হীরা জীবনে কখনও একাজ করেনি। সুন্দরীদের এ-কাজ মানায় না। কিন্তু উপায় নেই। এখন শটগানের ট্যাবলেট ছাড়া আর কোনও ওষুধ আমাদের হাতে নেই।
হীরা ভয়েভয়ে বলল, যদি মরে যায়?
আমি ওর কথার জবাব না দিয়ে বললাম, দশমিনিট হতে আর দু-মিনিট বাকি আছে।
সামনের সিট থেকে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনটা তুলে নিলাম। একছুটে চলে গেলাম অ্যামবাসাডরের কাছে। নীচু হয়ে পেট্রল ট্যাঙ্ক লক্ষ করে ফায়ার করলাম পরপর দুবার। সঙ্গে-সঙ্গে আগুন জ্বলে গেল।
গাড়িতে ফিরে এসে তাড়াহুড়ো করে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে হীরার দিকে তাকিয়ে দেখি আগুনের আলোয় ওর সুন্দর মুখে এক মায়াময় আভা। কিন্তু চোখে ওর প্রতিজ্ঞা।
রাতের বাতাস কেটে হু-হু করে ছুটে চলল আমার গাড়ি। আজ রাতে হীরা আর ওই অজ্ঞান অথবা মৃত লোকটা আমার বাড়িতেই থাকবে। আমি ওদের পাহারা দেব সারারাত। সারারাত বাজবে নীচু স্বরের গান : প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই…।
আমি আবার দেখলাম হীরাকে।
অমিতদা!
শুধু ফটোয় ঘেরা আমার জীবন। হীরা, তুই যেন ফটো হয়ে যাস না। তোকে আমি কিছুতেই ফটো হয়ে যেতে দেব না।
.
ঘরটা মাপে বিশাল। এ-প্রান্তে দাঁড়িয়ে ও-প্রান্তের মানুষকে বোধহয় ঝাপসা দেখায়। কারণ, ঘরের দূরতম কোণে প্রকাণ্ড সেক্রেটারিয়্যাট টেবিল সামনে রেখে যে-মানুষটি বসে আছেন তাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে তাকে চিনে নিতে কোনও অসুবিধে হল না : শরদিন্দু মিত্র।
আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল নজর মহম্মদ। পরনে সাদা ধবধবে পাজামা পাঞ্জাবি। চুল দাড়ি অভিজাত নবাবের মতো পরিপাটি।
শরদিন্দু হাসলেন। সেই সাপের মতো হাসি। ঠান্ডা হাসি। উনি বোধহয় অন্য কোনওভাবে হাসতে পারেন না। ওঁর প্লাটিনামের দাঁত দেখা গেল।
আসুন, মিস্টার শিকদার। হীরা কোথায়, আমার হীরা? উতলা সাপ তার বাচ্চার জন্যে আকুলভাবে প্রশ্ন করছে। মুখে কাল্পনিক বেদনার ছাপ।
হীরা আছে। একটু থেমে আবার বললাম, আমার কাছে আছে।
হীরার কথা মনে পড়ল আমার।
গতকাল রাতে আমরা কেউই ঘুমোতে পারিনি। একটা অচেনা অচেতন আহত মানুষকে সামনে রেখে দিশেহারার মতো বসে থেকেছি আমরা। তারপর হীরা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। আমি কোনও কথা বলিনি। শুধু উঠে গিয়ে টেপরেকর্ডারের সুইচ অন করে দিয়েছি। নিভিয়ে দিয়েছি ঘরের আলো। আর জ্বেলে দিয়েছি অল্প পাওয়ারের রাতের বাতি।
তারপর ফটোগুলোর নীচে জ্বেলে দিয়েছি সুগন্ধী ধূপ। শুরু হয়েছে রাতের পূজা। আমি জানি, আধো-আঁধারেও মা-বাবা-ভাই-বোন আমাকে, হীরাকে, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ভালোবাসছে। ওরা জানে কার ভালোবাসা দরকার।
টেপরেকর্ডারে গান শুরু হয়ে গিয়েছিল । একে একে সব তারা, জেনো নিভে যাবে। একলা আকাশটুকু শুধু পড়ে রবে। তোমার আমার কথা কেউ শুনবে না, আমাদের ফেলে রেখে সব চলে যাবে…।
এই গানটা মায়ের বড় প্রিয় ছিল।
হীরা গান শুনতে-শুনতে কান্না থামাল। ডেকে উঠল, অমিতদা!
