গল্প শেষ করে আমি বললাম, হীরা আমার কাছে আছে। আপনার পাঠানো কালো অ্যামবাসাডরের ড্রাইভারকে পাহারা দিচ্ছে। সে বেচারা এখনও অজ্ঞান হয়ে আছে, তাই ওর নামটা আপনাকে বলতে পারছি না বলে দুঃখিত।
চুনি–চুনি মারা গেছে। খুদে ওকে খুন করেছে! ভাঙা গলায় আর্তনাদ করলেন শরদিন্দু ও কিন্তু কেন? কেন ও একাজ করল?
আমি আর থাকতে পারলাম না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলাম কয়েকবার। হেসে বললাম, উত্তমকুমারের ছেড়ে যাওয়া জায়গাটা এখনও খালি আছে, মিস্টার মিত্র। আপনাকে পেলে বাংলা ফিল্মের বড় উপকার হত।
শরদিন্দু সোজা হয়ে বসলেন। কালো কপালে চন্দনের টিপ কাঁপছে। মুখের চেহারা এখন একেবারে অন্যরকম। চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, আপনি কী বলতে চাইছেন স্পষ্ট করে বলুন।
আমি চেয়ার সরিয়ে নজর মহম্মদকে পাশ কাটিয়ে খানিকটা দূরে সরে এলাম। কিন্তু চোখের সতর্ক দৃষ্টি সবসময়েই শরদিন্দু মিত্র এবং নজর মহম্মদের দিকে।
কিছুটা সময় নিয়ে বললাম, আপনার ছকটা ছিল এইরকম। হীরা ও চুনিকে খতম করা, তারপর সেই খুনের দায়টা আমার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া। কারণ, আমি এককালের পুলিশের লোক হলেও এখন তাদের খুব পছন্দের লোক নই। আসলে আপনি ভাবতেই পারেননি এতগুলো ধাক্কা সামলে আমি হীরাকে সহি-সলামত ফিরিয়ে নিয়ে আসব। আপনি জনার্দন সামন্তকে লাগিয়েছিলেন। সাদা মারুতি লাগিয়েছেন। কালো অ্যামবাসাডরে দুজনকে পাঠিয়েছেন। আর সবার সেরা, খুদেকে ডাবল এজেন্ট তৈরি করে পাঠিয়েছেন চুনি ব্যানার্জিকে বোকা বানানোর জন্যে। চুনি বেচারা ভেবেছে, খুদে ওর হয়ে স্পাইয়ের কাজ করছে। আসলে ব্যাপারটা ছিল ঠিক উলটো। আমি একটু থেমে কাঁধ কঁকালাম ও আপনার আর কী দোষ! আপনি কী করে জানবেন, অমিতাভ শিকদার সহজে খতম হয় না! এই খতমের খেলায় আমি পুরোনো পাপী। তাই আমি বেঁচে ফিরে এসেছি, হীরা বেঁচে ফিরে এসেছে। আপনার পোষা কোনও জনার্দন বা মধুসূদন আমাদের ছুঁতে পারেনি–।
হীরা–আমার মেয়ে হীরাকে আমি মারতে চাইব? একথা আপনি বিশ্বাস করেন, মিস্টার শিকদার!
হ্যাঁ, করি। কারণ হীরা যে আপনার মেয়ে নয়!
