কিন্তু বিদিশা কেমন করে মাকে বলবে, মা, ওই লোকটার সঙ্গে দুটো বছর আমি ঘর করেছি, তুমি করোনি। ওর ভেতরে এমন কতকগুলো গোলমাল আছে যা কখনও ঠিক হবে না। তুমি কি আমার বাঁ-গালের কাটা দাগটার কথা ভুলে গেলে!
বিদিশা ছোট্ট করে বলল, আমি বেরোচ্ছি। ফিরতে একটু দেরি হলে চিন্তা কোরো না। দুপুরে খাওয়ার আগে বাবাকে মনে করে ডাইজিনটা দু-চামচ খাইয়ে দিয়ো।
ও যখন দরজা খুলে বেরোচ্ছে তখন পিছন থেকে শোনা গেল বাপ্পার চিৎকার, দিদি, আমার জন্যে আজ একটা ক্যাডবেরি নিয়ে আসবি।
আচ্ছা, নিয়ে আসব।
বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে সদর দরজা টেনে দিল বিদিশা। পালিশ করা ভারী কাঠের দরজা ক্লিক শব্দ করে অটোমেটিক লক হয়ে গেল।
ছোট্ট মোজেইক করা বারান্দায় শেষে দু-ধাপ সিঁড়ি। তারপর খানিকটা জায়গা জুড়ে শান বাঁধানো চাতাল। তার প্রান্তে, পাঁচিলের কিনারা ঘেঁষে, লম্বা মাটির ফালিতে সবুজের বাগান। রিটায়ার করার পর বাবাকে এই নেশায় পেয়েছে। সবসময় এই গাছ নিয়ে পড়ে আছেন। একা-একা কথা বলেন গাছের সঙ্গে। আপনমনে মাথা নাড়েন, বিড়বিড় করেন।
বাবা সারাটা জীবন কলকাতা করপোরেশনে ঘুষ না নিয়ে চাকরি করেছেন। ওদের নিয়ে পাইকপাড়া অঞ্চলে কী কষ্ট করেই না থাকতেন! বিদিশা শুনেছে, বিয়ের আগে মা রমলা গালর্স হাই স্কুলে অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়াতেন। বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দেন বাবার কথায়। কিন্তু পড়ানোর অভ্যেস ছাড়তে বাবা মানা করেননি। তাই বাড়িতে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত পড়াতেন মা।
সল্ট লেকের জমি লটারি হওয়ার সময় সেই কোন যুগে বাবা একটুকরো জমি পেয়েছিলেন। তারপর, প্রায় পঁচিশ বছর পর, সেখানে এই ছোট্ট একতলা বাড়ি তৈরি করেছেন। বাবা-মায়ের তিলতিল কষ্ট দিয়ে গড়ে তোলা এই বাড়ি।
তাই বিদিশার আবদার ছিল, বাবা-মায়ের নামেই হোক বাড়ির নাম। অনেক লড়াইয়ের পর জিতেছিল ও।
সদরের গ্রিলের দরজার দিকে এগোতে এগোতে বিদিশা দেখতে পেল, শোওয়ার ঘরের লাগোয়া গ্রিল-ঘেরা বারান্দায় বসে বাবা খবরের কাগজ পড়ছেন। লম্বা তামাটে কাঠামো। মুখে বয়েসের ভজ, চোখে হাই-পাওয়ার চশমা। প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় মানুষটা ঘুম থেকে ওঠে, আর রাতে শুয়ে পড়ে নটার মধ্যে। আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ।
বিদিশা ডেকে বলল, বাবা, আমি বেরোচ্ছি।
মুখের সামনে থেকে খবরের কাগজের আড়াল সরিয়ে তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসলেন। সে-হাসির অর্থ বোধহয়, আমার জোয়াল টানার পালা শেষ, এবার তোর পালা।
