বাথরুমের দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছিল। বিদিশা চমকে উঠে প্রায় ভয়ের গলায় বলে উঠল, কে?
তোর জন্যে চা করেছি–জুড়িয়ে যাচ্ছে। মায়ের গলা।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল বিদিশা। রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের কাছ থেকে চায়ের কাপ নিল। তারপর ডাইনিং হলের টেলিফোনটার কাছে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে শেখর সেনের নম্বর ডায়াল করল ও।
বিদিশাদের বাড়িতেও ফোনের প্যারালাল লাইন। একটা ডাইনিং হলে, আর একটা মা-বাবার শোয়ার ঘরে। কিন্তু টেলিফোনে আড়িপাতার অভ্যেস নিয়ে ওরা মানুষ হয়নি।
হ্যালো, শেখর সেন আছেন? ও-প্রান্তের মহিলা কণ্ঠের হ্যালো শোনামাত্রই প্রশ্নটা করল বিদিশা। গলা শুনে ওর মনে হল বোধহয় শেখরের বউদি ফোন ধরেছেন।
ধরুন। দিচ্ছি।
একটু পরেই চেনা গলার হ্যালো শুনতে পেল বিদিশা।
আমি বিদিশা বলছি।
আরে বলুন, আপনার জন্য কী শিভারি দেখাতে পারি। হাসিখুশি গলায় বলল শেখর।
না, না, বড়সড় কোনও শিভারি দেখাতে হবে না। শুধু কাল অফিসে আধঘণ্টা আগে আসতে হবে–পারবেন?
না পারার কী আছে! কিন্তু কেসটা কী বলুন, তো, ম্যাডাম?
কাল বলব। মন-টন বেশ শক্ত করে আসবেন। নিজের অজান্তেই হাসি-ঠাট্টার মেজাজটা ফিরে পাচ্ছিল বিদিশা। মারুতি গাড়ির ঘটনাটা যেন মুছে গেছে ওর মন থেকে।
কেন, মন শক্ত করব কেন? আমার আপনার ক্লোজ ইয়ের মাঝখানে কোনও উটকো থার্ড পার্টি এসে গেছে নাকি? হেসে জিগ্যেস করল শেখর।
বিদিশাও পালটা ঠাট্টা করে জবাব দিল, সে তো বরাবরই আছে। আমাদের বোসদা। তা ছাড়া ফোর্থ পার্টিকেও তো আপনি চেনেন–মহান মহামান্য প্রশান্তলাল চক্রবর্তী।
ও-প্রান্তে জোর গলায় হেসে উঠল শেখর ও এতগুলো পার্টিকে আমি কেমন করে ঠেকাই বলুন তো, ম্যাডাম?
না, শেখর, সিরিয়াসলি বলছি। কাল আপনাকে অনেকগুলো জরুরি কথা বলব। একটু ইতস্তত করে বিদিশা আরও বলল, কিন্তু ভয় হচ্ছে, আপনি আমার জন্যে না বিপদে জড়িয়ে পড়েন…।
বিদিশার কথা শেষ হওয়ার আগেই কথা বলে উঠল, শেখর, বিপদ! মানে থ্রিল? আপনি তো জানেন, থ্রিলিং ব্যাপার আমার দারুণ লাগে। ঠিক ট্র্যাকে দৌড়োনোর মতো। কিন্তু এমনই কপাল, লাইফটা কেমন একঘেয়ে হয়ে গেছে। যাক, তবু আপনি একটু খ্রিলের ব্যবস্থা করেছেন। আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
কাল তা হলে আধঘণ্টা আগে আসছেন তো?
অতি অবশ্যই।
টেলিফোন সেরে নিয়ে চা শেষ করল বিদিশা। তারপর ক্লান্তভাবে শোয়ার ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। যদি ঘুম এসে যায় আসুক। মা ডেকে খাইয়ে দেবেন।
চোখে ঘুম নেমে আসার সময় বিদিশা রণজয়ের মারুতি গাড়িটা দেখতে পেল। তীব্র হ্যালোজেন হেডলাইট জ্বেলে খ্যাপা চিতাবাঘের মতো ভয়ংকর গতিতে ওকে লক্ষ করে ছুটে আসছে।
.
