে আসে।
ভাবতে-ভাবতে সময় বয়ে যাচ্ছিল। কোনওদিকেই খেয়াল ছিল না বিদিশার। ও রণজয়ের সঙ্গে প্রথম আলাপের দিন থেকে আজ পর্যন্ত সাতটা বছরের কথা ভাবছিল। ওদের গল্পটা কীভাবে শুরু হয়েছিল, আর এখন কীরকম অস্বাভাবিক বাঁক নিয়ে জটিল পথে এগিয়ে চলেছে।
নীচের সদরে কলিংবেলের শব্দ নিশ্চয়ই হয়ে থাকবে। বিদিশা সে শব্দ শুনতে পায়নি। তরুবালা নিশ্চয়ই দরজা খুলে দিয়েছেন। তাই চেনা পায়ের শব্দ উঠে এসেছে ওপরে। কিন্তু অন্যমনস্ক বিদিশা সেই শব্দটাও শুনতে পায়নি।
ব্যাপারটা ও টের পেল যখন রণজয় একেবারে ঘরে এসে ঢুকল।
এ কী! আমার কাগজপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছ কেন? বিরক্ত রণজয়ের ভুরু কুঁচকে গেছে। বেশ কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে মুখে। টিউব লাইটের আলোয় মুখটা কেমন ফ্যাকাসে রক্তহীন দেখাচ্ছে।
হাতের ব্রিফকেস নামিয়ে রাখল মেঝেতে। দুটো লম্বা পা ফেলে চলে এল বিদিশার কাছে। বাঁ-হাতে নিষ্ঠুরভাবে চেপে ধরল ওর চুলের গোছা। এক হ্যাঁচকায় ওকে চিতপাত করে দিল বিছানায়।
ততক্ষণে অচেনা রণজয় বেরিয়ে এসেছে চেনা রণজয়ের মুখোশের আড়াল থেকে। ওর দু-চোখ পাগলের চোখ হয়ে গেছে। সেই চোখজোড়া এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে মরিয়া হয়ে কী যেন খুঁজছে।
