ইন্টারকম টেলিফোনটা আবার বাজতে শুরু করেছে। বিদিশার বুকের ভেতরেও পাগলা ঘণ্টি বাজছে। সত্যিই কি আজ সন্ধেবেলা ওর সঙ্গে দেখা করবে রণজয়? কোথায় দেখা করবে?
যেন অন্য কারও পায়ে ভর দিয়ে চক্রবর্তীসাহেবের টেবিলের দিকে এগোল বিদিশা। লক্ষ করল, নিজের সিট থেকে শেখর উদ্বিগ্ন চোখে ওকে দেখছে। আরও দু-একজন কলিগের চোখে কৌতূহল। এখন কী করবে ও?
কী ব্যাপার, বিদিশা, তোমাকে এত আপসেট দেখাচ্ছে কেন? প্রশান্তলাল চক্রবর্তীর গলায় দরদ উথলে উঠছে? আবার চা দিতে বলি? তোমার চা এতক্ষণে ঠান্ডা জল হয়ে গেছে।
বিদিশা কোনওরকমে বলল, না, চা খাব না। তারপর শর্টহ্যান্ড খাতা আর পেনসিল নিয়ে ডিকটেশন নেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বসল।
অফিসের দেওয়ালে বড় বড় কাচের জানলা। জানলার বাইরের ভিজে মেঘলা আকাশ মন খারাপ করে দিচ্ছে। হঠাৎই একটা বিদ্যুৎ-রেখা চোখে পড়ল বিদিশার। বিদ্যুতের ঝিলিক দেখলেই ওর সেই ভয়ংকর রাতটার কথা মনে পড়ে যায়। চেনা রণজয়ের ভেতর থেকে একটা অচেনা রণজয় হঠাৎই উঁকি মেরেছিল সেই রাতে।
সেদিনটাও ছিল আজকের মতোই মেঘলা। ঘন-ঘন বৃষ্টি পড়ছিল আকাশ ভেঙে। আর সেই সঙ্গে বিদ্যুতের আলপনা।
রণজয় বৃষ্টিতে ভিজে সপসপে হয়ে বাড়ি ফিরল। তখন রাত কত হবে? বড় জোর নটা। সকালে বেরোনোর সময় ও বলেই গিয়েছিল ফিরতে একটু দেরি হবে। তবে দেরি বলতে বিদিশা ভেবেছিল সাতটা-সাড়ে সাতটা হবে। কারণ রোজ ও ছটার মধ্যে বাড়ি ফেরে।
ওর হেড অফিস বালিগঞ্জে। বছরদুয়েক হল রণজয় হেড অফিসেই আছে। এখানে নতুন একটা রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলাপমেন্ট উইং ভোলা হয়েছে–ও-ই সেটার গ্রুপলিডার। কোনও কোনও দিন অফিসের কাজে আটকে গেলে ও ফোন করে দেয় বাড়িতে।
বাড়িতে শুধু বিদিশা আর রণজয়ের মা। ছোট দোতলা বাড়ির একতলায় মা থাকেন, দোতলায় রণজয়-বিদিশা। ঠিকে কাজের বউ দু-বেলা কাজ করে যায়।
কলিং বেলের ঘণ্টা শুনে বিদিশাই খুলে দিয়েছিল সদর দরজা।
ভিজে সপসপে রণজয় দরজায় দাঁড়িয়ে। রাস্তার মলিন আলো তেরছাভাবে এসে পড়েছে। ওর ভিজে পোশাকে।
আজ ছাতা না নিয়ে ভীষণ ভুল করেছি। রণজয় হেসে বলল।
সদর দরজা বন্ধ করে ওর পিছন পিছন শোয়ার ঘরে এসেছিল বিদিশা। রণজয় অফিস থেকে অন্তত একটা ফোন করতে পারত বিদিশাকে। সারাটা সন্ধে ঘরে বন্দি হয়ে কারই বা টিভি দেখতে ভালো লাগে!
ফিরতে এত দেরি হল?
