হীরাকে সরিয়ে দিয়ে আমি ঝুঁকে পড়লাম চুনির মুখের কাছে। ও কী বলছে শুনতে চাইলাম।
চুনির ফুলে ওঠা ঠোঁট থরথর করে কাঁপছিল। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর বুঝতে পারলাম ওর কথাগুলো : শরদিন্দু মিত্র কাউকে…ছাড়বে না। আমরা সবাই দাবার খুঁটি…সবাই। খুদে এরকমভাবে আমাকে ঠকাবে বুঝতে পারিনি। মিস্টার শিকদার…।
আমি আরও ঝুঁকে পড়লাম চুনির ওপরে।
…হীরাকে দেখবেন…ওকে যেন কেউ কিছু না করে…হীরা…হীরা…।
আমি সরে এলাম। হীরাকে ঠেলে দিলাম ওর স্বামীর দিকে। শেষ কথাগুলো অন্তত ও শুনুক। শেষ কথায় ওরই একমাত্র অধিকার।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে চলে এলাম দরজার কাছে। মন বলে উঠল, সময় নেই। হীরাকে নিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে আমাকে।
খুদের নড়াচড়া থেমে গেছে। তবে খেল খতম ভাবার কোনও কারণ নেই। ওর ক্ষত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে কার্পেটে। হোটেল রিভারভিউর দুটো দামি কার্পেট নষ্ট হল। সুরিন্দার আর খুদে যদি দুশো তিন আর দুশো আঠেরো নম্বরে শহিদ হয় তা হলে এই দুটো ঘর হয়তো বাতিলের খাতায় জমা পড়বে। আর এই হোটেলের নামটা রিভারভিউ থেকে হয়তো মার্ডারভিউ হয়ে যাবে।
হীরার কান্না থামেনি। হঠাৎই কান্নার রেশ জোরালো হয়ে উঠতেই বুঝলাম সব শেষ, এবার এক মিনিট নীরবতা পালন করা দরকার। আমি আর চুনিলাল সেটা করলাম বটে কিন্তু হীরা অবাধ্য হল। ওকে ডেকে বললাম, হীরা, জলদি! আমাদের এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে।
ও উঠতে চাইছিল না। আমি এগিয়ে গিয়ে ওকে টেনে তুললাম। তারপর বিছানার তোশক সরিয়ে চ্যানেল মিউজিকের সুইচগুলো খুঁজে পেলাম। মিউজিকের ভলিয়ুম বাড়িয়ে দিলাম। স্বর্গীয় কিশোরকুমার গাইছিলেন? হমে তুমসে প্যার কিতনা ইয়ে তুম নহি জানতে, মগর জি নহি সকতে তুমহারে বিনা–।
বিছানার চাদরটা তুলে নিয়ে চুনিলালের মৃতদেহ ঢেকে দিলাম। ওঁ শান্তি।
তারপর হীরাকে ডাকলাম, চলে এসো–।
এখন সামনে কোন বিপদ অপেক্ষা করছে কে জানে!
হোটেলের করিডরে কোনও ঝামেলা টের পেলাম না। হীরাকে বলেছি মুখে ওড়না জড়িয়ে নিতে। ও একটুও তর্ক না করে সাদা ওড়নাটা জড়িয়ে নিয়েছে মাথায়। বেশ বউ-বউ লাগছে। আমার ব্রিফকেস পড়ে আছে বিছানার ওপরে। যদি আজকের রাতটা জানে বেঁচে যাই তা হলে কাল ওটা দরকার হবে। আর যদি কপাল খারাপ হয়, তা হলে ব্রিফকেস স্মৃতি হয়ে যাবে।
সতর্কভাবে পা ফেলে নীচে নেমে এলাম। ইচ্ছে করেই এলিভেটর ব্যবহার করিনি। ওই ছোট্ট জায়গায় আমার কেমন অস্বস্তি হয়।
অবশেষে একতলায় হোটেলের লাউঞ্জ। আমি হীরার অনুমতি নিয়ে ওকে সামান্য কাছে টেনে নিয়েছি। লোকে বোধহয় আমাদের নতুন বর-বউ ভাবছে। ভাবুক। যতক্ষণ শ্বাস পড়ছে ততক্ষণ এসব সামান্য ব্যাপার নিয়ে ভাবা উচিত নয়। কে জানে জনার্দন সামন্ত কিংবা সুরিন্দারের মতো কেউ কোথাও ওত পেতে আছে কি না!
