সামান্য নির্দোষ চিঠি। কিন্তু তারই মধ্যে আঠারো বছরের বিদিশা কী যেন খুঁজে পেয়েছিল। এ যেন এক আঁজলা জলে ডুবে মরার গভীরতা।
এক লাইন নয়, বিদিশা এক পৃষ্ঠা লিখে জানিয়েছিল, ফটো কেমন লেগেছে।
নিতান্ত নির্দোষ চিঠি। কিন্তু তারপর থেকে একইরকম নির্দোষ চিঠি আসতে লাগল, যেতে লাগল।
দিন-মাস কাটতে লাগল। আর, অত্যন্ত ধীরে নির্দোষ চিঠিগুলোতে ভালোবাসার দোষ ঢুকতে লাগল।
রণজয় সি. এন. জ্যাকসন কোম্পানির সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার। বি. ই. কলেজ থেকে ইলেকট্রনিক্সে ডিগ্রি নিয়ে বছর আড়াই হল চাকরিতে ঢুকেছে। কোম্পানির হেড অফিস কলকাতার, কিন্তু ফ্যাক্টরি দুর্গাপুর। মাসের মধ্যে অন্তত দুবার কলকাতার আসে রণজয়। তখন বিদিশার সঙ্গে দেখা করতে ওর অসুবিধে নেই।
বিদিশা ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে বেথুন কলেজে ভরতি হয়েছিল।
রণজয় ওর সঙ্গে কলেজে এসে দেখা করতে লাগল। একবার দেখা হওয়ার পর চোদ্দো দিন ধরে অপেক্ষা করত বিদিশা। তখন ওর মনে হত, হেদুয়া পার্কের গাছের পাতাগুলো কী সাংঘাতিক সবুজ, ওপরের আকাশটা কী বিপজ্জনক নীল, আর হেদুয়ার জল কী ভীষণ স্বচ্ছ!
জীবনকে আগে কখনও এত রূপসী মনে হয়নি বিদিশার। একটা রোগা ফরসা মুখচোরা চশমা পরা মিষ্টি ছেলে ওর জীবনটাকেই যেন পালটে দিল।
এখন পিছন ফিরে তাকালে বিদিশার মনে হয়, রণজয়ের মধ্যে ছোটখাটো কয়েকটা অস্বাভাবিক ব্যাপার তখন থেকেই দেখা গিয়েছিল। আজ যত স্পষ্টভাবে তার অর্থ বোঝা যায় তখন তা বোঝা যায়নি।
পার্ক স্ট্রিটের বাস স্টপে নেমে ডানদিকের ফুটপাথ ধরে একটু তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হাঁটছিল বিদিশা। অফিসে দেরি হয়ে যাবে এই ভয়ে বারদুয়েক হাতঘড়ির দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎই পিছন থেকে, ঠিক ঘাড়ের কাছে, কে যেন বলে উঠল, আগে গেলে বাঘে খায়–।
চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকাল বিদিশা। ওরই অফিসের সহকর্মী বোসদা-সুধীর বোস। অভিজ্ঞ ড্রাফটসম্যান। মাথায় টাক–শুধু কানের কাছটায় খানিকটা করে চুল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পানের রসে ঠোঁট লাল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষকে আপন করে নিতে পারেন।
বিদিশা অপ্রস্তুত হেসে বলল, দেরি হয়ে যাবে, তাই তাড়াতাড়ি হাঁটছি।
সুধীর বোস পান চিবোতে-চিবোতে জড়ানো গলায় বললেন, আমার কথাটার ইনার মিনিং আছে, মা জননী।
বিদিশা অপ্রতিভ হয়ে আশেপাশে তাকাল। কেউ শুনতে পায়নি তো! বোসদার কথাবার্তাই এইরকম। বিদিশা জানে এখানে বাঘ বলতে ওদের সেকশনের ম্যানেজার প্রশান্তলাল চক্রবর্তী। ভদ্রলোক কানে কম শোনেন, আর সেইজন্যেই বোধহয় মহিলা-আসক্তি অত্যন্ত প্রবল। কারণ, লোকে বলে, একটা ইন্দ্রিয় কমজোরি হলে অন্য কোনও ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে লোকসান পুষিয়ে দেয়।
