আমি পড়ে গিয়েছিলাম মেঝেতে। শটগানও ছিটকে গেছে হাত থেকে। কিন্তু সুরিন্দারের ছ্যাকা খাওয়ার ব্যাপারটা আমাকে বাড়তি দু-তিন সেকেন্ড সময় দিয়েছে। তাই-ই যথেষ্ট। কোনওরকম চিন্তাভাবনা না করেই পা চালালাম। বোধহয় সুরিন্দারের মাথায় লাগল। কিন্তু ও দমল না। স্বাস্থ্যবান শরীরটাকে বেঁকিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিছানায় কোণে। ও জানে, তোশক ওলটালেই দূরপাল্লার মেশিনটা ওখান থেকে পাওয়া যাবে।
মেশিনটা সুরিন্দার পেল। কিন্তু ততক্ষণে সাইলেন্সার লাগানো স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন আমি পকেট থেকে বের করে ফেলেছি, এবং নিশানা নির্ভুল করার ব্যাপারে কোনওরকম চেষ্টা না করেই ট্রিগার টিপেছি।
গুলি সুরিন্দারের উরুতে লাগল। ও কাত হয়ে পড়ে গেল মেঝেতে। যন্ত্রণার দু-একটা টুকরো চিৎকার বেরিয়ে আসতে লাগল ওর মুখ থেকে।
এবার আমি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর সময় পেলাম। স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন পকেটে ঢুকিয়ে একটু দূরে পড়ে থাকা শটগানটা তুলে নিলাম। মনের ভেতরে একটা ঠান্ডা রাগ কাজ করছিল। এই সুরিন্দার নামের শুয়োরের বাচ্চাটাকে কোথা থেকে তুলোধোনা শুরু করব? মাথা থেকে, না পা থেকে?
আমি সুরিন্দারের কাছে এগিয়ে গেলাম। চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম, রমেন ফোনে কথা বলা শেষ করে ফোন নামিয়ে রেখে প্রায় দৌড়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে।
ফ্রিজ! আমি চেঁচিয়ে হুকুম দিলাম। আমার শটগান রমেনের বুক দেখছে।
রমেন থেমে গেল মাঝপথে। ভয়ে কেঁপে যাওয়া গলায় বলল, প্লিজ, ওকে ছেড়ে দিন। চুনিদা আসছে এ-ঘরে। প্লিজ…।
আমি সুরিন্দারের বুকে এক লাথি কলাম। অমিতাভ শিকদারের সঙ্গে যারাই মোকাবিলা করে তারা জীবনভর সে কথা ইয়াদ রাখে। ওঁক শব্দ করল সুরিন্দার। আঘাত সামলাতে চিৎ হয়ে গেল। ওর উরু থেকে রক্ত গড়াচ্ছে।
আমি সুরিন্দারের বহু যত্নে বানানো পেশি ও হাড় দেখছিলাম। কী অযত্নেই না আমি এখন এগুলো চুরমার করব! সাপের বাচ্চাকে মাথা না থেতলানো পর্যন্ত বিশ্বাস নেই।
সুতরাং শটগানটাকে উলটো করে বাগিয়ে ধরে সুরিন্দারের পাঁজরের মোক্ষম জায়গায় বসিয়ে দিলাম। সুন্দর শব্দ হল–পাকাটি ভাঙার মতো। সুরিন্দার চেঁচাল প্রাণপণে। আর একইসঙ্গে টুং টাং শব্দে কলিংবেল বেজে উঠল।
আমার চোখেমুখে বোধহয় খুন চেপে গিয়েছিল। কারণ রমেন ছুটে এসে আমাকে একরকম জড়িয়ে ধরল। বলল, চুনিদা এসে গেছে। ওকে এবার ছেড়ে দিন, প্লিজ।
আমি এক ধাক্কায় রমেনকে দরজার দিকে ঠেলে দিলাম। তারপর শটগান বাগিয়ে ধরে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালাম। জীবনমরণের খেলা আমাকে একধরনের বিকৃত আনন্দ দেয়। স্পষ্ট টের পাচ্ছি, আমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু মাথা বরফের মতো ঠান্ডা।
