বিদিশা পিছন ফিরে একবার দেখল। না, সন্দেহজনক কাউকে নজরে পড়ছে না। রণজয় কি তাহলে মিথ্যে ভয় দেখাল! কিন্তু ভয় দেখানোর প্রশ্ন উঠছে কেন? একজন স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চায়। এর মধ্যে ভয়ের কী আছে! ভয়ের কিছু থাকত না, যদি না বিদিশা রণজয় সম্পর্কে কিছু কথা জেনে ফেলত। যে রাতে ও কথাগুলো জানতে পেরেছিল সেই রাতেই রণজয় ওর বাঁ গালে ভালোবাসায় স্থায়ী চিহ্ন এঁকে দিয়েছিল।
সুইমিং পুলের মোড়টা ছাড়িয়ে আরও কিছুটা এগোতেই বিদিশার নিজেকে আরও একা মনে হল। রাস্তার কোনও আলো জ্বলছে না। তবুও সামনের আইল্যান্ডের প্রকাণ্ড খাঁচাটা আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে। আর একটু এগোলেই ডান দিকের সরু গলিটা পেয়ে যাবে বিদিশা। তারপর এক মিনিটেই পৌঁছে যাবে বাড়ির দরজায়।
উলটোদিকের রাস্তায় সি. এফ. ব্লকের বাড়িগুলোর ধার ঘেঁষে একটা মারুতি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়ির ছাদে আলো পড়ে বৃষ্টির জল চিকচিক করছে। কিন্তু গাড়ির রং ঠিকমতো ঠাহর করা যাচ্ছে না।
রণজয়ের গাড়ি নেই। অন্তত বিদিশা যখন ওকে ছেড়ে চলে আসে, তখন ছিল না। বিদিশার বুক ঠেলে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। ওই তো, কাঠগোলাপ গাছটা এসে গেছে। তার পাশ দিয়েই সরু গলিটা চলে গেছে। গলির শেষে পিচের রাস্তা। রাস্তার শেষে বিদিশাদের বাড়ি।
আজকের দিনটা কোনওরকমে তাহলে কাটল। ভাবল বিদিশা।
আর ঠিক তখনই মারুতি গাড়িটার তীব্র হ্যালোজেন হেডলাইট জ্বলে উঠল। বিকট গর্জন করে পাগলের মতো বাঁক নিয়ে গাড়িটা ছুটে এল বিদিশার দিকে।
আপ আর ডাউন লেন–দু-রাস্তার মাঝে সরু একফালি ঘাসে ঢাকা জমি। জমিটা রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা উঁচু। আড়াআড়ি আসতে গিয়ে দ্রুতগতির গাড়িটা উঁচু জমিতে ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে উঠল। তার পরেই বিশ্রী গর্জন করে ঠিকরে এল বিদিশাকে লক্ষ করে।
বিদিশা চিৎকার করতে গিয়ে টের পেল ওর গলা দিয়ে কোনওরকমে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো ওকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। হ্যালোজেন বাতির আলোয় বৃষ্টির ঝিরঝিরে ফোঁটাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ও একপাশে সরে যেতে গিয়ে হোর্চট খেল। টাল খেয়ে নিজেকে সামলে নিতে পারলেও ছাতাটা পড়ে গেল হাত থেকে।
গাড়িটা ওর ঠিক পাশ দিয়ে খ্যাপা জন্তুর মতো ছুটে গেল। তারপর বিশ্রী শব্দ তুলে ব্রেক কষে একটা ঝটকা দিয়ে থামল।
পরক্ষণেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ইউ টার্ন নিল গাড়িটা। বিদিশা তখন বৃষ্টিভেজা পিচের রাস্তা ধরে পাগলের মতো ছুটছে।
