.
টেলিফোন এল মিনিট কুড়ি পরেই। এবং ফোনটা করল হীরা।
চ্যানেল মিউজিক চালিয়ে বিছানায় শুয়ে আয়েস করছিলাম। টেলিফোন ধরার পরই হাত পা কাঁপতে লাগল অদ্ভুতভাবে। কারণ হীরা কথা বলছে অস্বাভাবিক সুরে। একটা ভেজা চড়ুই শীতের রাতে আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছে।
শিগগির আসুন! শিগগির—প্লিজ–।
এই কণ্ঠস্বর যখন ডাকে তখন হিমালয় থেকে কোনও হঠযোগীও ছুটে আসে। সুতরাং আমিও যে হঠকারী হয়ে ছুটে যাব সে আর বেশি কী!
চোখের পলকে তৈরি হয়ে দুশো আঠেরো নম্বরের দরজায় পৌঁছে দেখি দরজা বন্ধ। কলিংবেল টেপামাত্রই দরজা খুলে দিল হীরা। ওর কান্না-ভেজা ভয়ার্ত মুখ আমাকে বিপন্ন করে তুলল। ভয় পাওয়া মুখও এত মিষ্টি।
ঘরে ঢুকেই পায়ের ধাক্কায় দরজা বন্ধ করে দিলাম। আর একইসঙ্গে চোখে পড়ল ঘরের বাঁ দিকের কোণে চুনি আর খুদে ঘোড়া-ঘোড়া খেলছে। চুনি হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে কার্পেটের ওপরে। আর ওর পিঠের দু-দিকে পা রেখে ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে খুদে। খুদের দু-হাতে নীল রঙের নাইলনের দড়ি। দড়ির লাগামটা চুনিলালের গলায় লাগিয়ে খুদে টানছে। চুনির চোখ মুখ টকটকে লাল। মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, হাতে আর সময় নেই।
ওই অবস্থাতেও খুদে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। কিন্তু ওর দড়ির টান এতটুকুও শিথিল হল না।
লক্ষ করলাম, হীরার কপালের একটা পাশ ফুলে উঠেছে। সেখানে রক্তের দাগও রয়েছে। ও আমার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কোনওরকমে বলল, ওকে বাঁচান! প্লিজ!
আমার মাথার মধ্যে অঙ্ক কষার কাজ চলছিল। খুদের ভূমিকাটা আমার মাথার মধ্যে ঠিক পরিষ্কার হচ্ছিল না। ও কার হয়ে কাজ করছে? ওর একটু আগের বেপরোয়া হাসি বলে দিচ্ছে। আমরা একই লোকের হয়ে কাজ করছি। সে লোকটির নাম শরদিন্দু মিত্র। কিন্তু মিত্র সাহেবের কথার সঙ্গে যে এই মুহূর্তের গল্পটা মিলছে না। চুনিকে যদি খতম করারই দরকার ছিল তা হলে আমাকে ডাকা হয়েছে কেন?
হীরা এবার হাউহাউ করে কেঁদে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপরে। বলল, অমিতদা, অমিতদা, ওকে বাঁচান–।
আমার মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে গেল।
ঘরের নরম আলো, হালকা চ্যানেল মিউজিক আর সামনের ওই বীভৎস ঘোড়া-ঘোড়া খেলা আমার বুকের ভেতরে ঝড় তুলেছিল। সেই ঝড়ে যখন বনের গাছপালা উথালপাথাল কাঁপছে তখনই মেয়েটার ওই দাদা ডাক তাতে দাবানল জ্বেলে দিয়েছে।
কে দাদা? কার দাদা? আমার জীবনে কেউ নেই। মা-বাবা-ভাই-বোন–কেউ নেই! সব শালা ফটো হয়ে দেওয়ালে ঝুলছে। আর আমি একা–এক জিন্দা লাশ, মরার চেষ্টা করছি।
অমিতদা!
