লোকটা শেষ দিকে কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে বিদিশার আরও কাছে এগিয়ে এল। যখনই সে বিদিশার ওপরে ঝুঁকে পড়তে গেল, তখনই যেন গলার স্বর খুঁজে পেল ও।
কান ফাটানো এক মর্মান্তিক আর্তনাদ করে উঠল বিদিশা। হাঁড়িকাঠে মাথা দেওয়া কোণঠাসা পশু যেভাবে চিৎকার করে, অনেকটা সেইরকম। বৃষ্টি ভেজা রাতে সে-চিৎকারের প্রতিধ্বনিও যেন শুনতে পেল ও। আর একইসঙ্গে শুনতে পেল ছুটে-আসা কয়েকটা পায়ের শব্দ।
রাস্তার ধারের কয়েকটা বাড়ির দরজা-জানলা খুলতে শুরু করেছে। হেডলাইটের আলো পেরিয়ে চৌকো আলোর খোপগুলো আবছাভাবে দেখতে পেল বিদিশা। ওর গলার ভেতরটা জ্বালা করছিল। সেই অবস্থাতেও ও আরও দুবার চিৎকার করে উঠল।
বিদিশা দেখতে পেল, ছায়ামূর্তিটা কয়েক মুহূর্ত দোনামনা করে এদিক-ওদিক পা বাড়াল। তারপর এক ছুটে গাড়িতে গিয়ে উঠল। জোরালো শব্দে বন্ধ হয়ে গেল গাড়ির দরজা। তারপর তাড়া খাওয়া জানোয়ারের মতো বেপরোয়া বাঁক নিয়ে ছিটকে গাড়িটা গেল দূরে। যাওয়ার সময় রাস্তার কাছ ঘেঁষে রাখা একটা ইটের পাঁজায় গাড়ির বাঁ দিকের হেডলাইটটা ধাক্কা খেল। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভাঙল, আলো নিভে গেল। চাকায় কাঁচকাঁচ শব্দ তুলে আঁকাবাঁকা পথে ছুট লাগাল গাড়িটা। মিশে গেল রাতের আঁধারে।
বিদিশা বোধহয় কয়েকমিনিটের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ হঠাৎই ও দেখতে পেল, ও দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দু-পাশ থেকে ধরে রয়েছে দুজন পথচারী। একজন কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে ওর ছাতা আর ব্যাগ। আর একজন ওকে জিগ্যেস করছে, কী হয়েছে, দিদি?
লোকগুলোকে এক পলক দেখল বিদিশা। দুজনকে দেখে রাজমিস্ত্রি বা রিকশাওয়ালা বলে মনে হয়। তারাই আজ বিদিশাকে বাঁচিয়েছে।
বিদিশা থরথর করে কাঁপছিল। কোনওরকমে ও বলল, আমি বাড়ি যাব।
কোথায় বাড়ি বলুন, আমরা এগিয়ে দিয়ে আসছি– একজন বলল।
গাড়িটা কি আপনাকে ধাক্কা মেরে পালাল? আর একজন বলল।
বিদিশা মাথা নেড়ে জানাল, না। তারপর ধীরে ধীরে পা ফেলে বাড়ির দিকে এগোল। দুজন মানুষ ওর পাশে-পাশে পা ফেলে ওকে এগিয়ে দিয়ে গেল অরুণা-সুধাময় পর্যন্ত।
কলিং বেলের শব্দে দরজা খুললেন অরুণা। বিদিশার মুখ-চোখ-পোশাক দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। চাপা গলায় জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে রে?
বিদিশা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, আগে এক গ্লাস জল দাও।
অরুণা আর কোনও কথা না বলে ব্যস্ত পায়ে জল আনতে চলে গেলেন।
বিদিশা ক্লান্ত পায়ে ওর ঘরে এল। হাতব্যাগ আলনায় ঝুলিয়ে ছাতাটা খুলে মেলে দিল পাখার হাওয়ায়। ভিজে কাপড়ে একটু-একটু শীত করছিল। আর একইসঙ্গে বিদিশা বুঝতে পারছিল, ওকে ফিরে পাওয়ার ব্যাপারটা রণজয়ের মাথায় যখন একবার ঢুকেছে, তখন সহজে ও ছাড়বে না। রণজয়কে বিদিশা যেভাবে চেনে, আর কেউ সেভাবে চেনে না। ওর অনেক ব্যাপার কাউকে খুলে বলেনি বিদিশা–বলতে পারেনি।
মা জল নিয়ে এলেন।
এক ঢোঁকে গ্লাসটা খালি করে দিল ও। তারপর একটা বড় শ্বাস ছাড়ল।
অরুণা আবার জিগ্যেস করলেন, কী হয়েছে বললি না তো!
