না, আমি আছি! হীরার ডাক মনে পড়ে গেল : অমিতদা!
আমার জীবনে সবই ফটো আর ফুলের মালা। কিন্তু হীরা ফটো হয়ে যাক আমি চাই না।
ঠিক তখনই গুলির শব্দ পেলাম। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, তাই ঠিকমতো ঠাহর করতে পারলাম না কে গুলি করল। তবে কোমরের কাছে একটা ধাক্কা টের পেলাম। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুটোর মধ্যে একজনের হাতে কী যেন একটা রয়েছে।
আমার ডান হাতের জোর কমে আসছিল। এরপর আর শটগানের ট্রিগার টিপতে পারব কি না কে জানে!
সুতরাং ট্রিগার টিপে দিলাম। বিশ্রী শব্দ হল। রক্তে আমার ডান হাতের মুঠো ভিজে গেল। আমার সামনের চেয়ারটায় একটা সাপ বসে আছে, কিন্তু তার ফণা নেই, প্লাটিনামের বিষদাঁতও আর নেই। সব ধ্বংস হয়ে গেছে।
হীরার আর কোনও ভয় নেই।
সুমনের গান কানে বাজছে : প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই…কিন্তু কাকে চাই এখনও জানি না। মৃত্যুর চেয়ে বড় আত্মীয় আর কে আছে!
শুধু একটাই তৃপ্তি–আমার মতো অন্ধকার ঘরে বসে চাঁদের আলো কোলে নিয়ে হীরাকে কখনও এ-গান শুনতে হবে না।
পায়ের শব্দ নেই
বিদিশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজের সাজগোজ দেখে নিচ্ছিল। আয়না মিথ্যে কথা বলে না। তাই সামনের মেয়েটাকে রীতিমতো সুন্দরী বলে মনে হচ্ছিল বিদিশার। বিধাতাপুরুষ যখন রোজকার দমবন্ধ করা কাজের রুটিন থেকে ছুটি নিয়ে স্বর্গীয় কোনও জায়গায় আলস্যে অবসর যাপন করছিলেন, তখন বেশ ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে বিদিশাকে তৈরি করেছেন তিনি।
নিটোল ফরসা মুখ, স্পষ্ট ভুরু, মায়াজড়ানো টানা-টানা চোখ, গোলাপি ঠোঁট, হাসলে এক গালে টোল পড়ে। ওর মুখের দিকে একবার তাকালে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন! কত পুরুষ যে ওর সঙ্গে নানান ছলছুতোয় আলাপ জমাতে চায়।
বিদিশার গাঢ় নীল শাড়িতে সূক্ষ্ম জরির কাজ। গত বছর পুজোর সময় মা কিনে দিয়েছিলেন কলেজ স্ট্রিটের ইন্ডিয়ান সিল্ক হাউস থেকে। বিদিশাও সঙ্গে গিয়েছিল। এত দামি শাড়ি কিনতে ওর মন চায়নি। কিন্তু মা জোর করে কিনে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তোর সাজগোজের সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি–।
ছাব্বিশ বছর বয়েসে কি কারও সাজগোজের বয়েস ফুরিয়ে যায়? কিন্তু বিদিশার ভেতরে সবসময়েই একটা অস্থির ঝড় মাথা খুঁড়ে মরতে থাকে।
মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে তেরছা চোখে আয়নার দিকে তাকাল বিদিশা। কোঁকড়া কালো চুলের ঢেউ ছড়িয়ে পড়তে চাইছে পিঠে। চুলের গোড়ায় সাদা সিল্কের সৌন্দর্য বন্ধনী। চুলের ঢঙ বিদিশার পছন্দ হল। আর ঠিক তখনই ওর চোখ গেল বাঁ গালে কানের কাছাকাছি জায়গায়। ইঞ্চিদুয়েক লম্বা একটা কাটা দাগ। রণজয়ের ভালোবাসার চিহ্ন। সেই রাতটার কথা বিদিশা এখনও ভুলতে পারেনি। যেমন ভুলতে পারেনি আরও অনেক দিনরাতের কথা।
সাজগোজ পরখের পালা শেষ করে বিদিশা কবজি উলটে ঘড়ি দেখল ও সওয়া নটা। আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে না বেরোতে পারলে অফিসে দেরি হয়ে যাবে। সল্ট লেকের সি. এ. পি. ক্যাম্প থেকে পার্ক স্ট্রিট–সব মিলিয়ে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো লাগবেই।
আয়নার পাশে দাঁড় করানো একটা সোফায় বিদিশার লম্বা স্ট্র্যাপ দেওয়া হাতব্যাগটা পড়ে ছিল। তার পাশেই বাপ্পার স্কুলের পোশাক। বাপ্পা এখন স্নান করতে বাথরুমে ঢুকেছে। ও দশটায় স্কুলে বেরোয়।
বিদিশা ব্যাগটা তুলে নিয়ে বেরোতে যাবে, মা বসবার ঘরের দরজা থেকে ডাকলেন, মানু, তোর ফোন।
বিদিশা ভুরু কুঁচকে ডাইনিং হলের দিকে এগোল। কে ফোন করল এই অসময়ে?
সবুজ রঙের রিসিভার টেবিলে কাত করে নামানো। সেটা তুলে নিয়ে বিদিশা ছোট্ট করে বলল, হ্যালো–।
মানু, কেমন আছ?
ও-প্রান্তের গলা শোনামাত্রই বিদিশার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। রণজয়।
কেমন আছ, মানু? রণজয় আবার জিগ্যেস করল।
গলা শুকিয়ে কাঠ। অতি কষ্টে জিভে সাড় এনে বিদিশা বলল, ভালো–
বিদিশা রণজয়কে ছেড়ে চলে এসেছে প্রায় নমাস। প্রথম ছমাস রণজয় ওর সঙ্গে যোগাযোগের কোনও চেষ্টা করেনি। তারপর একদিন ফোন করে বাপির সঙ্গে কথা বলে, মায়ের কথা বলে। তবে সে-সব কথাবার্তাই ছিল লিগাল সেপারেশনের ব্যাপার নিয়ে।
তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে, মানু। রণজয় বলল।
দম বন্ধ করে বিদিশা জিগ্যেস করল, কী কথা?
আমি একেবারে বদলে গেছি। তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারছি না। রাতগুলো আমাকে হাঁ করে গিলতে আসে। শেষ দিকে রণজয়ের গলা ধরে এল।
বিদিশার ভেতরে একটা কষ্ট সবে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। ও চোয়াল শক্ত করে সেটাকে চেপে সাধারণ গলায় বলল, আমার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। তুমি পরে ফোন কোরো।
বিদিশা, প্লিজ। আমার কথাটা শোনো একবার–।
সরি, রণজয়। সত্যি ভীষণ দেরি হয়ে গেছে।
রিসিভার নামিয়ে রাখল বিদিশা।
মা তখনও বসবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। বিদিশা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মা পিছন থেকে জিগ্যেস করলেন, রণজয় কী বলল?
বিদিশা দায়সারাভাবে জবাব দিল, তেমন কিছু না।
তুই একটু ভেবে দ্যাখ না, যদি…।
বিদিশা ঘুরে তাকাল মায়ের দিকে। মায়ের দু-চোখে অনুনয়, প্রত্যাশা। মা এখনও ভাবে, রণজয়ের সঙ্গে ওর বিয়েটা জোড়া দেওয়া সম্ভব। দু-বছরে ওদের সম্পর্কে এমন কোনও ফাটল ধরতে পারে না যা সারিয়ে নেওয়া যায় না।
