বিদিশার মন বলছে, আজ রাতে ও আবার ফোন করবে। আবার একই কথা বলবে।
ছতলার অফিসের ফ্লোরে পৌঁছে যেন অন্য জগতে ঢুকে পড়ল বিদিশা। নিজের চেয়ার টেবিলে গুছিয়ে বসল। পোস্টাল ফ্যানটা চালিয়ে দিল ফুল স্পিডে। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে নিল। হালকা পারফিউমের গন্ধ টের পেল। আর তখনই দেখল শেখর সেন ওর টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে।
শেখর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বয়েস বত্রিশ-তেত্রিশ। লম্বা শক্তিশালী কাঠামো। গায়ের রং শ্যামবর্ণ। চোখে চশমা। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা।
একসময়ে ট্র্যাকে দৌড়োনোই ছিল শেখরের ধ্যানজ্ঞান। একশো মিটারে ইন্টার কলেজ চ্যাম্পিয়ানও হয়েছিল। এখন রোজ ভোরবেলা দেশবন্ধু পার্কে দৌড়োয়।
ম্যাডাম, নিন, এই বইটা পড়ে দেখুন– একটা ইংরেজি পেপারব্যাক বিদিশার দিকে এগিয়ে দিল শেখর, এই বইটা বিদেশে প্রচুর বিক্রি হয়েছে।
বিদিশা বইটা হাতে নিয়ে দেখল। স্টিভ সোয়ানসন নামে একজন সিরিয়াল কিলারের আত্মজীবনী। নাম : মাই লাইফ উইথ নাইফ।
শেখর বইয়ের পোকা। অফিসে কোনও না কোনও বই ওর সঙ্গে থাকবেই। আজ এটা নিয়ে এসেছে। হয়তো আজই বাসে বইটা পড়ে শেষ করেছে। তাই বিদিশাকে পড়তে দিচ্ছে।
শেখর প্রায়ই বই পড়তে দেয় বিদিশাকে। ইংরেজি গল্প-উপন্যাস নিয়ে ফাঁক পেলেই আলোচনা-তর্ক জুড়ে দেয়। আর নিজের দৌড়োনোর দিনগুলোর গল্প করে।
বিদিশা ঠোঁট কুঁচকে বলল, না, না, এসব খুন-জখমের বই আমার ভালো লাগে না।
শেখর বলল, এই সোয়ানসন লোকটা স্যাডিস্ট সাইকোপ্যাথও বলা যায়। মহিলাদের খুন করেই ও আনন্দ পেত। ওর মাথার গণ্ডগোল আছে বলেই ইলেকট্রিক চেয়ার হয়নি। আমেরিকায় যাবজ্জীবন জেল খাটছে।
ওরে বাবা আঁতকে উঠল বিদিশা, এসব বই কেন পড়েন আপনি?
বিদিশার টেবিলে হাতের ভর রেখে ঝুঁকে পড়ল শেখর। বলল, আপনাকে সত্যি কথাটাই বলি। রোমাঞ্চকর থ্রিলিং ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগে। যখন ট্র্যাকে দৌড়োতাম তখন খুব থ্রিলিং লাগত। এখন তো জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেছে।
শেষদিকে মুখটা এমন ব্যাজার করল যে বিদিশা হেসে ফেলল।
হঠাৎই কোথা থেকে ম্যানেজার পি. এল. চক্রবর্তী এসে শেখরের পাশ দিয়ে উঁকি মারল ও বিদিশা, জলদি এসো। অনেকগুলো ইমপরট্যান্ট চিঠি ডিকটেট করার আছে।
বিদিশা চক্রবর্তীসাহেবের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, এখুনি যাচ্ছি।
শেখর হেসে বলল, আপনিও একটা এরকম বই লিখে ফেলুন ম্যাডাম। বইটার নাম দেবেন মাই লাইফ উইথ পি. এল. চক্রবর্তী।
বিদিশা শর্টহ্যান্ড খাতা আর পেন্সিল বের করে নিল ড্রয়ার থেকে। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল।
শেখর বলল, লাঞ্চের সময় দেখা হচ্ছে।
বিদিশা ঘাড় নেড়ে মোজাইক করা মেঝেতে পা ফেলে এগিয়ে চলল প্রশান্ত চক্রবর্তীর টেবিলের দিকে।
এর মধ্যেই যে যার কাজে মন দিয়েছে। চায়ের গাড়ি ঢুকে পড়েছে ফ্লোরে। টেবিলে-টেবিলে চা পৌঁছে দিচ্ছে টি-বয়। ছেলেটা বিদিশাকে জিগ্যেস করল ম্যাডাম, আপনার চা কোথায় দেব?
