স্যার, আমি আসছি বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিদিশা।
প্রশান্ত চক্রবর্তী কথাটা বোধহয় শুনতে পাননি, কারণ চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন ওর দিকে। কানে খাটো বলে সবসময় ওঁর সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলতে হয়। এখন বিদিশার চেঁচাতে ভালো লাগছিল না।
যদি দরকার হয় বোলো। ছুটির পর তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেব। তোমাকে ভীষণ আপসেট দেখাচ্ছে।
বিদিশা কোনও জবাব না দিয়ে ফিরে গেল নিজের সিটে।
ওদের সেকশনে তিনটে এক্সটেনশন লাইন আছে। তিনটে টেলিফোনের দিকেই ভয়ে-ভয়ে দেখছিল বিদিশা। এই বুঝি একটা ফোন বেজে উঠল, আর কেউ ফিসফিসে গলায় বলে উঠল, মানু, কেমন আছ?
টেবিলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল বিদিশা। শরীরটা কেমন লাগছে। সেই সঙ্গে ঝিমুনি ভাব। রণজয় বলেছে, আজ সন্ধেবেলা ওর সঙ্গে দেখা করে সব বুঝিয়ে বলবে। কখন দেখা করবে? দেখা। করে কী বলবে?
অফিস ছুটির সময় যতই কাছে এগিয়ে আসছিল, বিদিশার ভয় ততই বাড়ছিল। রণজয়ের কথা কাকে বলবে ও? শেখরকে? বোসদাকে? নাকি চক্রবর্তীসাহেবকে?
অফিসে কেউ জানে না বিদিশার বিয়ে হয়েছে। কপালে বা সিঁথিতে কোনওরকম সিঁদুরের ছোঁয়া নেই। নামও বিদিশা রায়–সুধাময় রায় ও অরুণা রায়ের মেয়ে। এখন যদি ও হঠাৎ করে কাউকে বলে ওর একটা স্বামী আছে, তাহলে কেমন শোনাবে ব্যাপারটা?
সারাটা দিন এরকম তোলপাড় মন নিয়ে কেটে গেল বিদিশার। বিকেলে হঠাৎই একসময় ওর খেয়াল হল অফিস ছুটি হয়ে গেছে।
ছুটির পর ওরা বেশ কয়েকজন দল বেঁধে পার্ক স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত যায়। তারপর কেউ পাতাল রেল, কেউ বাস কিংবা মিনিবাস, আর কেউবা চার্টার্ড বাসের যাত্রী হয়ে যে যার দিকে চলে যায়।
বিদিশার সঙ্গে শেখর আর বোসদা প্রায় রোজই বেরোন। আজ ওঁরা দুজন ছাড়াও রয়েছে। জুনিয়ার ড্রাফটসম্যান অশোক চন্দ্র, রিসেপশনিস্ট দেবলীনা পাল, টাইপিস্ট অতনু সরখেল আর অ্যাকাউন্টস-এর সুতপা দাস।
সুতপাদি আর দেবলীনা ক্যামাক স্ট্রিটে কীসব কেনাকাটা করবে বলে চলে গেল। অতনু সরখেল রোজই ধর্মতলা পর্যন্ত হেঁটে যায়, তারপর সেখান থেকে হাওড়ার বাস ধরে। তাই ও রাস্তা পার হয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের দিকে চলে গেল।
শেখর থাকে টালিগঞ্জে। পাতাল রেলে যাতায়াত করে। বোসদা, থাকেন শোভাবাজারে। তিনিও পাতালযাত্রী। অশোক চন্দ্রর বাড়ি রাজাবাজারের কাছে। ও পার্ক স্ট্রিটের মোড় থেকে বাস ধরে।
বিদিশা ভাবছিল, কার সঙ্গে কত বেশিক্ষণ ও থাকতে পারে। রণজয় ওকে প্রায়ই ফলো করে, বিদিশা টের পায় না। এখনও কি ফলো করছে না কি? ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ কয়েকবার পিছনে তাকাল বিদিশা। কিন্তু অফিস ছুটির ভিড়, গাড়ির ব্যস্ততার মধ্যে ফরসা রোগা চেহারার কোনও মানুষকে খুঁজে পেল না।
শেখর বলল, কী ব্যাপার, ম্যাডামকে একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।
বিদিশা ইতস্তত করে বলল, হ্যাঁ, একটু ঝামেলা হয়েছে। পরে বলব।
বোসদা পান চিবোতে চিবোতে বললেন, এ কী ধরনের পারশিয়ালিটি, মা জননী? সেনসাহেবকে বলবেন, আর আমি বাদ! আমি কি বুড়ো বলে এজ বারে আটকে গেলাম?