লোহার গেট পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল বিদিশা। একবার পিছন ফিরে দেখল। সদর দরজায় এক পাশে পাথরের ফলকে লেখা বাড়ির নাম : অরুণা-সুধাময়। ছোট্ট সাদা বাড়িটা যেন বাড়ির মানুষগুলোর মতোই সাদাসিধে। এরকম সাদাসিধে জীবনই চেয়েছিল বিদিশা। কিন্তু ওর বিয়েটা গোলমাল হয়ে গিয়ে সবকিছুই কেমন গোলমাল হয়ে গেল।
অথচ বিয়ের আগে ও পাঁচ বছর চুটিয়ে প্রেম করেছিল রণজয়ের সঙ্গে।
ওর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল দক্ষিণ কলকাতার এক বিয়েবাড়িতে। আঠারো বছর বয়েসেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল কল্পিতা বিদিশার স্কুলের বন্ধু। বরযাত্রীরা এসেছিল দুর্গাপুর থেকে। সবাই মিলে বেশ হইহুল্লোড় করছিল। তারই মধ্যে রণজয়কে লক্ষ করেছিল বিদিশা। ফরসা রোগা চেহারা। মুখে কেমন যেন মেয়েলি ভাব। চোখে চশমা। চোখ দুটো বেশ গভীর আর মিষ্টি।
হাতে একটা ক্যামেরা নিয়ে চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে ছিল রণজয়। মাঝে-মাঝে নতুন বউকে তাক করে শাটার টিপছিল।
বরযাত্রী দু-চারজন যুবক বিদিশার সঙ্গে গল্প জুড়েছিল। দুর্গাপুর যে কত ভালো জায়গা সে কথা সবিস্তারে বলছিল। বিদিশা সেই বয়েসেই বেশ বুঝে গিয়েছিল ওকে ঘিরে পুরুষদের কিছু সমস্যা হয়। তাই ও সতর্কভাবে সৌজন্য বজায় রেখে টুকটাক কথা বলছিল।
হঠাৎই তাদের একজন বিদিশাকে বলল, ম্যাডাম, আমাদের সঙ্গে একটা ছবি তুলুন।
সঙ্গে-সঙ্গে আর একজন : এই রনো, আমাদের দিকে তাক করে কটা ফিলিম খরচ করো, বস্।
রণজয় ইতস্তত করে জবাব দিয়েছিল, উনি এখনও ফটো তোলার পারমিশান দেননি।
তখন কে একজন বলে উঠল, রনোটা বড্ড বেরসিক। সবসময় নীতিশিক্ষা ফলায়।
আগের জন্মে ও পাদরি ছিল।
উঁহু, বেচারা নারীজাতিকে শ্রদ্ধা করে।
বিদিশা অস্বস্তি পাচ্ছিল। অথচ রণজয় বেশ স্মার্টভাবে ওর কাছে এগিয়ে এসে বলল, আজেবাজে কথায় কান দেবেন না। শুধু বলুন, ফটো তুলতে আপনার আপত্তি নেই তো?
বিদিশা বলেছিল, তুলুন–।
রণজয় নরম গলায় আলতো করে বলল, একটা সবার সঙ্গে..আর একটা একা।
ফটো তোলার পর রণজয় বিদিশার ঠিকানা চেয়েছিল। বলেছিল, ফটোর প্রিন্ট ডাকে পাঠিয়ে দেবে। কয়েক সেকেন্ড দোটানার পর ঠিকানা দিয়েছিল বিদিশা।
এমন সময় কনেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল ছাদনাতলায়। রণজয় ফটো তোলা নিয়ে কীসব কথা বলছিল গুনগুন করে। আবার মাঝে-মাঝে হঠাৎই চুপ করে যাচ্ছিল। দেখে কেমন যেন অসহায় বলে মনে হচ্ছিল।
একটু পরে ভিড়ের মধ্যে কেমন যেন হারিয়ে গিয়েছিল রণজয়।
দিন পনেরো পর বিদিশার নামে একটা খাম এসেছিল পাইকপাড়ার বাড়িতে। দুটো ফটোর দু কপি করে পোস্টকার্ড মাপের প্রিন্ট। সঙ্গে একটা চিরকুট। তাতে লেখা : খুব ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিজের জন্যে কোনও প্রিন্ট রাখিনি। বিশ্বাস করুন। ফটো কেমন লাগল এক লাইন লিখে জানাবেন?