কার পার্কের কাছে এসে কাউকে দেখতে পেলাম না। উঁহু, ভুল হল। বরং বলা উচিত, সন্দেহজনক কাউকে দেখতে পেলাম না। সারি-সারি গাড়ি পার্ক করা রয়েছে। কয়েকটা গাড়িতে ড্রাইভাররা স্টিয়ারিং-এ মাথা ঝুঁকিয়ে ঝিমোচ্ছে। শিবনাথ অনেকটা দূরে, হোটেলের সীমানাপ্রাচীরের কাছে দাঁড়িয়ে একটা লোকের সঙ্গে গল্প করছে।
আমি হীরাকে নিয়ে উঠে পড়লাম আমার গাড়িতে। শটগান ও স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন বের করে সিটের ওপর রাখলাম। ইঞ্জিন চালু করে এক ঝটকায় গাড়িটা বের করে নিয়ে কাঁচাচ আওয়াজ তুলে দ্রুত বাঁক নিয়েই গতি বাড়িয়ে দিলাম। সঙ্গে-সঙ্গে লক্ষ করলাম, শিবনাথের সঙ্গে কথায় ব্যস্ত লোকটা দৌড়ে গিয়ে উঠল একটা কালো অ্যামবাসাডর। ও, আমার ধারণা তা হলে ভুল হয়নি। আর একজন জনার্দন সামন্ত তৈরিই ছিল! আমি বাঁ হাতের শক্ত মুঠোয় শটগানের বাঁটটা চেপে ধরলাম। এই বন্দুকটা সকাল থেকে ভুখা দিন কাটাচ্ছে। আর নয়, সময় এসে গেছে। এখন থেকে ভুখ হরতাল বন্ধ।
গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। সামনের রাস্তা গড়িয়ে ছুটে আসছে চাকার তলায় আত্মহত্যা করছে। আমি দুরন্ত গতিতে পৌঁছে গেলাম হোটেলের সিংদরজায়। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরা ভালোমন্দ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার গাড়ি পিছলে বেরিয়ে পড়েছে বাইরের রাস্তায়।
আর তখনই প্রথম গুলির শব্দ শোনা গেল। বোধহয় পিছনের অ্যামবাসাডর থেকে কেউ গুলি ছুঁড়েছে।
হোটেলের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে কয়েকটা বড় বড় গাছ। হোটেলের লনে লাগানো হ্যালোজেন বাতির আলো সেই গাছের ওপরে পড়েছে। গুলির শব্দে পাখিরা চঞ্চল হয়ে গাছের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে এলোমেলো উড়ে বেড়াতে লাগল। হীরা ওর হাত রাখল আমার হাতের ওপরে। স্পষ্ট টের পেলাম, মেয়েটার কোমল হাত কাঁপছে।
এরপর শুরু হল দুরন্ত ছুট। রাতের হুগলি নদী থেকে ছুটে আসা পাগল বাতাস আমাদের শান্ত করতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু হীরার ফেঁপানো কান্না তাতে থামছিল কই?
চোখের সামনে অন্ধকার নির্জন পিচের রাস্তা। কখনও কখনও ছুটে আসা হেডলাইটের আলো। সেই আলোয় হীরার মুখ দেখা যাচ্ছে : কান্নার জলছবি। আর আমার গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দুপাশের ঝোপেঝাড়ে গাছে চকিতের জন্যে যেন ঝলসে উঠছে ফ্ল্যাশ বা।
টায়ারের বাঁক নেওয়ার শব্দ আহত হায়েনার কান্না। আর ইঞ্জিন চিতাবাঘের গর্জন। তারই মধ্যে আবার শব্দ তুলল ফায়ারিং-এর শব্দ। অ্যামবাসাডর গাড়ির অনুসরণকারী অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
