সেই ভয়ংকর রাতের পর থেকে রণজয়ের অস্বাভাবিক এলোমেলো আচরণ আরও বেশি করে নজরে পড়েছিল। ও খুব সাবধানে কথা বলত রণজয়ের সঙ্গে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও রেহাই পায়নি। রণজয়ের মা ওকে রেহাই পেতে দেননি।
বিয়ের পর সেই মেঘ-বৃষ্টির রাতে প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল বিদিশা। সারাটা রাত ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছিল। কিন্তু নিজের অদৃষ্ট ছাড়া আর কাকে ও দায়ী করবে? ও-ই তো ভালোবেসে বিয়ে করেছিল রণজয়কে।
পরদিন রণজয় অফিসে বেরিয়ে গেলে ও দুপুরের দিকে মাকে ফোন করেছিল।
মা, মানু বলছি।
হাঁ, বল, কী খবর? অরুণা সহজ গলায় কথা বলেছেন।
আমি খুব..খুব..ঝামেলায়… চোখে জল এসে গেছে বিদিশার। গলা ধরে গিয়ে কথা আটকে গেছে মাঝপথে।
কী হয়েছে, মানু? উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন অরুণা ও কাঁদছিস কেন? রণজয় কিছু বলেছে?
ন-না। একটু চুপ করে থেকে বিদিশা বলেছে, আমি তোমাদের কাছে গিয়ে কদিন থাকব, মা–
মন খারাপ লাগলে তুই আজই চলে আয়। তুই এলে বাপ্পাও খুশি হবে, আমাদেরও ভালো লাগবে।
বিদিশা ফোন ছেড়ে দিয়ে মনে-মনে ঠিক করেছিল। সেদিনই চলে যাবে সল্ট লেকের বাড়িতে।
রণজয় অফিস থেকে সাড়ে ছটা নাগাদ ফিরে এল। হাত-মুখ ধুয়ে ওর কাছে এসে দু গাল চেপে ধরল দু-হাতে। কয়েকটা আদরের চুমু খেয়ে বলল, চলো, তোমাকে সল্ট লেকে পৌঁছে দিয়ে আসি। তবে চারদিনের বেশি থেকো না। আমি এখানে বের হয়ে যাব।
বিদিশা হতবাক হয়ে গেল। রণজয় কি মন পড়ে নিতে জানে? ও কী করে জানল যে, বিদিশা সল্ট লেকে যাবে বলে মন ঠিক করেছে! কিন্তু গতকাল রাতের কথা ভেবে কোনও প্রশ্ন করল না বিদিশা। কিন্তু মনের ভেতরে একটা কাঁটা খচখচ করতে লাগল।
বেশ মনে পড়ে, ওকে ভালোবেসে অত্যন্ত যত্ন করে সল্ট লেকে পৌঁছে দিয়েছিল রণজয়।
বাপ্পার জন্য একটা ক্যাডবেরি চকোলেট কিনে নিয়ে গিয়েছিল। হেসে-হেসে কথা বলেছিল মা-বাবার সঙ্গে।
বিদিশা অবাক হয়ে দেখেছিল চেনা রণজয়কে। তাই শেষ পর্যন্ত মাকে কোনও কথা বলতে পারেনি ও। ভেবেছে, গতকাল রাতের ব্যাপারটা একটা দুর্ঘটনা।
সল্ট লেকের রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে রণজয় ফিরে গিয়েছিল নিজের বাড়িতে।
তারপর বেশ কয়েকটা দিন স্বাভাবিকভাবে কেটে গেছে। অচেনা মানুষটা মাথা চাড়া দেয়নি চেনা রণজয়ের ভেতর থেকে। কিন্তু একটা ব্যাপার অবাক হয়ে লক্ষ করত বিদিশা। সারাদিন অফিসে কাটালেও রণজয় ওর অনেক কথা টের পেয়ে যেত।