রমেন প্রথমে দরজা সামান্য ফাঁক করল। তারপর দরজা খুলে দিয়েই একপাশে সরে দাঁড়াল। আসল চুনিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ঘরে ঢুকেই দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল। ভুরু কুঁচকে চারপাশটা দেখল। পরিস্থিতি আঁচ করল বোধহয়। তারপর রীতিমতো শান্ত গলায় বলল, রমেন, সুরিন্দারকে ফার্স্ট এইড দাও। কোনওরকমে ম্যানেজ করো। আমি এখন আর বাড়তি ঝামেলা চাই না।
চুনি ব্যানার্জির কথায় ব্যক্তিত্বের ছাপ টের পেলাম। এই লোকের পক্ষেই মিত্র সাহেবের ডানহাত হওয়া সম্ভব। কিন্তু সুরিন্দারের এখন হয়তো লাস্ট এইড প্রয়োজন।
চুনিলালের চোখে রিমলেস চশমা নেই। মাথার চুলও ব্যাকব্রাশ করা নয় সামান্য এলোমেলো। বোধহয় আলতো ছদ্মবেশ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফটোর চেহারার সঙ্গে মিলছে পুরোপুরি।
আমার দিকে, আমার হাতের দিকে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় চুনি বলল, মিস্টার শিকদার, আমার ঘরে চলুন–সেখানে বসে আমরা নিরিবিলি কথা বলতে পারি।
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে চুনিলাল বলল, কোনও প্রশ্ন নয়–অন্তত এখানে। আমি চাই আমাদের কথাবার্তা নিরিবিলিতে হোক। যদি আপনার আপত্তি না থাকে তা হলে শটগানটা কি লুকিয়ে ফেলবেন? আমার চোখে বোধহয় দ্বিধা ফুটে উঠেছিল। সেটা লক্ষ করেই চুনি আরও বলল, না, ভয় নেই। আমাকে আপনি সুরিন্দারের মতো মূর্খ ভাববেন না। আপনার নাম যারা জানে তারা অন্তত বোকার মতো ঝুঁকি নেবে না।
আমি এতক্ষণে হাসতে পারলাম। নিজের কোম্পানির জন্য জুতসই ডেপুটি ম্যানেজার বাছতে কোনও ভুল করেননি শরদিন্দু মিত্র। সুতরাং শটগানটা জায়গা মতো গুঁজে নিয়ে চুনি ব্যানার্জির কাছে এগিয়ে গেলাম। বললাম, চলুন, নিরিবিলিতে বসে কথা বলা যাক।
ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম হাসল চুনি। আমার হাতে হাত মেলাল।
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। এক্ষুনি ভেজানো দরকার। শুকনো গলায় বেশিক্ষণ কথা বলা যায় না। আশা করি দুশো আঠেরো নম্বর ঘরটা মরুভূমি নয়।
দুশো তিন নম্বর থেকে বাইরে বেরিয়ে কোনওরকম শোরগোল বা ভিড় নজরে পড়ল । না, গুলির আওয়াজ কেউ শুনতে পায়নি। তা ছাড়া ব্লু গার্ডেনে মাইকেলের সঙ্গীতানুষ্ঠান শুরু হয়েছে। তার জম্পেশ ধুমধাম এখান থেকেও শোনা যাচ্ছে। সেই আওয়াজে আমার তৈরি নয়েজ পলিউশান দিব্যি চাপা পড়ে গেছে। দূষণ দিয়েই দূষণকে ঢাকতে হয়।
চাবি ঘুরিয়ে দুশো আঠেরো নম্বর ঘরের দরজা খুলতে খুলতে চুনি প্রশ্ন করল, শরদিন্দু মিত্র আপনাকে পাঠিয়েছে?
