মিস্টার শিকদার, আপনার খবরটাও লোক মারফতই পেয়েছি। আর তখনই একটু ভয় পেলাম। কারণ, আপনার সম্পর্কে কিছু-কিছু আমি জানি। হীরার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ও অবশ্য কিছু জানে না।
আমার সামনে বসে থাকা মেয়েটা অদ্ভুত মিষ্টি গলায় বলে উঠল, কেন, আপনি কি ডেঞ্জারাস লোক?
প্রশ্নটা আমাকেই করা হয়েছে। বোধহয় জীবনে এই প্রথম আমার জিভ আড়ষ্ট হল, নজর হয়ে গেল বিব্রত। কোনওরকমে বলাম, এসব বাজে কথায় কান দিতে নেই।
চুনি বলল, আমার কিছু চ্যালাচামুণ্ডা আছে। তাদের নিয়ে শরদিন্দু মিত্রকে আমি এতদিন কম সাহায্য করিনি। এখন সাহায্যের দরকার হল আমারই। রমেন হালদারের সঙ্গে আমার চেহারা কিছুটা মেলে। ও লম্বা-চওড়ায় আমারই মতো। তাই ওকে আমার মতো করে সাজিয়ে তুলে দিলাম দুশো তিন নম্বর ঘরে। সঙ্গে সুরিন্দার–বন্দুকবাজ সুরিন্দার। আমি জানতাম কেউ না কেউ আসবে আমাকে খতম করতে। এসেছিল। জনার্দন সামন্ত। ওকে রেস্তোরাঁয় দেখামাত্রই আমি চিনতে পেরেছি। তা ছাড়া মাইকেল ডিসুজারু গার্ডেনে গান গায়…।
আমি বাধা দিয়ে বললাম, ছড়া কেটে পায় সুখ, দাড়িগোঁফ এক-মুখ–।
চুনি হাসল। বলল, পরিচয় হয়েছে তা হলে? ওই মাইকেল হল সুরিন্দারের পুরোনো চেনা লোক। মাইকেলের কাছ থেকেও সুরিন্দার জানতে পারে জনার্দন সামন্ত আমার খোঁজখবর করছে। তখন ও জনার্দনকে খতম করার ব্যবস্থা নেয়–।
লাল মারুতির লালুর নাম তা হলে জনার্দন সামন্ত।
জনার্দন হল শরদিন্দু মিত্রের পুরোনো ভাড়াটে গুণ্ডা। অনেকবার ওর নাম শুনেছি। যাই হোক, তারপর আমরা আপনার খবর পাই–যে আপনি রিভারভিউতে এসে উঠেছেন। এরপর তো সবই জানেন–।
আমি গ্লাসের তরলটুকু এক ঢোকে গলায় ঢেলে দিলাম। বললাম, চুনিবাবু, আমরা রীতিমতো ভাগ্যবান যে, এ-পর্যন্ত মাত্র একটাই লাশ পড়েছে–শুধু জনার্দন সামন্ত খরচ হয়েছে। আর সুরিন্দার খরচ হয়েছে আধাআধি। এ-ব্যাপারে আর বডি পড়ুক তা আমি চাই না। আপনি টেলিফোন করে মিত্র সাহেবের সঙ্গে মিটমাট করে নিন। তা হলে আমিও একটা অস্বস্তির হাত থেকে বেঁচে যাই। তখন আমি অন্য ক্লায়েন্ট খুঁজব।
অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল। এইবার কথা বলল হীরা।
মিস্টার শিকদার, আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছি, কিন্তু ও কিছুতেই আমার কথা শুনছে না। আমি বলেছি, বাপি আমাদের ভালো চায়। আমরা ফিরে গেলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সে কথা কে শোনে।
চুনি অধৈর্যভাবে একটা শব্দ করল।
আমি বললাম, কথাটা বোধহয় ঠিক, চুনিবাবু। কারণ, আবার বলছি, আমি নিজের কানে শুনেছি, মিত্র সাহেব আপনাদের আশীর্বাদ করার জন্যে অপেক্ষা করছেন। উনি টেলিফোনে কাকে যেন বলছিলেন।
চুনিলালের চোখ কপালে উঠল। ভুরুর ওপরে ভাঁজ পড়ল। বলল, সত্যি? আসলে আমি একটা এমন ব্যাপার জেনেছি যেটা কাউকে বলতে পারছি না।
কী ব্যাপার? হীরা আকুল হয়ে জানতে চাইল। সুন্দর চোখে তাকাল স্বামীর দিকে।
তোমাকেও বলা যাবে না। গম্ভীরভাবে জবাব দিল চুনি। তারপর বউকে সাফাই দেবার সুরে বলল, কিছু মনে কোরো না। সময় হলেই সব বলব।
এবারে লাখ টাকার প্রশ্নটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিল চুনিলাল ও মিস্টার শিকদার, এখন সবকিছুই আপনার হাতে। বলুন, এখন কী করবেন?