ওরা তিনজনই হেসে উঠল।
তখন অশোক বলল, ঠিক বলেছেন, বোসদা, আমি ছোট বলে এজ বারে আটকে গেছি।
এইরকম হাসি-ঠাট্টা করতে করতে ওরা পার্ক স্ট্রিটের মোড়ে পৌঁছে গেল।
তখন বিদিশা আচমকা বলে উঠল, বোসদা, আমি আপনার সঙ্গে মেট্রোতে যাব। শোভাবাজারে নেমে অটো ধরব।
শেখর একটু অবাক হয়ে গেল। কারণ বিদিশা সাধারণত বাসে যায়। কিন্তু কিছু বলল না।
বোসদা শেখরের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বললেন, সেন মহাশয়, আমাকে তুমি যতটা বুড়ো ভাব ঠিক ততটা বুড়ো আমি নই।
উত্তরে শেখর হাসল।
ওরা তিনজনে কথা বলতে বলতে মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। তখনও বিদিশা পিছন ফিরে শেষবারের মতো রণজয়কে খুঁজল।
.
সল্ট লেকের সি.এ.পি. ক্যাম্প বাস স্টপে যখন নামল, তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে।
ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে মাথায় দিল বিদিশা।
চৌরাস্তার আইল্যান্ডটা জালের বিশাল ঘেরাটোপে ঢাকা। একসময়ে এটা পাখির খাঁচা ছিল। এখন পাখি নেই–শুধু শূন্য খাঁচা পড়ে আছে।
খাঁচাটাকে বাঁ-দিকে রেখে রাস্তা পার হল বিদিশা। বাস স্টপে মাত্র তিন-চারজন মানুষ। প্রত্যেকেরই মাথায় ছাতা। রাস্তার আলোয় ছাতার ভিজে কাপড় চিকচিক করছে।
বিদিশা ঘড়ি দেখল। প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। অফিস ছটায় ছুটি হলেও দু-একদিন এমনই
দেরি হয়ে যায়। উলটোডাঙার রেল ব্রিজের নীচটায় জ্যাম থাকে। আজও তাই।
সি.এ.পি. ক্যাম্প স্টপেজে বিদিশা একাই নেমেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা নিরাকার আতঙ্ক বাসা বেঁধে রয়েছে ওর মনে। তাই ভিজে রাস্তায় চটপট পা ফেলে হাঁটা দিল।
ওর বাড়ি সি.ই. ব্লকে। সুইমিং পুলের মোড় ছাড়িয়ে প্রায় আর এক চৌরাস্তার মোড়ের কাছাকাছি। সেখানেও একটা পাখির খাঁচা আছে।
সারাদিন মেঘলা আর বৃষ্টি। তাই রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই। কখনও কখনও একটা-দুটো বাস ছুটে যাচ্ছে। সেই শব্দ মিলিয়ে গেলেই এলাকাটা চুপচাপ।
রাস্তায় কয়েকটা নেড়ি কুকুর বৃষ্টির মধ্যেই ঝগড়া করছে। পরদা ঢাকা একটা সাইকেল রিকশা সুইমিং পুলের দিকে চলে গেল। সামনে যতদূর নজর চলে, কোনও মানুষজন নেই। এমনকী সাইকেল রিকশা স্ট্যান্ডেও কোনও রিকশা দাঁড়িয়ে নেই।
