অ্যাকসিলারেটরে আমার পা চেপে বসেছিল, কিন্তু তাতেও আশ মিটছে না কিছুতেই । আরও অনেক কিছু আমাকে দলে পিষে নিকেশ করতে হবে। যুদ্ধের দামামায় আঘাত পড়েছে। কেউ ঘা দিয়েছে প্রাণপণে বুকের ভেতরে ও অমিতদা! এক সদ্যবিধবার সিঁথির সিঁদুর কেন মুছে গেল আমাকে জানতে হবে। জানতেই হবে!
রিয়ারভিউ মিরারে অ্যামবাসাডরের একজোড়া চোখ জ্বলছে। দূরত্ব কমে আসছে ধীরে ধীরে। এখন গুলি চালালে আমাদের গায়ে বিধবে কি না জানি না, তবে গাড়ির বডিতে বা কাঁচে লাগতেই পারে।
হীরা কান্না ভাঙা গলায় জিগ্যেস করল, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি, অমিতাদা?
কী জবাব দেব এই নিষ্পাপ মেয়েটাকে! শর্ত অনুযায়ী এখন ওকে নিয়ে যেতে হবে ওর শোকে মুহ্যমান বাবার কাছে। নিতে হবে আমার পারিশ্রমিক। তারপর জানতে হবে জটিল অঙ্কের উত্তর।
আবার গুলির শব্দ। গাড়ির পেছন ও সামনের দুটো কাঁচই ফুটো হয়ে গেল। হীরা চিৎকার করে মাথা নীচু করল। আমি দাঁতে দাঁত চেপে স্টিয়ারিং এদিক-ওদিক করে সাপের মতো এঁকেবেঁকে পথ চলতে লাগলাম।
কিন্তু একটু পরেই সরু পিচের রাস্তায় গাড়িটা পাশাপাশি এসে গেল। দুটো গাড়ি এলোপাতাড়ি চলতে-চলতে ধাক্কা খেল গায়ে-গায়ে। ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সংঘর্ষের শব্দ হল।
হীরা চিৎকার করে উঠল। বসে পড়ল সিটের নীচের অংশে।
আর আমি বাঁ হাতে স্টিয়ারিং ধরে শটগানটা ডান হাতে উঁচিয়ে ধরলাম।
ওই এলোমেলো চলার মধ্যেই দেখতে পেলাম অ্যামবাসাডরের স্টিয়ারিং-এ একটা কালো ছায়া। আর তার পাশেই আর একজন। তার হাতে লম্বা লাঠির মতো কী যেন একটা রয়েছে। বুঝতে অসুবিধে হল না, ওটা প্রকৃতপক্ষে রাইফেলের নল। লোকটা আমাদের গাড়ির দিকেই তাক করার চেষ্টা করছে।
ব্যাপারটা আমার অবাক লাগল। এরা নিশ্চয়ই চুনিলালের দল নয়, শরদিন্দু মিত্রের দল। তাই যদি হয় তা হলে এরা কাকে খতম করতে চাইছে? আমাকে, না হীরাকে? নাকি দুজনকেই? আর কেনই বা খতম করতে চাইছে? কোথাও কি কোনও ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে? নাকি চুনিলালের কথাটাই ঠিক? শরদিন্দু মিত্র কাউকে ছাড়বে না। আমরা সবাই দাবার খুঁটি। আর মিত্র সাহেব দাবা খেলছেন।
কিন্তু মিত্র সাহেব কি জানেন, এখন ওঁর সঙ্গে দাবা খেলছে শয়তানের বাচ্চা অমিতাভ শিকদার?