বিদিশা স্টেনোগ্রাফারের চাকরি করে। প্রশান্ত চক্রবর্তী নানা ছুতোয় ওকে ডেকে ডিকটেশন দেন। সারাদিনই নির্লজ্জ চোখে ওর শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রথম-প্রথম বিদিশার খুব খারাপ লাগত, কিন্তু ধীরে-ধীরে ব্যাপারটা গা সওয়া হয়ে গেছে। ও বুঝতে পেরেছে, মেয়েদের চাকরির ক্ষেত্রে এ-অসুবিধেটা থাকবেই। ছমাসের চাকরি বিদিশাকে ছবছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে দিয়েছে। যেমন রণজয়ের সঙ্গে দু-বছরের সংসারটাকে ওর সবসময় দুশো বছর বলে মনে হয়।
সকালের এই সময়টা পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথ ধরে অসংখ্য অফিসযাত্রী দ্রুত-পায়ে হেঁটে যায়। আর রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে একের পর এক গাড়ি। এই অঞ্চলটার আপাদমস্তক এখন গতি। মাথার ওপরে শ্রাবণের মেঘলা আকাশ যেন অলস ঘুমচোখে এই গতি দেখছে।
বোসদা বিদিশার পাশাপাশি পা ফেলতে-ফেলতে বললেন, ফাঁকা অফিসে আগে-আগে যেয়ো না। প্রশান্ত চক্রবর্তী ওত পেতে বসে আছে।
বিদিশা হেসে বলল, যাঃ, কী যে বলেন! আমাদের চক্রবর্তীসাহেব অতটা ডেঞ্জারাস নন। যাট পেরোনো রোগা-ভোগা মানুষ, দাঁত-টাত নেই, কামড়াবে কেমন করে!
মাড়ি তো আছে! সুযোগ পেলে ওই মাড়ি দিয়েই কিড়মিড় করবে।
বোসদার কথায় বিদিশা জোরে হেসে ফেলল।
প্রথম-প্রথম এসব পুরুষালি রসিকতায় অস্বস্তি পেত বিদিশা। কিন্তু পরে এই ব্যাপারটাকে ও মানিয়ে নিতে পেরেছে। তা ছাড়া ওর অফিস কলিগরা বেশিরভাগই ভীষণ ভালো। একে অপরের সুখে-দুঃখে অংশ নেয়। কারও সম্পর্কে অহেতুক কোনও কৌতূহল নেই।
বিদিশা যখন অফিস বিল্ডিং-এ ঢুকল তখন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ও আর বোসদা গ্রাউন্ড ফ্লোরের লিফটের কাছে লাইন দিয়ে দাঁড়াল। দু-চারটে চেনামুখের সঙ্গে চোখাচোখি হচ্ছিল বিদিশার। ও সৌজন্যের হাসি হাসল।
আশেপাশের নানান কথাবার্তা কানে আসছিল। কেউ অফিসের সমস্যার কথা বলছে, কেউ বলছে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সমস্যার কথা, কেউ বা পরিবারের সঙ্গে কথা কাটাকাটির কারণ বিশ্লেষণ করছে।
বিদিশার মাথায় রণজয়ের ভাবনাটা আবার ফিরে এল।
আজ মঙ্গলবার। রণজয় বিদিশাকে বাড়িতে ফোন করতে শুরু করেছে রবিবার থেকে। এ পর্যন্ত মোট চারবার ফোন করেছে ও। আর চারবারই একইরকম কথাবার্তা বলেছে। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে, তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারছি না ইত্যাদি।
কথাগুলো শুনে বিদিশার কষ্ট হয়। প্রথম পরিচয়ের দিনটা মনে পড়ে, মনে পড়ে ফটো তোলার কথা। আবার অন্য অনেক ঘটনাও মনে পড়ে। দুঃস্বপ্নের স্মৃতির ভারে স্বপ্নের স্মৃতি চাপা পড়ে যায়।