আমি চোখ মুছলাম। বললাম, কী?
আমার একটুও ভাল্লাগছে না–।
আমারও না…। কিন্তু তবুও যে বেঁচে থাকতে হয়। আমি যদি বেঁচে না থাকতাম, তা হলে তোমার সঙ্গে দেখা হত না। তুমি যদি বেঁচে থাকে তা হলে তেমন কারও সঙ্গে হয়তো তোমার দেখা হবে। কে বলতে পারে।
হীরা কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবল। তারপর বলল, আমার স্বামীর শেষ কথাগুলো বড় কষ্টের।
আমি সব শুনলাম। সত্যি বড় কষ্টের সেই কথাগুলো। বড় বেদনার।
হীরার কথা ভাবতে-ভাবতেই আমি মিত্র সাহেবের টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলাম। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লাম অবহেলায়।
নজর মহম্মদ আমার পিছনে পিছনে এগিয়ে এসেছে। এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে খুব কাছাকাছি। মিত্ৰসাহেবের কাছ থেকে মাইনে নিলেও ও যেন এখন আমারই দেহরক্ষী।
আমি জিগ্যেস করলাম, খুদে কোথায়?
শরদিন্দু মিত্র উত্তর দিতে কোনও সময় নিলেন না। বললেন, বোধহয় শরীর খারাপ, তাই আসেনি।
আমি হাসলাম। বললাম, আপনি অন্তর্যামী, মিস্টার মিত্র। কাঁধে আর কোমরে গুলি খেয়ে খুদে কাল রাত থেকে হোটেল রিভারভিউর দুশো আঠেরো নম্বর ঘরে পড়ে আছে।
মিত্র সাহেবের মুখে সংশয়ের ছাপ পড়ল। বুঝতে পারছিলেন না আমি সত্যি বলছি, না গপ্পো বলছি। চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করলাম, নজর মহম্মদের হাত চলে গেছে পাজামার পকেটে। তাই ওর দিকে ফিরে বললাম, নজরসাব, আমার ধারণা ছিল খুদের চেয়ে আপনার মাথায় বুদ্ধি বেশি আছে। আপনার ওই পকেট থেকে কী বেরোতে পারে? বড়জোর একটা ছুরি কি পিস্তল–।
নজর! কী হচ্ছে? ধমক দিলেন শরদিন্দু, আমি মিস্টার শিকদারের সঙ্গে কথা বলছি।
নজর মহম্মদ হাসল। পকেট থেকে সেন্ট মাখানো রুমাল বের করল একটা। বলল, রুমাল, সাব। সিরফ রুমাল।
শরদিন্দু আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইলেন, খুদের ব্যাপারটা কি সত্যি?
আমি বললাম, গল্পটা গোড়া থেকে আপনাকে বলি। তা হলে আপনার বুঝতে সুবিধে হবে। আপনি হীরাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে আমাকে ভাড়া করেছিলেন। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, অমিতাভ শিকদারকে ভাড়া করা যায়, কিন্তু কেনা যায় না। কাল সকালে আপনার কাছ থেকে বেরোনোর পর একটা সাদা মারুতি আমার পিছু নেয়…।
এইভাবে প্রায় গোটা গল্পটা শুনিয়ে দিলাম শরদিন্দু মিত্রকে। উনি দুহাতে মাথা ঢেকে যেন ভেঙে পড়লেন।