এতগুলো ভাবনা পলকে খেলে গেল মনের মধ্যে। আর সেই পলকের মধ্যেই চলন্ত গাড়ির দরজা খুলে শটগান ফায়ার করলাম। নিশানায় কোনও গোলমাল ছিল না। তাই রাইফেলওয়ালা ঠিকঠাক করে নল তাক করার আগেই ওর মাথা কিংবা বলা যায় মাথার অবশিষ্ট অংশ ঝুঁকে পড়ল বুকের ওপরে।
অ্যামবাসাডর গাড়িটা পিছলে এগিয়ে যেতে চাইল সামনে। আমি দরজা বন্ধ করে অ্যাকসিলারেটরে চাপ বাড়িয়েছি। দুটো গাড়িতে ধাক্কা লাগল আবার। এবারের ধাক্কাটা বেশ জোরেই। চাকার বিপর্যন্ত শব্দ, হীরার চিৎকার, ধাতুর সংঘর্ষের শব্দ সব মিলিয়ে শব্দের এক ডামাডোল। ঠিক তখনই উলটো দিক থেকে ছুটে আসা ট্রাকটা আমি দেখতে পেলাম।
সরু রাস্তায় বিশেষ জায়গা ছিল না। অতি কষ্টে আমি গাড়িটাকে বাঁ দিকে কাদার ওপরে নিয়ে গেলাম। জায়গাটা অন্ধকার ঢালু নালার মতো। রাস্তার কোনও বাতি জুলছিল না? হয় খারাপ, নয় তো লোডশেডিং। তাই আন্দাজটা জুতসই না হওয়ায় গাড়িটা টাল খেয়ে গেল।
অ্যামবাসাডরটা আমার সামনে চলে গিয়েছিল। তাই বাঁ দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করার আগেই ট্রাকের সঙ্গে ওটার ধাক্কা লাগল।
মুখোমুখি ধাক্কা নয়। ধাক্কাটা লেগেছে ডানদিকে, হেডলাইটের কাছে। ফলে ছুটন্ত ট্রাকটা নিজেকে সামলে নিয়ে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে গেছে। আর অ্যামবাসাডর গাড়িটা লাটুর মতো ঘুরপাক খেয়ে গেল খানিকটা। তারপর প্রায় উলটোদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
আর দেরি নয়। শটগানে নতুন টোটা ভরে নিয়ে কাত হয়ে থাকা গাড়ি থেকে পড়লাম আমি। হীরাকে বললাম, জায়গা ছেড়ে একদম নড়বে না। তারপর এক ছুটে কালো অ্যামবাসাডরের কাছে।
স্টিয়ারিং-এ বসে থাকা লোকটা বোধহয় মাথায় সামান্য চোট পেয়ে থাকবে। কারণ, মাথায় হাত বোলাচ্ছে। আমি দরজা খোলার জন্যে হাতলে টান দিলাম, কিন্তু খুলল না। ট্রাকের ধাক্কায় ডানদিকের ফেন্ডার তুবড়ে গেছে, দরজাও সামান্য আহত। তাই পাল্লাটা এঁটে বসে গেছে।
আমার হাতে সময় নেই। ফলে শটগান কোমরে গুঁজে হেড হোল্ড প্রয়োগ করলাম। ওর চিবুকের তলায় একটা হাত, আর মাথার পিছনে অন্য হাত। সামান্য মোচড় দিয়ে টান মারতে শুরু করলাম। লোকটা আমার হাত খামচে ধরল। আঁকড়া-আঁকড়ি করতে লাগল। ওর নখ আমার হাতের নুনছাল তুলে দিচ্ছে। বেচারা জানে না, হাতের মোচড় সামান্য বাড়ালেই ও নিচ থেকে সোজা আকাশে চলে যাবে। তাই সেটা একটু জানান দিলাম। ব্যস, ওর সব লড়াই থেমে গেল। ও মাখনের মতো বেরিয়ে এল জানলা দিয়ে।
লোকটাকে আমি পেড়ে ফেললাম রাস্তায়। কোমর থেকে শটগানটা বের করে তার হাতল দিয়ে সারেগামা বাজিয়ে দিলাম ওর মাথায়। তারপর ওকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেলাম আমার গাড়ির কাছে।
আতঙ্ক আর উত্তেজনায় হীরা বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। ওকে বললাম পেছনের দরজা খুলতে। তারপর দুজনে মিলে লোকটাকে তুলে দিলাম পেছনের সিটে। হীরাকে ওর পাশে বসিয়ে শটগানটা ওকে দিলাম। বললাম, ঘড়ি দেখে দশমিনিট অন্তর-অন্তর লোকটার মাথায় শটগানের হাতল দিয়ে মারতে। তা হলে আমি নিশ্চিন্তে বাকি পথ গাড়ি চালাতে পারব।