বিদিশা ইশারায় ম্যানেজারের এক্সিকিউটিভ টেবিল দেখিয়ে দিল।
ঠিক তখনই ওদের বেয়ারা বনজারা এসে দাঁড়াল ওর কাছে। বলল, ম্যাডাম, আপনার ফোন। আঙুল তুলে একটা এক্সটেনশন লাইন দেখাল বনজারা।
বিদিশা এগিয়ে গিয়ে ফোন ধরল।
হ্যালো।
মানু, কেমন আছ?
বিদিশার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে চাইল। ওর অফিসের ফোন নম্বর কী করে পেল রণজয়!
মানু, কথা বলছ না কেন? আকুল গলায় জানতে চাইল রণজয়, তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। একটিবার তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। বিদিশা…মানু…প্লিজ, একবার আমাকে কথা বলার চান্স দাও।
এটা অফিস। এখানে এভাবে ফোন করাটা ভালো দেখায় না– ঠান্ডা গলায় বলল বিদিশা।
কী বলছ, মানু! আমি তোমাকে ফোন করলে কে কী মনে করবে! আফটার অল আমি তোমার স্বামী।
বিদিশা একটা ধাক্কা খেল। রণজয় ওর প্রাক্তন স্বামী নয়–আইনের হিসেব অনুযায়ী বর্তমান স্বামী। ওর মাথার ভেতরটা কেমন যেন করছিল। কী বলবে এখন রণজয়কে?
অফিসের ফোন নম্বর তুমি কোথায় পেলে? বরফের গলায় জানতে চাইল বিদিশা।
ও-প্রান্তে পাগলের মতো হেসে উঠল বিদিশার স্বামী। হাসতেই লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পর সহজ গলায় জবাব দিল, তোমাকে আমি প্রায়ই ফলো করি, তুমি টের পাও না। অফিসের আর পাঁচটা লোকের সঙ্গে হইহুল্লোড় ফুর্তি করতে করতে আমার কথা তুমি একেবারে ভুলেই গেছ। তোমাকে আমি দূর থেকে রোজ দেখি আর নতুন করে ভালোবাসায় পাগল হয়ে যাই।
অফিসের অপারেটর লাইন ট্যাপ করে যান্ত্রিকভাবে মন্তব্য করল, প্লিজ মেক ইট কুইক, ম্যাম। সো মেনি ইনকামিং কল্স আর ওয়েটিং।
বিদিশার ভয় করছিল। যে-দুঃস্বপ্নটা মুছে গেছে বলে মাসতিনেক ধরে ও নিশ্চিন্ত ছিল। সেই দুঃস্বপ্নটা আবার কুৎসিতভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে।
ও ছোট্ট মেয়ের মতো জেদি গলায় বলল, তোমার সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই। আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না। প্লিজ, গেট লস্ট ফ্রম মাই লাইফ। কথার শেষে কেঁদে ফেলল বিদিশা।
জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করল রণজয় : ছিঃ মানু, শুধু-শুধু কাঁদতে নেই। আজ সন্ধেবেলা তোমার সঙ্গে দেখা করে সব বুঝিয়ে বলব। তখন বুঝবে, একা-একা আমি কী কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। এখন রেখে দিই? টা-টা। আই লাভ য়ু, লাভ।
লাইন কেটে গেল।
অসাড় হাতে রিসিভার নামিয়ে রেখে কোমর থেকে রঙিন রুমাল বের করল বিদিশা। প্রাণপণে। কান্না চেপে চোখ মুছল।