অনেকদিন ধরেই একটা সন্দেহের কাটা বিঁধছিল বিদিশার মনে। সন্দেহটা ঠিক কি না সেটা যাচাই করতে একদিন ও মাকে ফোন করল। তারপর কথায় কথায় বাপ্পার লেখাপড়ার কথা জিগ্যেস করল। বিদিশা জানে বাপ্পার পড়াশোনার কথা জিগ্যেস করলে মা সাতকাহন জবাব দেয়। তাই মাকে প্রশ্নটা করেই ও রিসিভারটা নামিয়ে রেখেছে টেবিলে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে পা টিপে টিপে নেমে এসেছে একতলায়।
রণজয়ের মায়ের ঘরে সন্তর্পণে উঁকি মেরে বিদিশা দেখল, ও যা ভেবেছে তাই।
এ বাড়িতে টেলিফোনের প্যারালাল লাইন আছে। একটা দোতলায় বিদিশাদের শোয়ার ঘরে, আর একটা রণজয়ের মা তরুবালার ঘরে।
সেই বিধবা ভদ্রমহিলা এখন টেলিফোনের রিসিভার কানে চেপে ধরে একমনে আড়ি পেতেছেন। প্রয়োজন মনে করলে তিনি পরে ফোন করবেন ছেলের অফিসে, গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো ঢেলে দেবেন ওর কানে।
প্যারালাল লাইনে খুব সহজেই আড়ি পাতা যায়। একটা টেলিফোনে কেউ ফোন করলে অন্য টেলিফোনটায় টিকটিক শব্দ হয়।
বিদিশার সামান্য নড়াচাড়া তরুবালা বোধহয় টের পেয়েছিলেন। কারণ চকিতে চোখ ফেরালেন দরজার দিকে। রিসিভার তখনও কানে ধরা।
না, বিদিশাকে দেখে রণজয়ের মা বিশেষ বিচলিত হননি। সবসময় হুকুম করতে অভ্যস্ত এই মহিলা সহজে হার মানেন না। বিয়ের পরেও রণজয়কে ছোট ছেলের মতো নির্দেশ দিয়ে থাকেন। বিদিশার সামনেও এই ধরনের হুকুম করতে তার বাধে না।
রণজয় এমনিতে যতই দাপট দেখাক না কেন, মা তরুবালার কাছে সে বাধ্য শিশু। তরুবালার শরীরে শক্ত বাঁধুনি, মনেও তাই। চোখের দৃষ্টি তীব্র–যেন গভীরতা মাপার যন্ত্র। যে সব শাড়ি জামাকাপড় পরেন তাতে সাদার ভাগ কম। তবে সিঁথি শূন্য।
কিছু বলবে, বিদিশা? অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় জিগ্যেস করলেন তরুবালা। প্যারালাল টেলিফোন লাইনে অকারণে রিসিভার কেন চেপে ধরে আছেন তার কৈফিয়ত ছেলের বউকে দেওয়ার কোনও চিহ্ন নেই।
বিদিশা হেরে গেল। কী বলবে ভেবে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত না, কিছু না বলে ফিরে এসেছিল দরজা থেকে। চলে আসার আগে তরুবালার কৌতুকের স্মিত হাসি নজরে পড়েছিল ওর।
দোতলায় এসে বিদিশা যখন আবার ফোনে কথা বলল তখন অরুণা মেয়েকে নানান প্রশ্ন আর বকাবকি শুরু করলেন। মেয়ে কোনও জবাব দিল না। ওর ক্রমশ নিজেকে বন্দি বলে মনে হচ্ছিল। টেলিফোন রেখে দিয়ে বিছানায় খোলা জানলার কাছে উপুড় হয়ে শুয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করেছিল ও। তখন পাশের বাড়ির প্লাস্টার চটে যাওয়া ফাটল-ধরা দেওয়াল থেকে বেরিয়ে আসা কচি অশ্বত্থ গাছ ওকে দেখছিল। দুপুরের নির্জন পরিবেশ ট্রামের চাকার ঘরঘর শব্দ শুনতে পাচ্ছিল বিদিশা। লোহার-লোহার ঘর্ষণ। সেই আঘাতের যন্ত্রণা ও টের পাচ্ছিল। ট্রামটা যেন ওর বুকের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল।
