আমি বললাম, হ্যাঁ। একটু চুপ করে থেকে যোগ করলাম, হীরাকে আমি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। আর আপনিও আমার সঙ্গে গেলে ভালো হয়। মিত্র সাহেব আপনাদের দুজনকে আশীর্বাদ করার জন্যে অপেক্ষা করছেন।
অবাক চোখে আমার দিকে ফিরে তাকাল চুনি। বলল, তাই? তারপর করিডরে দাঁড়িয়েই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। একটা মেয়ে বীভৎস সেজেগুজে আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হাসির শব্দে চোখ ফিরিয়ে দেখল আমাদের দিকে।
আমি বিব্রতভাবে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, মেয়েটা আমাকে লক্ষ্য করে বাঁকা হেসে। চোখ মারল।
নাঃ, হোটেল রিভারভিউর জবাব নেই!
.
চুনি ব্যানার্জির কাছ থেকে গোটা গল্পটা শুনলাম।
দুশো আঠেরোর সঙ্গে দুশো তিনের একমাত্র মাপ ছাড়া সাজসজ্জায় আর কোনও তফাত নেই। ভেড়ার লোমের মতো হালকা বাদামি কার্পেটে মেঝে ঢাকা। ঘরে তিনরকম আলো। তার মধ্যে নৈশবাতির চেহারাটা টেডি বিয়ারের মতো। আসবাবপত্র সবই অভিজাত। সুদৃশ্য ড্রেসিং টেবিল, তার মাথায় প্রসাধন বাতি। চওড়া আধুনিক খাট, তার ওপরে পরিপাটি বিছানা। বিছানার চাদর, দেওয়ালের ডিসটেম্পার ও কার্পেট–এই তিনের রঙে মানানসই মিল।
ঘরে একটিমাত্র ছোট মাপের ফ্লুওরেসেন্ট বাতি জ্বলছিল। সেই কারণেই একটা নিষ্প্রভ ভাব ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। তারই মধ্যে নীচু লয়ে শোনা যাচ্ছে চ্যানেল মিউজিক।
দুটো সোফায় মুখোমুখি বসলাম আমরা। সামনে ছোট টেবিল। টেবিলে গ্লাস। গ্লাসে হুইস্কি। সেই হুইস্কি সঞ্জীবনী ঝরনা হয়ে আমার মরুভূমি-গলা বেয়ে নামছে। কেমন যেন এক স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে বসে আমি চুনি ব্যানার্জির কথা শুনছিলাম।
ঘরে হীরা নেই। সেটা আমাকে অবাক করেছে। কিন্তু এ-বিষয়ে কোনও প্রশ্ন করিনি। সময়মতো করা যাবে।
চুনি ব্যানার্জি পানীয় নেয়নি। তার বদলে সিগারেট ধরিয়েছে। বোধহয় মাথা ঠিক রাখতে চায়–অন্তত এরকম বিপদের সময়ে।
মিস্টার শিকদার, আপনি হয়তো আমার গল্পের অনেকটাই জানেন– চুনিলাল বলতে শুরু করল।
আমি হীরাকে তখনও খুঁজে চলেছি। নাক টানছি বাতাসে যদি খুঁজে পাই পারফিউম পাউডার কিংবা শ্যাম্পুর গন্ধ।
আমি লোকটা খুব সুবিধের নই– ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চুনিলাল বলল, তবে আপনার মতো অতটা এলেমদার নয়। হীরাকে আমি ভালোবাসি। অনেকদিন ধরেই ভালোবাসি। তাই শেষ পর্যন্ত গতকাল ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি মিত্রভিলা থেকে। বিশ্বাস করুন, এ ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। শরদিন্দু মিত্রকে আপনি কতটা চেনেন জানি না, কিন্তু আমি চিনি।
সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল চুনি। সিগারেটটা টেবিলের অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে শার্টের পকেট থেকে চশমা বের করে নাকের ওপরে বসাল। হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করল। ওর চেহারাটা এবার নজর মহম্মদের দেওয়া ফটোগ্রাফের মতো হয়ে গেল।