মঙ্গলবার গভীর রাতের দিকে মেঘের ডাকে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল বিদিশার। তারপর আর ভালো করে ঘুম আসেনি। তখন থেকেই অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই বৃষ্টি থেমেছে ভোর ছটায়। শ্রাবণে-শ্রাবণে ভেজা ভিজে কাকের ডাকে বিদিশা বুঝতে পেরেছে গাঢ় মেঘের আড়ালে ভোর হয়েছে।
বিছানা ছেড়ে ওঠা থেকে অফিসে বেরোনোর আগে পর্যন্ত তটস্থ হয়ে থেকেছে বিদিশা। এই বুঝি টেলিফোনটা বেজে উঠল। কাল রাতের ভয়ানক পাগলটা এই বুঝি শুরু করল নতুন পাগলামি!
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও ফোন আসেনি।
অফিসে যাওয়ার সময় দিব্যি সহজভাবে অকুস্থলটা পেরিয়ে গেল বিদিশা। গতকাল রাতের ঘটনাটা মনে হচ্ছিল যেন নিছকই কোনও স্বপ্ন। শুধু কাঠগোলাপ গাছটা থেকে খানিকটা দূরে ইটের পাঁজার সামনে ভাঙা কাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে রয়েছে। সেই চকচকে কাচের টুকরোগুলো বিদিশার স্বপ্নকে সত্যি করে দিচ্ছিল।
ঠিক আটাশ মিনিট আগে অফিসে ঢুকল বিদিশা। দেখল, শেখর নিজের চেয়ার-টেবিলে হাজির।
ওকে দেখে হাসল শেখর। বিদিশাও হাসতে পারল। সত্যি, অফিসটা ওকে বাঁচিয়ে রাখার কোরামিন জোগায়।
বনজারা সাদা ইউনিফর্ম পরে অফিস ফ্লোরে পায়চারি করছিল। বিদিশাকে দেখে সুপ্রভাত জানাল। ওর ডিউটি অফিস-টাইমের একঘণ্টা আগে থেকে। ও অফিস ঝাড়পোঁছের তদারকি করে। দরজা-জানলা ঠিকঠাকমতো খুলে দেয়। ফাইলপত্র আলমারি থেকে বের করে টেবিলে-টেবিলে সাজিয়ে দেয়।
শেখরকে ডেকে নিয়ে নিজের সিটের কাছে চলে গেল বিদিশা। সেখানে গুছিয়ে বসল দুজনে। সামনের টেবিলে টাইপ মেশিন, পাশে শর্টহ্যান্ডের খাতা আর পেনসিল।
বড় কাচের জানলা দিয়ে মেঘলা আলো এসে পড়েছে বিদিশার মুখে। ওকে বড় বিষণ্ণ অথচ সুন্দর লাগছিল।
শেখর, আপনারা কেউই জানেন না…আমার বিয়ে হয়ে গেছে। বিদিশা এমনভাবে কথাটা বলল, যেন খবরের কাগজের খবর পড়ে শোনাচ্ছে।
শেখর বিদিশার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর কথাটা শোনার পর ভোলা জানলার দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ ধরে মেঘলা আকাশ দেখল। তারপর মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে টেবিলের ল্যামিনেটেড প্লাস্টিকের ডিজাইন দেখল কিছুক্ষণ। এক সময় মুখ তুলে তাকাল বিদিশার দিকেঃ তারপর? বলুন– আমি শুনছি।
বিদিশা বলতে শুরু করলসংক্ষেপে যেটুকু বলা যায় শেখরকে।
রণজয়কে ছেড়ে আসার পর তিনটে মাস এক অদ্ভূত যন্ত্রণার মধ্যে কেটেছিল বিদিশার। ওর মনের ভেতরে চেনা আর অচেনা রণজয়কে নিয়ে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চলছিল। হাজারবার জিগ্যেস করা সত্ত্বেও মাকে ও সব কথা খুলে বলতে পারেনি। শুধু বলেছিল, ওর সঙ্গে আর থাকা যায় না, মা, কিছুতেই থাকা যায় না।