শঙ্খচূড় যেন ছোবল বসাল শরদিন্দুর কপালে। মুখ ফ্যাকাসে রক্তশূন্য হয়ে গেল চোখের পলকে। আর নজর মহম্মদের হাত ঝলসে উঠল শূন্যে।
নজর মহম্মদ আমাকে চেনে না, তাই বোকার মতো এ কাজ করতে গেল। আমি শরীরটাকে আধ পাক ঘুরিয়ে ভয়ংকর এক লাথি কলাম ওর শূন্যে তোলা হাতের বগলের নীচে। ওর ছিপছিপে দেহটা টাল খেয়ে পড়ল শরদিন্দুর টেবিলে। লিকলিকে ছুরিটা হাত থেকে খসে পড়ে গেল মেঝেতে। আমি ঝটিতি নজরের কাছে চলে গেলাম। বাঁ হাতে চেপে ধরলাম ওর চুলের মুঠি। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে ও ডান হাতটা চালিয়ে দিল আমার পাঁজরে।
একটা ধাক্কা আর জ্বালা আমাকে শেষ করে দিল যেন। নজর কোথা থেকে একটা দ্বিতীয় ছুরি বের করে বিধিয়ে দিয়েছে আমার পাঁজরে।
ক্ষণিকের জন্যে আমার দেহ স্থির হল। আর তার পরই টেবিল থেকে ইস্পাতের পেপারওয়েট তুলে নিয়ে আমি নৃশংস আক্রোশে বসিয়ে দিয়েছি নজরের রগের ওপরে–একবার, দুবার।
নজর মহম্মদের শরীর অবশ হয়ে গেল। আমি কোনওরকমে ওর চিবুকের নীচে হাত দিয়ে ওর মাথা মুচড়ে দিলাম। একটা শব্দ হল। কী ভাঙল কে জানে! নজর মহম্মদ এবার টেবিল থেকে পড়ে গেল নীচে। বোধহয় আল্লার প্রিয় হয়ে গেল।
না, শরদিন্দু মিত্র এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেননি। যখনই দেখেছেন লড়াইয়ে পাল্লা আমার দিকে ঝুঁকে পড়েছে, তখনই হয়তো কোনও কোনো বিপদ সংকেত বাজিয়ে দিয়েছেন। আর দশ সেকেন্ডের মধ্যেই ঘরে হাজির হয়ে গেছে দুজন সাকরেদ।
ওই দশ সেকেন্ড আমিও বসে থাকিনি। কোমর থেকে নলকাটা শটগানটা বের করে আহত শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেছি শরদিন্দুর কাছে। ওঁর চর্বিঝোলা গলকম্বলে শটগান চেপে ধরে বলেছি পুলিশে টেলিফোন করতে।
ডায়াল করুন–ওয়ান জিরো জিরো!
আমার রক্তে ভেজা শরীর আর যন্ত্রণায় ভাঙাচোরা মুখ দেখে প্রতিবাদের বিশেষ ভরসা পাননি শরদিন্দু। ডায়াল করেছেন। তারপর আমারই কথামতো নিজের ডেরার ঠিকানা দিয়ে পুলিশকে আসতে বলেছেন।
শরদিন্দু ফোন রেখে দেবার পর খেয়াল করেছি, ওঁর সাকরেদ দুজন দরজার কাছে ফ্রিজ শট হয়ে আছে। পুলিশ না আসা পর্যন্ত ওদের ফ্রিজ শট হয়েই থাকতে হবে।
হীরা আপনার মেয়ে নয়। আমি নীচু গলায় বললাম শরদিন্দুকে। আমার শরীরের বাঁ দিকটা ক্রমেই অসাড় হয়ে আসছে। জানি, ছুরিটা টেনে বের করে নিলে যন্ত্রণা কমবে। কিন্তু তারপর যে-রক্তস্রোত শুরু হবে তাকে রুখবে কে!
আপনি হীরার সম্পর্কের কাকা। ছোটবেলায় হীরা অনাথ হয়। আপনি ওকে মানুষ করেন। আপনাকে ও বাবা বলে জানে। এই ব্যাবসা, কারখানা, মিত্রভিলা–কোনও সম্পত্তিই আপনার নয়। সব ছিল আপনার দাদার। কিন্তু তাঁর উইল ছিল। তাতে বলা ছিল, হীরা সাবালিকা হলে বা বিয়ে করলে সবকিছু ওর হয়ে যাবে। আপনার তখন কিছুই থাকবে না। হীরা এসব খবর কিছুই জানত না। এসব খবর জানতে পেরেছিল চুনি ব্যানার্জি। মারা যাবার আগে ও হীরাকে তার কিছু কিছু বলে গেছে। বলে গেছে সেইসব কাগজপত্রের হদিস।
একটু থেমে দম নিয়ে আমি বললাম, সারা জীবনে আপনি কম খারাপ কাজ করেননি। এমনকি নিজের বউকেও পুড়িয়ে মেরেছেন। আর কাল মারতে চেয়েছেন ফুলের মতো একটা মেয়েকে–যে আপনাকে গত ষোলো-সতেরো বছর ধরে বাপি বলে ডেকেছে। আমার বাড়িতে বসে হীরা এখন কাঁদছে। ওর যে আর কেউ নেই–মা-বাবা-ভাই-বোন কেউ নেই।