বিদিশা প্রশ্নটা নির্দোষভাবেই করেছিল, কৈফিয়ত চাওয়ার জন্য নয়।
রণজয় ওর দিকে পিছন ফিরে ভিজে জামা ছাড়ছিল গা থেকে। পলকে ঘুরে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিল বিদিশার গালে। বিদিশা ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে।
কৈফিয়ত দেওয়া আমি পছন্দ করি না। কঠিন গলায় মন্তব্য করেছিল রণজয়।
বিদিশা হঠাৎই যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। গালে হয়তো ব্যথা পেয়ে থাকবে, কিন্তু সেই ব্যথাটা ও টের পাচ্ছিল না। ভালোবাসার পুরুষ রণজয়ের আচরণ ওকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
বাইরে মেঘ ডাকছিল। কিন্তু বিদিশার মনে হচ্ছিল মেঘ ডাকছে ওর বুকের ভেতরে। মেঝেতে আধশোয়া অবস্থায় ওর শরীর কাঁপছিল থরথর করে।
ভিজে জামাটা মেঝেতে একপাশে ফেলে দিয়ে রণজয় এগিয়ে এল বিদিশার কাছে।
বিদিশা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। ওর ঠোঁটের কোণ জ্বালা করছিল। বোধহয় কেটে গেছে।
রণজয় ওকে সাবধানে তুলে বসাল বিছানায়। বিদিশা তখন মাথা নীচু করে কাঁদছে। ওর শরীরটা ফুলে-ফুলে উঠছে।
কেঁদো না, মানু, কেঁদো না– ওকে আদর করে বোঝাতে চাইছিল রণজয়, অন্যায় করেছ, তার শান্তি পেয়েছব্যস, মিটে গেছে।
মিটে গেছে! চোখ মুছে অচেনা রণজয়কে দেখতে চাইল বিদিশা। কিন্তু ততক্ষণে চেনা রণজয় আবার ফিরে এসেছে। দু-চোখে ভালোবাসা। আর দু-হাতে আদর করছে বিদিশাকে। বিদিশা কাঠ হয়ে বসেছিল।
কিন্তু রণজয়ের আদর বাড়তেই লাগল।
ওর ভিজে প্যান্ট থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল মেঝেতে। গায়ের ভিজে গেঞ্জিটা একটানে খুলে ফেলল রণজয়। পরক্ষণে প্যান্ট ইত্যাদিও।
বিদিশা প্রথম ধাক্কাটা তখনও সামলে উঠতে পারেনি। দ্বিতীয় ধাক্কাটাও পারল না।
রণজয় খ্যাপা ষাঁড়ের মতো হিংস্রভাবে আদর করতে লাগল ওকে। জামাকাপড় লন্ডভন্ড হয়ে গেল। সেই সঙ্গে বিছানাও।
ঘরের টিউব লাইট নির্লজ্জভাবে জ্বলছে। জ্বলছে বিদিশার শরীরটাও। বাইরে মেঘের ডাক যেন রণজয়ের গর্জন। তীব্র এক জ্বালায় ওর শরীরটা বিদিশাকে আঁকড়ে মরিয়া হয়ে ছটফট করছে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বিদিশার ভেতরেও।
একসময় মেঘের গর্জন, বৃষ্টি–দুই-ই কমে এল। অসাড় মন নিয়ে বিদিশা এলোমেলোভাবে পড়ে রইল বিছানায়। শুধু ওর ক্লান্ত দুটো চোখ রণজয়কে দেখতে লাগল। এই মানুষটাকে ও ভালোবেসে সাতমাস আগে বিয়ে করেছিল!
রণজয় একটা পাজামা আর গেঞ্জি পরে নিয়ে পাখার বাতাসে চুল শুকোচ্ছিল। মাথার চুলে আঙুল চালাতে-চালাতে ও নির্লিপ্ত গলায় বলল, খেতে দাও। খিদে পেয়েছে।
বিদিশা সেই রাতেই মনে-মনে টের পেয়েছিল ওর বিয়েটা মরে গেছে।
কিন্তু তার পরেও সতেরোটা মাস ওকে সেই লাশটাকে বয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। অবশ্য তারপর আর পারেনি।
থ্যাংক য়ু, বিদিশা। তুমি টেবিলে গিয়ে একটু রেস্ট নাও। এই চিঠিগুলো সেকেন্ড হাফে টাইপ করে দিলেও চলবে।
বিদিশা চমকে উঠে খেয়াল করল প্রশান্ত চক্রবর্তী ওর সঙ্গে কথা বলছেন। বিদিশা ওর হাতের শর্টহ্যান্ড খাতার দিকে দেখল। দেখে অবাক হয়ে গেল। পুরোনো কথা ভাবতে-ভাবতেও কী করে যেন যান্ত্রিকভাবে ও ডিকটেশন নিয়ে ফেলেছে।