আমার মনে এক অদ্ভুত তোলপাড় চলছিল। কী করব এখন আমি?
এমন সময় দরজায় নক করল কেউ। তারপর কলিংবেল টিপল।
তড়াক করে উঠে দাঁড়াল চুনিলাল। বলল, কে এল? এখন তো কারও আসার কথা নয়!
আমি শটগানটা ঝটিতি বের করে নিলাম। দৌড়ে গিয়ে দরজার পাশে পজিশন নিলাম। চুনিলালও পকেটে হাত ঢোকাল। হীরাকে ইশারা করল বাথরুমে গিয়ে ঢুকতে। তারপর এগিয়ে গেল দরজার কাছে। চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, কে? কী চাই?
দরজার ওপিঠ থেকে উত্তর এল? আমি, খুদে–।
আমার মাথার ভেতরে যুক্তি-বুদ্ধির একটা ঘুড়ি লাট খেতে শুরু করল। খুদে? এখানে?
চুনিলাল হাসল। আমার দিকে ফিরে বলল, বলেছিলাম না, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! খুদেই আমাকে সব খবর দেয়। ও মিত্র সাহেবের লোক।
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, জানি।
দরজা খুলে দিল চুনি। এবং খুদে ঢুকে পড়ল ঘরে। চাপা গলায় বলল, খবর আছে, চুনিবাবু–বলেই আমার দিকে তাকাল। ওর চোখের নজর দেখেই বোঝা গেল, সকালের থাপ্পড়টা ও ভোলেনি। না ভোলাটাই স্বাভাবিক। আমার শিক্ষা কেউ সহজে ভোলে না।
শটগানটা আমি লুকিয়ে ফেললাম আবার। লক্ষ করলাম, খুদের চোখ ঘরটাকে জরিপ করছে। বোধহয় হীরাকে খুঁজছে।
নজর মহম্মদের কাছ থেকে হীরা ও চুনির গল্প শোনার সময় আমার কেমন যেন খটকা লেগেছিল। এখন চুনিলালের কথা শুনে আর খুদেকে এখানে দেখে সেই খটকা আরও জোরদার হল।
খুদে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। ওকে বসতে বলে চুনি আমার কাছে সরে এল। বলল চাপা গলায়, মিস্টার শিকদার, এখন আপনি ভরসা। আমি জানি মিত্র সাহেব এখন আমার ওপরে যেভাবে খুশি যেমন খুশি আক্রমণ চালাবেন। হীরার জন্যে উনি ভাবেন, আমার জন্যে না। আপনি একটু পরে আবার আসবেন। কথা আছে।
আমি বললাম, আপনি কথা বলে নিন। আমি দুশো সাত নম্বরে আমার ঘরে আছি। কথা শেষ হয়ে গেলেই আমাকে একটা ফোন করে দেবেন–।
একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। হীরার কথাটা কানে ভাসছিল : কেন, আপনি কি ডেঞ্জারাস লোক?
এ-প্রশ্নের উত্তর আমি নিজেই জানি না।