রণজয়ের ব্যাপার। ও আবার আমাকে বিরক্ত করতে শুরু করেছে।
অরুণার ভুরু কুঁচকে গেল। কিন্তু বিদিশা আর কোনও কথা না বলে শুকনো জামাকাপড় নিয়ে চলে গেল বাথরুমের দিকে। অরুণা জানেন, নিজে থেকে না বললে কোনও কথা বের করা যাবে না এই মেয়ের মুখ থেকে।
বারান্দার লাগোয়া ঘরে টিভি চলছে। বাবা টিভি দেখছেন। গাছপালা, টিভি আর খবরের কাগজ–এই নিয়ে বেশ আছেন। তবে ছোটবেলা থেকেই বিদিশা আর বাপ্পাকে শিখিয়েছেন; যদি বাঁচতেই হয়, মাথা উঁচু করে বাঁচবে।
বাথরুমে ঢোকার সময় বিদিশা বাপ্পার গলা শুনতে পেল। ওর ছোট্ট ঘরে মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়ছে। পড়া শেষ করেই ও ছুটে আসবে বিদিশার কাছে। ক্যাডবেরির খোঁজ করবে। আজ নানান দুশ্চিন্তায় ওর ক্যাডবেরির ব্যাপারটা ভুলেই গেছে বিদিশা।
মা-বাবা আর ছোট ভাইকে নিয়ে কী সুন্দরভাবেই না জীবন কাটাচ্ছিল বিদিশা! কোথা থেকে এক দুঃস্বপ্নের মতো এসে হাজির হল রণজয়। মাসতিনেক আগেও লিগাল সেপারেশন আর ডিভোর্সের ব্যাপারে দিব্যি রাজি ছিল। এখন হঠাৎ মাথা বিগড়ে গেছে।
আর কেউ না জানুক, অন্তত বিদিশা তো জানে, হঠাৎ হঠাৎ মাথা বিগড়ে যাওয়াটাই রণজয়ের অসুখ। তার ওপরে রয়েছে ওর অস্বাভাবিক বড় মাপের অপ্রতিসম করোটির ব্যাপারটা। ওর মাথার খুলিকে নাক বরাবর লম্বালম্বি ভাগ করলে দুটো ভাগ মোটেই সমান পাওয়া যায় না। বাঁ-দিকের ভাগটা ডান দিকের তুলনায় অনেক বড়। ডাক্তারি মতে এটা খুব বিপজ্জনক হতে পারে।
বাথরুমে গা ধুয়ে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে রণজয়ের কথা ভাবছিল বিদিশা। ও মিথ্যে বলেনি। ও নিয়মিত অনুসরণ করছে বিদিশাকে–সে অফিস-পাড়াতেই হোক বা সল্ট লেকেই হোক। ফোন করে ফলো করে রণজয় তো ওকে পাগল করে দেবে।
আচ্ছা, শেখরকে একটা ফোন করলে কেমন হয়? প্রশ্নটা নিয়ে অনেকক্ষণ নাড়াচাড়া করল বিদিশা। তারপর ঠিক করল, রাতে খাওয়াদাওয়ার পর শেখরকে ফোন করবে। রাতে ও পাড়ার ক্লাবে আড্ডা মারতে বেরোয়। শেখরই বলেছে। বাড়ি ফেরে সাড়ে দশটা নাগাদ। তারপর নতুন কোনও পেপারব্যাক নিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। অবশেষে বই পড়তে-পড়তে ঘুম।
বেশ আছে মানুষটা! ওকে হিংসে করতে ইচ্ছে হল বিদিশার। কী চমৎকার দুশ্চিন্তহীন সুখী জীবন! রণজয়কে নিয়ে একইরকমই একটা জীবন চেয়েছিল বিদিশা। অথচ সব কীরকম গোলমাল হয়ে গেল।