শয়তান সর্বনাশী মেয়েটা আবার ডাকছে ওই নামে।
অমিতদা!
চোখ ঝাপসা হয়ে এল আমার। কিন্তু ওই অবস্থাতেই স্লো মোশনে শটগানটা বের করে খুদের দিকে তাক করলাম। মাংস চিবিয়ে বলার মতো করে বললাম, ছেড়ে দে।
আমার চোখে-মুখে খুদে কী দেখল কে জানে, ছেড়ে দিল চুনিকে। চুনি ধপ করে পড়ে গেল মেঝেতে। আর হীরা ছুটে গিয়ে কেঁদে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর শরীরের ওপরে।
খুদে অবাক হয়ে আমাকে দেখছিল। তারপর হাসিমুখে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। জিগ্যেস করল, কী হল, বস, খেপে গেলে কেন?
কোনও জবাব না দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে শটগানটা ঘুরিয়ে বসিয়ে দিলাম খুদের নাকের ওপরে। শব্দ হল। ওর ভারী দেহটা যেন পাথরে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। কিন্তু আমি থামলাম না। কানে বাজছে বহুযুগ ধরে না-শোনা অলৌকিক ডাক অমিতদা! সুতরাং দ্বিতীয় আঘাতটা করলাম ওর মাথায়।
কিন্তু খুদে সেটা রুখে দিল। ওর গায়ের জোর আমি টের পেলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আবার হাসল। অথচ ওর নাক ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বলল, এসব কী উলটোপালটা কাজ করছ, বস্? মিত্তিরসাহেব রাগ করবেন।
আমিও হাসলাম। শটগানটা হাত থেকে ফেলে দিলাম মেঝেতে।
আমি জানতাম, এরপর খুদে কী করবে। ও শটগানটা তুলে নেবে মেঝে থেকে। তারপর দাবার চাল উলটে দেবে। ওর মোটা বুদ্ধি ওকে অন্তত এই শিক্ষাই দিয়েছে। আর ও ভুলে গেছে রোজ এক ডজন আর্স দিয়ে আমি ব্রেকফাস্ট খাই।
সুতরাং খুদে যখন শটগানটা কুড়িয়ে নিচ্ছে তখনই আমি পকেট থেকে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনটা বের করে ওর কাঁধে এবং কোমরে গুলি করলাম।
খুদের বেলা আমি কোনও ঝুঁকি নিতে চাইনি। ওর প্রতিবন্ধী জীবনের জন্যে অমিতাভ শিকদারের সমবেদনা রইল।
খুদে যখন টলে পড়ছে তখনই ওকে পা দিয়ে ঠেলে দিয়েছি আমি। আর তৎপর হাতে শটগানটা তুলে নিয়েছি। আমার দু-হাতের দুটো মেশিন খুদের বাকি সাহস কেড়ে নিল। খুদে চেঁচায়নি। জানে, চেঁচালে ওরও বিপদ। তাই ও শুধু গোঙাতে লাগল আর বলতে লাগল, তুমি বাঁচবে না, বস্…।
কোন্ শালা বাঁচতে চায়?আমি ওর মুখে থুতু ছিটিয়ে দিলাম। ঘড়ি দেখলাম। প্রায় সাড়ে আটটা বাজে। রিভারভিউ আমাদের কাছে আর কতক্ষণ নিরাপদ কে জানে!
শটগান ও রিভলভার যথাস্থানে রেখে ছুটে গেলাম হীরা আর চুনির কাছে। চুনির চোখ উলটে গেছে। নাইলন দড়িটা কেটে বসে গেছে গলায়। ওর বিবর্ণ ঠোঁট নড়ছে। কী যেন বলতে চাইছে বিড়বিড় করে।
হীরা কাঁদছিল অঝোরে। বারবার বলছিল, অমিতদা, ওকে হাসপাতালে নিয়ে চলুন– জলদি!
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি, হাসপাতাল এখন কিছু করতে পারবে না। চুনিলাল এখন পাতালের পথে।