বলুন, আমি শুনছি কান দিয়ে গেলাসে চুমুক দিচ্ছি না।
চুনিলাল হাসল। দুঃখের হাসি। বলল, মিত্রসাহেব তো কান দিয়ে দেখেন–রাজাদের মতো। তাই আমার সঙ্গে হীরার প্রেম মেনে নিতে পারেননি। ওঁর কানে কেউ খবর পৌঁছে দিয়েছে, আমি নাকি খুব বাজে টাইপের লোক। মাতাল, অপদার্থ, দীর্ঘশ্বাস ফেলল চুনি। ঘরের সিলিংয়ের দিকে বারদুয়েক তাকিয়ে পায়চারি করতে করতে বলল, সে যাই হোক, হীরাকে নিয়ে আমি পালিয়ে এসেছি, বিয়েও করে ফেলেছি। ও এখন আমার। ওকে বাঁচানো আমার কর্তব্য। যদি আপনি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান তা হলে আমাকেও সঙ্গে নিতে হবে, মিস্টার শিকদার। আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারব না।
আমার ঠোঁটে বোধহয় সামান্য বাঁকা হাসি ফুটে উঠেছিল। সেটা লক্ষ করে চুনি বলল, জানি, আমার বয়েসটার কথা ভেবে আপনার হাসি পাচ্ছে। কিন্তু আপনার জানা উচিত, ভালোবাসার সঙ্গে বয়েসের কোনও সম্পর্ক নেই।
আমি কী একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বলা হয়ে উঠল না আর।
কারণ বাথরুমের ভেজানো দরজাটা খুলে গেল। প্রথমেই একটা বিলিতি সুগন্ধী আমার নাকে এসে ঝাপটা মারল। আর তারপরই হীরার সৌন্দর্য ধাক্কা মারল রীতিমতো।
এরকম এক সুন্দরীকে দেখার জন্যে সাতজন্ম সাগরতীরে বসে অপেক্ষা করা যায়। নজর মহম্মদের দেওয়া ছবিটা যেন লজ্জায় নতজানু হয়ে গেল আমার চোখের সামনে। যেন বলতে লাগল, আমি তো কেবলই ছবি, তুমি তো জীবন–।
চুনিলাল ইশারায় আমার দিকে দেখিয়ে বলল, হীরা, ইনিই অমিতাভ শিকদার। এঁর কথাই তোমাকে বলেছিলাম।
আমার হাতের গ্লাস থেমে গিয়েছিল শূন্যে। এবার সচেতন হয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখলাম টেবিলের ওপরে। দেখতে লাগলাম হীরাকে।
পরনে বেগুনি-সাদা নকশাকাটা সালোয়ার কামিজ। মাথায় সাদা তোয়ালে জড়ানো। নাকে নাকছাবি জ্বলছে। সেইসঙ্গে গভীর দু-চোখে অনুসন্ধানী দৃষ্টি। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। হয়তো কাগজের বিয়ে হয়ে গেছে।
জোড়হাতে নমস্কার করে ঘাড় কাত করে দেখল আমাকে। বুকের ভেতরে একটা তরুণ বুলবুলি উড়ে গেল আমার। সুদীর্ঘ একযুগ ধরে মরে হিম হয়ে যাওয়া পাখিটা কী করে আচমকা বেঁচে উঠল কে জানে!
এক মিনিটের মধ্যেই চুলের পরিচর্যা সেরে আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল হীরা। চুনি ওকে সোফায় বসতে বলল। তারপর আমাকে লক্ষ করে বলল, ওর কাছে লুকোনোর কিছু নেই। ওর সামনেই সব বলছি। আগেই আপনাকে বলেছি, আমি লোক খুব সুবিধের নই। ঢিল ছুড়লে তার বদলে পাটকেল মারতে জানি। তাই হীরাকে নিয়ে মিত্রভিলা ছাড়ার আগে থেকেই আমি লোকজন ঠিক করে রেখেছিলাম। তা ছাড়া মিত্র সাহেবের অনেক গোপন খবরও আমার কানে আসে। সেরকম লোক আছে–যাকে বলে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।