গাড়িটা এবারে ধেয়ে এল আরও জোরে। বিদিশার গায়ে মরণের বাতাস ছুঁইয়ে ওর ঠিক গাঁ ঘেঁষে ঠিকরে গেল সামনে। কিছুটা গিয়ে আচমকা ব্রেক কষল। তারপর গর্জন তুলে বাঁক নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল বিদিশার মুখোমুখি। আবার পাগল করা গতিতে ছুটে এল ওর দিকে।
বেড়াল যেমন ইঁদুর নিয়ে খেলা করে, বৃষ্টিভেজা কালো রাতে গাড়িটা বিদিশাকে নিয়ে ঠিক সেরকম খেলতে লাগল। ইঞ্জিনের গর্জন, হেডলাইটের তীব্র আলো, চাকার শব্দ মেয়েটাকে দিশেহারা করে দিচ্ছিল। এলোমেলোভাবে ছুটোছুটি করতে করতে ও ধাক্কা খেল কাঠগোলাপ গাছটার গুঁড়িতে। পলকের জন্য শরীরটা একটা ভয়ংকর ঝাঁকুনি খেল। তার পরই ও পড়ে গেল মাটিতে।
গাড়িটা ওকে লক্ষ করে ছুটে আসছিল। ওকে পড়ে যেতে দেখেই গাড়িটা থামল। হেডলাইটের উজ্জ্বল চোখ বিদিশার দিকে স্থির।
বিদিশা কেমন অসাড় হয়ে গেলেও চেতনা হারায়নি। ও তাকিয়ে ছিল মারুতি গাড়িটার দিকে। কিন্তু চোখ ধাঁধানো আলোয় স্পষ্ট করে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। শুধু বৃষ্টির ফোঁটা ঝিরঝির করে পড়ছে।
গাড়ি থেকে কেউ নামল। কারণ দরজা খোলা এবং বন্ধ করার শব্দ হল। তারপর হেডলাইটের আড়াল করে একটা রোগা শরীর অলস পা ফেলে এগিয়ে আসতে লাগল বিদিশার দিকে।
বিদিশা চিৎকার করতে চাইছিল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছিল না। ওর চোখ সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রইল এগিয়ে আসা কালো ছায়াটার দিকে।
এক সময় মানুষটার তীব্র ছায়া এসে পড়ল বিদিশার গায়ে। আর তখনই আলতো গলায় সে বলে উঠল, মানু, কেমন আছ?
বিদিশার শীত শীত করে উঠল। ওর শাড়ি বৃষ্টিতে ভেজা সপসপে। কাঁধের ব্যাগ কোথায় ছিটকে পড়েছে। গলার কাছে একটা পাথরের বল আটকে রয়েছে কিছুতেই ওকে চিৎকার করতে দিচ্ছে না। শুধু চাপা আঁক-আঁক শব্দ বেরিয়ে আসছে গলা দিয়ে। ওর চেতনার জগৎ ঘিরে রয়েছে চোখ ধাঁধানো হেডলাইটের আলো, একটা লিকলিকে কালো ছায়া, আর শ্বাস রোধ করা এক আতঙ্ক।
ওর ফরসা মুখের সৌন্দর্য কোথায় যেন লুকিয়ে পড়েছে। আতঙ্কে কুঁকড়ে যাওয়া মুখ দেখে ওকে মোটেই চেনা যাচ্ছিল না। জল কাদা মাখা ওর অসহায় শরীরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। বিদিশার সেদিকে কোনও খেয়াল নেই।
অশরীরী ছায়াটা চেনা গলায় আবার কথা বলল, তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে, মানু। তোমাকে ছেড়ে আমি ভীষণ কষ্টে আছি। এতদিন একষ্ট টের পাইনি, কিন্তু এখন টের পাচ্ছি। তুমি আমার কাছে ফিরে এসো। আমার ফাঁকা জায়গাটা ভরে দাও। নইলে আমি মরে যাব..বিশ্বাস করো। তুমি আমার বাড়িতে উঁহু, আমার বাড়িতে নয়, তোমার বাড়িতে ফিরে এসো, তোমাকে অনেক কথা বলব। আমাকে তুমি ক্ষমা করতে পারো না, মানু। মানুষের কি ভুল হয় না! অনুতাপে অনুতাপে আমি জ্বলে-পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমার অবস্থাটা একবার ভেবে দ্যাখো–।
